১৬ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অনন্তলোকে স্টারম্যান


তার নাম ডেভিড রবাট জোন্স। তবে ডেভিড বাউয়ি নামেই সমধিক পরিচিত। একাধারে সঙ্গীতশিল্পী, গীতিকার, রেকর্ড প্রডিউসার, চিত্রকর ও অভিনেতা। একজনের মধ্যে একইসঙ্গে শিল্পের বিভিন্ন গুণের এমন সমাবেশ খুব বেশি দেখা যায় না। এই ইংরেজ শিল্পী গত ১০ জানুয়ারি ৬৯ বছর বয়সে অনন্তলোকে পাড়ি জমিয়েছেন। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে এ্যাপোলো ১১ মিশনের নভোচারীরা প্রথম চাঁদের বুকে নামে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার ৯ দিন আগে ডেভিড বাউয়ির জীবনের সেরা অধ্যায়টা শুরু হয়েছিল। ‘স্পেস অডিটি’ নামে নিজের সিঙ্গেল এ্যালবাম মুক্তি পাওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই অধ্যায়টি শেষ হয় ১১ বছর পর ‘এ্যাশেজ টু এ্যাশেজ’ নামে তার আরেক সিঙ্গেলের মুক্তির মাধ্যমে। এই এক দশকে কল্পিত ভবিষ্যতকে কাজে লাগিয়ে বাউয়ি নিজেকে স্ববিরোধী ও অপরূপ এমন এক সুদূরের সত্তায় পরিণত করেছিলেন যার সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্পন্ন মানুষগুলো একাত্ম হওয়ার জন্য দল বেঁধে ভিড়েছে। আর তা করতে গিয়ে তিনি সত্তরের দশকের সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবর্তনকে উন্মোচিত করে দিয়েছেন। সেটা হলো অতীতের স্বপ্নগুলোকে বিসর্জন দেয়া। বাউয়ির ভবিষ্যত নিয়ে আচ্ছন্নতা মূর্ত হয়ে উঠেছে মহাকাশ ভ্রমণ ও ভিন্নগ্রহের প্রাণীর মতো বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর থিমে। পাঁচ দশক ধরে তিনি ছিলেন জনপ্রিয় সঙ্গীতের জগতে এক সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব। তার ক্যারিয়ারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো আপন কল্পনাকে উদ্ভাবনী দক্ষতায় অন্যের মনশ্চক্ষুর সামনে স্বজনশীল উপায়ে উপস্থাপন। জীবদ্দশায় তার ১৪ কোটি রেকর্ড সারা বিশ্বে বিক্রি হয়েছে। যুক্তরাজ্যে তিনি ৯টি প্লাটিনাম এ্যালবাম সার্টিফিকেট, ১১টি স্বর্ণ ও ৮টি রৌপ্যপদক পেয়েছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রে পেয়েছেন পাঁচটি প্লাটিনামও সাতটি স্বর্ণাপদক।

দক্ষিণ লন্ডনে জন্ম ও বেড়ে উঠা বাউয়ির। শিশুকাল থেকে সঙ্গীতের প্রতি তার আগ্রহ জন্মে। পড়াশোনাও করেন শিল্পকলা, সঙ্গীত ও ডিজাইনের ওপর। ১৯৬৩ সালে সঙ্গীতকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে প্রথম মুক্তি পাওয়ার পর তার স্পেস অডিটি যুক্তরাজ্যের সিঙ্গেলস চার্টের শীর্ষ পাঁচে স্থান লাভ করে। সঙ্গীতের রূপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার একটা অধ্যায়ের পর ১৯৭২ সালে তিনি তার ‘জিগি স্টারডাস্ট’ নিয়ে গ্লামরস যুগে পুনরাবির্ভূত হন। এই চরিত্রটির সাফল্যের মূলে ছিল তার সিঙ্গেল ‘স্টারম্যান’ ও এ্যালবাম ‘দি রাইজ এ্যান্ড ফল তার জিগি স্টারডাস্ট’ এবং ‘স্পাইডার ফ্রম মার্স’ এর সাফল্য। এগুলো তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তিনি সুপারস্টারে পরিণত হন। বাউয়ির সেলিব্রেটি প্রোফাইল যেমন বাড়তে থাকে তেমনি ভক্ত ও সমালোচকদের নানা ধরনের ধারণা ও অনুমানে ব্যস্ত রাখতে তার আকাক্সক্ষাও বেড়ে চলে। তার জিগি স্টারডাস্ট ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া একরকম স্টারের প্রতিচ্ছবি। সেই রকস্টার যেন তিনি নিজে। এ সময় তিনি বুনো ধরনের অদ্ভুদ সব পোশাক পরিধান করতেন এবং উদ্ভট ভবিষ্যতের কথা বলতেন। নিজে স্টারডাস্টের চরিত্র চিত্রায়ন করে বাউয়ি রকসঙ্গীতের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করেন। সেটা হলো উডস্টক যুগ।

