২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

সানিয়ার কাছে কিছুই অসম্ভব নয়!


কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী, কচ্ছ থেকে কোহিমার প্রতিটা বাচ্চা যেমন ব্যাট ধরার পর শচিন টেন্ডুলকর হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তেমনি ইদানীং ভারতের টেনিস একাডেমিতে কন্যা শিশুদের স্রোত- সবার একটাই লক্ষ্য, সানিয়া হতে হবে! কারণটা অনুমেয়, সানিয়ার মির্জার আগে কোন ভারতীয় মেয়ে বিশ্ব টেনিসে শাসন তো দূরের কথা, গ্র্যান্ডসøামের সেমি বা ফাইনাল খেলবে এমনটা ছিল অলীক স্বপ্ন। সেখানে টানা এক বছর ধরে ডাবলসে বিশ্বের এক নম্বরে সানিয়া! আবারও চ্যাম্পিয়ন মার্টিনা হিঙ্গিস ও সানিয়া মির্জা জুটি। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে প্রমীলা দ্বৈতের ফাইনালে চেক প্রজাতন্ত্রের হালাভাচকোভা ও লুসি হারাদেচকার বিপক্ষে ৭-৬, ৬-৩ গেমে জেতেন তারা। হিঙ্গিসের এটি দ্বাদশ ও সানিয়ার টানা তৃতীয় গ্র্যান্ডসøাম, এবং টানা ৩৬তম ম্যাচ জয়।

সানিয়ার এই সাফল্যের বড় কারণ সে হিঙ্গিসের মতো একজন চ্যাম্পিয়ন পার্টনার পেয়েছে। দুবার অবসর ভেঙে ফিরে এসে ৩৫ বছর বয়সেও যে গ্র্যান্ডসøাম জেতে, ফের বিশ্বের এক নম্বর হয়, সেই তো সত্যিকারের চ্যাম্পিয়ন। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে দ্বৈতের ফাইনালের আগে এককে মুখোমুখি লড়াইয়ে এই হিঙ্গিসকেই হারিয়ে দিয়েছিল সানিয়া। সেই তাদেরই যুগলবন্দীতে গত এক বছরে আসে তিন-তিনটা গ্র্যান্ডসøাম। মেলবোর্নে ডাবলসের ফাইনালে সানিয়া-হিঙ্গিস এদিন প্রতিপক্ষ জুটিকে স্রেফ ৭-৬ (৭-১), ৬-৩ সেটে উড়িয়ে দেয়। কোর্টে এদিন এমন কি পার্টনার হিঙ্গিসের চেয়েও ভাল খেলেন সানিয়া। ইন্ডিয়ান টেনিস সেনসশনের ফোরহ্যান্ড শট ছিল বরাবরের মতোই দুর্দান্ত। ফাইনালে ব্যাকহ্যান্ডেও উন্নতি চোখে পড়েছে। বেশিরভাগ বিগ পয়েন্ট আসে সানিয়ার ব্যাকহ্যান্ডে। ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট ছিল, প্রথম সেটের বিপক্ষে মাত্র একটা পয়েন্ট দিয়ে সানিয়াদের হাসতে হাসতে জিতে যাওয়ার পেছনে ছিল সানিয়ারই ভাল ফার্স্ট সার্ভ আর চমৎকার কয়েকটা ব্যাকহ্যান্ড রিটার্ন শট।

সানিয়া-হিঙ্গিস জুটির অসামান্য ধারাবাহিকতার সবচেয়ে বড় কারণ, তাদের একে অন্যকে একেবারে নিখুঁত ‘কমপ্লিমেন্ট’ করার ক্ষমতা। ডাবলসে সাফল্য পেতে যেটা খুব প্রয়োজন। কোটের ভেতর তো বটেই, কোটের বাইরেও তারা একে অন্যের সত্যিকারের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। নব্বইয়ের শেষের দিকে লিয়েন্ডার পেজ-মহেশ ভূপতি যখন চারটা গ্র্যান্ডসøামের ফাইনালে উঠে দুটিতে জিতেছিল, তখন হোটেলে আলাদা রুম থাকা সত্ত্বেও নাকি তারা একসঙ্গে থাকতেন। হিঙ্গিস যেমন কিছুদিন আগে ভারতে একটি টুর্নামেন্টে খেলতে এসে হায়দরাবাদে সানিয়ার বাড়িতে থেকেছেন। বাইরের এই বন্ধুত্ব নিশ্চিত করে সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখছে। উইম্বলডন, তার পর ইউএস ওপেন, এবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, টানা তিনটা গ্র্যান্ডসøাম জেতা ঠিক কতটা কঠিনÑ এমন প্রশ্নে উত্তরে সানিয়া বলেন, ‘শেষ পাঁচ-ছয় মাস আমরা কোন ম্যাচে হারিনি। সম্ভবত আমি জীবনের সেরা টেনিস খেলছি। আমি ব্যাপরটা এভাবে দেখছি যে, আমরা নিজেদের প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেছি। গ্র্যান্ডসøামের হ্যাটট্টিক পূরণ করাটা সত্যি অসাধারণ প্রাপ্তি।’ টানা তিনটা গ্র্যান্ডসøাম জেতা তা-ও হয়ত সম্ভব। কিন্তু টানা ৩৬ ম্যাচ জিতে চলাটা প্রায় অলৌকিক। অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার মতোই কঠিনতম কাজ। এ প্রসঙ্গে সানিয়ার জবাব, ‘আমার কাছে কোন কিছুই অসম্ভব নয়। আমি আর মার্টিনা মিলে জয়ের এ ধারাবাহিকতা চালিয়ে যেতে চাই। আমরা আসলে ছোট ছোট টার্গেট তাড়া করে সেটিকে ধাওয়া করি। সেটা জমতে জমতে এক সময় বড় প্রাপ্তি হয়ে যায়। বলটাকে গড়িয়ে নিয়ে যেতে পারাটাই আসল।’ টেনিস জীবনে সঙ্গী হিঙ্গিসের অনুপ্রেরণার কথা জানিয়ে সানিয়া আরও যোগ করেন, ‘কোর্টে আমরা একে অন্যকে সব রকমভাবে সাহায্য করি। এভাবে একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছি। যেমনটা সব জুটিরই চেষ্টা থাকে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে যেটা স্পেশাল তা হলো আমরা কোর্টের বাইরেও একে অন্যের ভীষণ ভাল বন্ধু। তো আমরা বয়সে যতই ছোট বড় হই না কেন! বাইরের এই বন্ধুত্বটাই খেলার সময় বাড়তি সাহায্য করে থাকে। এত বড় বড় সব টুর্নামেন্টের ডাবলসে আপনাকে সফল হতে হলে নিজের সঙ্গীকে খুব ভালভাবে চেনাটা খুবই জরুরী। আমাদের যেটা রয়েছে।’

আপনার সাফল্য ভারতের ছোট্ট সব মেয়েদের টেনিস র‌্যাকেট হাতে তুলে নিতে অনুপ্রেরণা যোগায়। এটিকেও কি স্ট্র্যাটেজিক সাফল্যের কারণ বলে মনে করেন? উত্তরে সানিয়া বলেন, ‘এক্ষেত্রে আমি নিজেকে ভাগ্যবানই বলব, যদি আমাকে দেখে ভারতের একটা বাচ্চা মেয়েও র‌্যাকেট হাতে তুলে নেয়। বিশ্ব টেনিসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারটা আমার কাছে সবচেয়ে গর্বের। সেখানে আমাকে যদি কেউ আদর্শ করে, তার চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারি!’ তিনটি গ্র্যান্ড সø্যাম জিতলেও ভারতে ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ এখন সানিয়াকে অলিম্পিক পদকের মঞ্চে দেখতে আগ্রহীÑ এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাত্রই অস্ট্রেলিয়া ওপেন জিতলাম। অলিম্পিক এখনও অনেক দূর। তবে প্রত্যেক খেলোয়াড়েরই দেশের হয়ে অলিম্পিক স্বর্ণের স্বপ্ন থাকে। আমিও তাদের বাইরে নই, এবং সেটা সম্ভব।’ তিনটা গ্র্যান্ড সø্যামের কোনটা জেতা সবচেয়ে কঠিন, কোনটাই বা স্পেশাল? সানিয়ার উত্তর, ‘প্রত্যেকটা গ্র্যান্ড সø্যামই স্পেশাল। কোই ভি মামুলি বাত নেহি। একটাও সহজ নয়। তবে উইম্বলডনের ফাইনালে আমরা মীমাংসাসূচক সেটে ২-৫ এ পিছিয়ে পড়ার পর সেখান থেকে উঠে দাঁড়িয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা মনে গেথে আছে। এজন্য উইম্বলডন কিছুটা হলেও বেশি স্পেশাল।’