১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সময় এখন মুস্তাফিজের


বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখন তাঁর নামটা জানে। বিশেষ করে ক্রিকেটপ্রেমীরা তো অবশ্যই। শুধু ক্রিকেট ভক্ত, সমর্থক আর দর্শকরাই নয়, এর সঙ্গে ক্রিকেটবোদ্ধারা এবং বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটাররাও তাঁকে জানেন ভাল করে। শুধু জানেনই না, গবেষণাও করেন। তাঁর নাম মুস্তাফিজুর রহমান। বাংলাদেশের এ তরুণ উদীয়মান বাঁহাতি পেসার এখন বিশ্বের বিস্ময়। এমন বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার পেছনে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ ভারতের বিরুদ্ধে ওয়ানডের অভিষেক সিরিজেই রেকর্ড গড়া বোলিং নৈপুণ্য। গত বছর উদীয়মান বোলারদের মধ্যে সেরা নৈপুণ্য দেখিয়েছেন ৯ ম্যাচে ২৬ উইকেট নিয়ে। সেজন্য আইসিসির বর্ষসেরা ওয়ানডে দলেও ঠাঁই করে নেন তিনি। বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া আসরের দলগুলোও এখন তাঁর দিকে হাত বাড়িয়েছে। প্রথমবারের মতো আয়োজিত পাকিস্তান সুপার লীগ (পিএসএল) টি২০ আসরেও তাঁকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলারে দলে ভিড়িয়েছিল লাহোর কালান্দার্স। তবে ইনজুরির কারণে সেখানে খেলছেন না মুস্তাফিজ। এবার বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় টি২০ আসর ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগের (আইপিএল) দুয়ারও খুলে গেছে তাঁর। তিনদিন আগে অনুষ্ঠিত আইপিএলের নিলামে মুস্তাফিজকে নিতে কাড়াকাড়ি পড়ে গিয়েছিল সব দলের। শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৪০ লাখ রুপীতে (১ কোটি ৬২ লাখ টাকা) তাঁকে দলে ভিড়িয়েছে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। তিনি আইপিএলে ষষ্ঠ বাংলাদেশী। গত চার আসর ধরে নিয়মিতই খেলছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। এছাড়াও খেলেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা। ডাক পেয়েছিলেন মোহাম্মদ আশরাফুল, আব্দুর রাজ্জাক, তামিম ইকবালরা।

ক্রমেই প্রসারিত হচ্ছে মুস্তাফিজের ক্রিকেট পরিসর। অথচ গত বছরের শুরুতেও মুস্তাফিজের নামটা বাংলাদেশের মানুষও জানত না। ভারতের বিরুদ্ধে উদ্ভাসিত নৈপুণ্য দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে পদার্পণ করেন তিনি। ১৮ জুন অভিষেক ওয়ানডেতে ৫০ রানে ৫ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৪৩ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকেই চমকে দিলেন। অবিশ্বাস্য একটি ডেলিভারি তাঁর মূল অস্ত্র। ভয়ানক ‘কাটার’ নাম সেটির। তা দিয়েই অভিষেক হওয়ার পর প্রথম দুই ম্যাচে নিয়ে নিলেন ১১ উইকেট। গড়লেন বিশ্ব ক্রিকেটের অনন্য ও বিরল এক রেকর্ড। ওয়ানডে ইতিহাসে বিশ্বের কোন বোলার ক্যারিয়ারের প্রথম দুই ম্যাচে ১১ উইকেট নিতে পারেননি। পরের ম্যাচে আরও দুই উইকেট নিয়ে ৩ ম্যাচের সিরিজে ১৩ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার পেসার রায়ান হ্যারিসের বিশ্বরেকর্ডে ভাগ বসালেন। ভারতের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডের পরই তাঁর নাম হয়ে গেল ‘কাটার’ মাস্টার মুস্তাফিজ। অনুশীলনে নেটে বোলিং করতে এলে দেশের নামী ব্যাটসম্যানরাও অনুরোধ করে বলতেন, ‘ভাই, আমাকে অন্তত কাটার দিস না!’ ভারতের মতো অনেক গবেষণা করেও দক্ষিণ আফ্রিকা তাঁর সেই ভয়ানক ‘কাটারের’ হানা থেকে অক্ষত থাকতে পারেনি। ভুগতে হয়েছে তাদেরও। আর এমন কীর্তির কারণেই নাম ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনি মুস্তাফিজের। গুরুত্বও বেড়েছে। বছর শেষে পারফর্মেন্সের গ্রাফে যে কোন নবাগত ক্রিকেটারকে অনেক পেছনে ফেলেছেন তিনি। তাই ঠাঁই করে নেন বর্ষসেরা আইসিসি ওয়ানডে একাদশে। এবার সেজন্যই প্রথমবার পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) আয়োজন ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি২০ আসর পিএসএলে তাঁকে দলে ভেড়ায় লাহোর কালান্দার্স। ৫০ হাজার মার্কিন ডলার পারিশ্রমিক পেতেন, কিন্তু খেলা হলোনা তাঁর কাঁধের ইনজুরির কারণে।

কিন্তু সময় ফুরিয়ে যায়নি মুস্তাফিজের। আইপিএলের দুয়ার খুলে গেছে। নিলামে ৫০ লাখ রুপী ভিত্তিমূল্য ছিল তরুণ এ পেসারের। শেষ পর্যন্ত ১ কোটি ৪০ লাখ রুপীতে তাঁকে পেয়ে গেছে হায়দরাবাদ ফ্র্যাঞ্চাইজি। তাঁকে নিতে নিলামের হাঁকটা শুরু করে সানরাইজার্স হায়দরাবাদই। এরপর দাম বাড়ায় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু। বেঙ্গালুরু হাল ছাড়লে শেষ পর্যন্ত দ্রুতগতির এ বাঁহাতি কাটার মাস্টারকে পেয়ে যায় হায়দরাবাদ। সবকিছু ঠিক থাকলে ৯ এপ্রিল শুরু হতে যাওয়া আইপিএলের নবম আসরে বাংলাদেশী এ তরুণ তারকা খেলবেন যুবরাজ সিংয়ের সঙ্গে। দলটি আরও নিয়েছে অভিজ্ঞ পেসার আশিষ নেহরাকে। নিউজিল্যান্ডের দুরন্ত গতির পেসার ট্রেন্ট বোন্টকেও সতীর্থ হিসেবে পাবেন তিনি। এছাড়াও আছেন বিশ্ব ক্রিকেটের আরও বড় বড় তারকা ক্রিকেটার। তবে তুলনামূলকভাবে অনেক কম প্রতিভাধর ক্রিকেটারও বেশি মূল্য পেয়েছেন আইপিএল নিলামে। সে তুলনায় দামটা কমই হয়ে গেছে তাঁর। তবে সে বিষয়টি নিয়ে কোন আক্ষেপ নেই বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই কাটার মাস্টারের। আইপিএলে খেলতে পারবেন তাতেই তিনি খুশি।

আইপিএলের নিলামে দল পাওয়া প্রসঙ্গে মুস্তাফিজ বলেন, ‘খুবই ভাল লাগছে। আশা ছিল যে সুযোগ পাব। সবাই বলাবলি করছিল আমাকে এবার নিতে পারে। সাকিব ভাই খুব ভাল খেলছেন ওখানে, মাশরাফি ভাইরা খেলেছেন। আমিও খেলতে পারব ভেবে খুবই ভাল লাগছে।’ সঙ্গে যোগ করেন, ‘টাকার অঙ্ক নিয়ে আমার কোন কথা নেই। এটা আমি ভাবিনি যে কত পেতে পারি বা কত উঠতে পারে। আমি শুধু চাইছিলাম যেন আইপিএলে খেলতে পারি। খেলার সুযোগ পেলেই সেটি হবে অনেক বড় অভিজ্ঞতা। সুযোগটা পেয়েছি, তাতে আমি খুবই খুশি।’ যে কোন পর্যায়ে ক্রিকেটে খেলেন না কেন মুস্তাফিজ, সব ধরনের ক্রিকেট সবসময় দারুণ উইভোগ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আসলে এতকিছু ভাবছি না, এখানে সুযোগ পেয়েছি সুস্থ থাকলে খেলব। সবসময় যেখানেই খেলি সেরাটা দেয়ার চেষ্টা করি; এখানেও তাই করব। তবে এখানে আলাদা কোন পরিকল্পনা নেই আমার।’ ২০০৯ সালে আইপিএলে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে ৬ লাখ ডলারে কিনেছিল কলকাতা নাইট রাইডার্স। সেটাই কোন বাংলাদেশী ক্রিকেটারের প্রথম আইপিএলে সুযোগ করে নেয়া। সাকিব আল হাসানকে প্রথমবার ৪ লাখ ২৫ হাজার ডলারে নিয়েছিল কলকাতা। এখন সাকিব খেলছেন ২ কোটি ৮০ লাখ রুপীতে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে মোহাম্মদ আশরাফুল খেলেছেন। আব্দুর রাজ্জাকও একবার আইপিএলে খেলেছেন। তামিম ইকবাল পুনে দলে ছিলেন। সাকিব, মাশরাফির চেয়ে অনেক কম মূল্য পেলেও এবার তাঁদের মতোই মুস্তাফিজও আইপিএলে খেলবেন।