কিন্তু বাউয়ি যত তাড়াতাড়ি নিজেকে স্টারডাস্টে রূপান্তরিত করতে পেরেছিলেন তেমনিই আবার দ্রুত নিজেকে বদলে ফেলেন। নিজের সেলিব্রিটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি পপ গায়ক লুবীড ও আইগি পপের জন্য এ্যালবাম তৈরি করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি স্পাইডার্স বাতিল করে দেন এবং নিজের স্টারডাস্ট ব্যক্তিত্বটিকে শিকে তুলে রাখেন। ১৯৭৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আলাদিন সানে’তে তিনি একই ধরনের রকস্টাইল, চালিয়ে যান। পরে সেই ধারা থেকেও সরে আসেন। এবার তার স্টাইলটি মূলত সাউন্ডকেন্দ্রিক হয় এবং একে তিনি প্লাস্টিক সোল নামে আখ্যায়িত করেন। এই ধারার কয়েকটি সিঙ্গেল বের হয়ে তার প্রথমদিকে যুক্তরাজ্যে তার বেশকিছু ভক্ত অনুরাগী এই ধারার সঙ্গীত পছন্দ করেনি। তারা বাউয়ি থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু আমেরিকানদের কাছে এটা বেশ কদর পায়। তার প্লাস্টিক সোলের এক নম্বর সিঙ্গেল ‘ফেম’ এবং এ্যালবাম ‘ইয়ং আমেরিকান’স যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম বড় ধরনের সাফল্য বয়ে আনে। ১৯৭৬ সালে বাউয়ি বিক্ষিপ্তভাবে অভিনয় ক্যারিয়ারও শুরু করে দেন। অভিনয় করেন কাল্ট ফিল্ম ‘দি ম্যান হু ফেল টু আর্থ’ পরের বছর নেয়ার তার এ্যালবাম ‘লো’ সেখানে ছিল ইলেক্ট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রাধান্য। এরপর বেরোয় হিরোস ও লজার। প্রতিটি এ্যালাবাম যুক্তরাজ্যে শীর্ষ পাঁচে স্থানলাভ করে এবং সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে। ১৯৭০-এর শেষ দিকে অসম বাণিজ্যিক সাফল্যের পর ১৯৮০ সালে বাউয়ি তার এ্যাসেজ টু এ্যাসেজ শিঙ্গেলসের মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্যে এক নম্বর আসনে ফিরে আসনে। ১৯৮৩ সালে ‘লেটস ডান্সে’র মাধ্যমে তিনি বাণিজ্যিক দিক দিয়ে নতুন শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছান। ১৯৯০ -এর দশক এবং ২০০০ -এর দশকের গোটা অধ্যায়জুড়ে বাউয়ি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মিউজিক ও জাঙ্গল মিউজিকসহ সঙ্গীতের বিভিন্ন স্টাইল নিয়ে নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যেতে থাকেন। সেই সঙ্গে অভিনয়ও অব্যাহত রাখেন। ‘দি লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৮ সালে। সেখানে তিনি পন্টিয়াস পাইলেট চরিত্রে অভিনয় করেন। তার অভিনীত অন্যান্য ছায়াছবির মধ্যে আছে মেরি ক্রিস্টমাস মিস্টার লরেন্স, ল্যাবিরিন্থ ও প্রেস্টিজ। ২০০৪ সালের পর কনসার্ট সফরে যাওয়া বন্ধ করে দেন বাউয়ি। শেষবারের মতো লাইভ শো করেছিলেন ২০০৬ সালে। প্রায় এক দশক রেকর্ডিং থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর ২০১৩ সালে মুক্তি পায় তার এ্যালবাম ‘দি নিক্সট ডে’। তার শেষ এ্যালবাম ব্ল্যাকস্টার মুক্তি পাওয়ার দু’দিন পর নিউইয়র্কের ম্যানহাটানে মারা যান ডেভিড বাউয়ি। তার আগ পর্যন্ত সঙ্গীতশিল্প নিয়ে সক্রিয়ই ছিলেন তিনি।

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট