২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

প্রাণের বইমেলায় তারুণ্যের ঢল


বইমেলা আমাদের সংস্কৃতির উৎসব। এ ফেব্রুয়ারি মাসটির জন্যই হাজারো মানুষ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করে থাকে। দেশের বাইরে থাকা অনেকেই এ মাসেই দেশে আসার জন্য সময় বের করেন। এ বইমেলা সবার জন্য। সবার ভালবাসার প্রকাশ, লেখকের মনের সিঞ্চন, প্রাণের আঙিনা। সবার পাশাপাশি তরুণদেরও তাই অপেক্ষা নতুন বইয়ের মলাটে, বইয়ের ভাঁজে ভাঁজে যে একটা গন্ধ আছে সেটা নেয়ার। অমর একুশে বইমেলার পরিসর আরও বাড়ানো হচ্ছে। বাংলা একাডেমি চত্বর পেরিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত বিস্তৃত বইমেলায় এবার যুক্ত হচ্ছে মেলা ফটকের সঙ্গের মুক্ত জায়গাটাও।

একদিকে ছুটির দিন অন্যদিকে প্রাণের বইমেলা। সবমিলিয়ে মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে দেখা যায় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। আগতদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ-তরুণী। এক ধাপ এগিয়ে বললে কপোত-কপোতী। মেলার মূলমঞ্চ, নজরুলমঞ্চ, লিটল ম্যাগ চত্বর, প্রায় সর্বত্রই ছিল তাদের অবাধ বিচরণ। টিএসসি, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, দোয়েল চত্বর, রাজু ভাস্কর্য, শহীদ মিনারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকায় ছিল জনস্রোত।

তবে বেশিরভাগ শুক্রবারে তারুণ্যের ঢেউ জাগে মেলায়। একটু বিকেল গড়াতেই মেলায় নামে মানুষের ঢল। আর পছন্দের বইটি কিনতে উল্লেখযোগ্য স্টলগুলোতে পড়ে যায় দীর্ঘ লাইন। আকুতি একটু জায়গা নিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর। কথা আর আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে অনেককেই ভিড় জমাতে দেখা যায় স্টলগুলোতে।

বইপ্রেমী মানুষের ভালবাসার ছোঁয়া লেগেছে যেন অমর একুশের বইমেলায়ও। বিভিন্ন রঙের শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ ও বাহারি সাজে সজ্জিত হয়ে এসেছে নারীরা। পুরুষরাও কম যায় না, তারা রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবি আর ক্যাজুয়াল পোশাকে একে অন্যের হাত ধরে ঘুরেছে মেলায় আর পছন্দের বই দেখছে। কেউ বই কিনছে, কেউ আবার এদিক-সেদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে। আবার কেউ কেউ ভালবাসার মানুষটিকে বই উপহার দিয়ে দিনটিকে স্মরণীয় করে রেখেছেন।

মেলার পাশাপাশি প্রতিবছর মেলাচত্বরে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ আয়োজন করে শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ও আগেকার কবি-সাহিত্যিকদের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে সমৃদ্ধ আলোচনামুখর থাকে প্রতি বিকেল। জারি-সারি-ভাটিয়ালি, মুর্শিদি, রবীন্দ্র, নজরুল, লালন, দেশাত্মবোধক গানের আয়োজনে কাটে ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যাগুলো। এগুলোও তরুণদের টেনে নিয়ে যায় মেলা প্রাঙ্গণে। ইডেন কলেজের ছাত্রী ও সাংস্কৃতিক কর্মী তামান্না বলেনÑ ‘মহান একুশের বইমেলা আমাদের মতো সাংস্কৃতিক কর্মীর কাছে শেকড়ের মতো। শেকড়ের টানে আমরা ছুটে চলি বইমেলায়। আমাদের ভাষা, শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা ও বিকাশে বাংলা একাডেমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন আমাদের মতো সাংস্কৃতিক কর্মীদের মেলায় টেনে নিয়ে যায়। তৈরি করে মেলবন্ধন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পাভেল বলেন, ‘বাঙালি সংস্কৃতির অন্যতম স্মারক হচ্ছে একুশের বইমেলা। প্রতিবছর লেখক-পাঠকদের ভিড় জমে বাংলা একাডেমির মেলাপ্রাঙ্গণে। গত দুবছর ধরে আমি এ মেলায় নিয়মিত যাই। শুধু বই কেনা আর লেখকদের সঙ্গে পরিচয় হওয়া নয়; মেলায় সাহিত্যামোদি বন্ধুদের সঙ্গে নির্মল আড্ডায় সময় পার হয়ে যায় তরতর করে। চলছে মেলার প্রস্তুতি। বইমেলা শুরু হবে ভাবতেই আনন্দ লাগছে।’

‘দলে নর-নারী ছুটে এল গৃহদ্বার খুলি/বীণা বেণু/মাতিয়া পাগল নৃত্যে হাসিয়া করিল হানাহানি/ছুড়ি পুষ্পরেণু।’ কবিগুরু রবি ঠাকুরের ‘বসন্ত’ কবিতার কথা এই একুশের বইমেলায় আসলেই টের পাওয়া যায়। কবিগুরুর হাত ধরেই ঋতুবরণের যে উৎসবের সূচনা হয়েছিল সেই ঋতুবরণের অংশ হিসেবে প্রতিবছরের মতো এবারও শীতের ঝরা পাতার দিনের শেষে প্রকৃতিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠার আনন্দ-উৎসবে যোগ দেয় হাজার-হাজার উৎসবপ্রিয় বাঙালী এই বইমেলায়।

এই বইমেলার ইতিহাস অনেক বিস্তৃত আর ব্যাপক। এই অমর একুশে গ্রন্থমেলা ব্যাপকভাবে পরিচিত একুশে বইমেলা, স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর অন্যতম। প্রতিবছর পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে এই মেলা বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে ও বর্ধমান হাউস ঘিরে অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ খিস্টাব্দ থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমির মুখোমুখি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ বাংলা ভাষার জন্য আত্মোৎস্বর্গের যে করুণ ঘটনা ঘটে, সেই স্মৃতিকে অম্লান রাখতেই এই মাসে আয়োজিত এই বইমেলার নামকরণ করা হয় ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা।’ মেলা চলাকালীন প্রতিদিনই মেলাতে বিভিন্ন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে; প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলাতে লেখককুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়ক উন্মোচিত বইগুলোর নাম, তদীয় লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় ও দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পন্সর হয়ে মেলার তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক-শ্রোতাদের অবহিত করে। এ ছাড়াও মেলার প্রবেশদ্বারের পাশেই স্টল স্থাপন করে বিভিন্ন রক্ত সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে রক্ত সংগ্রহ করে থাকে।

মেলা ঘুরে দেখা যায় যে, উৎসবমুখর পরিবেশে ফুলের টায়রা মাথায় দলে দলে ঘুরে বেড়াচ্ছে শত শত তরুণী। মাঘের অবসানে প্রকৃতি যে রঙের দুয়ার খোলে গেছে তারই ছোঁয়া লেগেছিল সমাগত সকলের মনে। হলুদ আর লাল বর্ণের পোশাকে নগরীর পথ-প্রান্তর জেগে উঠেছিল ফাল্গুনের সবার হাতে শোভা পায় তাদের পছন্দের নানা বই। মেলায় আগতরা তারুণ্যের উচ্ছ্বসিত আবেগে কেউ কেউ হাতে হাত রেখে ঘুরেছেন মেলাপ্রাঙ্গণে। একে অপরকে উপহার দিয়েছেন প্রিয় লেখকের নতুন বই।

অপরদিকে অভিভাবকদের সঙ্গে গ্রন্থমেলায় আগত শিশুরাও পরে এসেছে বাহারি পোশাক। মেলাপ্রাঙ্গণে বসন্তের ফুল হয়ে শিশুরা যেন বিচরণ করতে থাকে।

ছুটির দিন ও শিশুপ্রহর হওয়ায় গতকাল সকাল থকে মেলাপ্রাঙ্গণে দর্শনার্থী-ক্রেতারা আসতে শুরু করেন। মেলার শিশুচত্বর শিশুদের পদচারণায় প্রাণবন্ত। শিশুদের প্রায় সবার হাতে হাতে বই ও মুখে হাসির হিড়িক।

এদিকে মেলাপ্রাঙ্গণে ঘুরে দেখা গেছেÑ উভয় অংশের প্রবেশ মুখে ছিল টিএসসি-দোয়েল চত্বর পর্যন্ত প্রসারিত দীর্ঘ লাইন। গতবারের মতো এবারও সৃজনশীল প্রকাশনীগুলোর স্টল সোহরাওয়ার্দী হওয়াতে বইমেলার সবচেয়ে বড় অংশটি এবারও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এ প্রাঙ্গণের মেলা ঘুরে জানা গেল বইয়ের বিক্রিও আজ বেশি। ঘাসফুল প্রকাশনীর কর্ণধার মাহাদী আনামা জানালেন, মেলায় এখন কেনার মানুষ বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের ভিড় বেশি, আর আস্তে আস্তে বিক্রিও বাড়ছে। কবিতার বইয়ের বিক্রি তুলনামূলক বেশি। তা ছাড়া সামনের ফাল্গুনের দিন আর ভালবাসা দিবসের কারণে তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি আরও বাড়বে। স্টলে এসে তারা প্রেমের কবিতা-উপন্যাস-গল্প বইয়ের খোঁজ করছেন। অনেকেই পছন্দের মানুষকে বইটি দেবেন বলে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তবে ঢাকার বাইরের পাঠকরা আরও বেশি এলে মেলা জমে উঠত সবচেয়ে বেশি।’

মেলায় লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি গায়ে বান্ধবীসহ ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন আজিমপুরের তরুণী আফরিন প্রিমা। তার কাছে মেলার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজই প্রথম এলাম। খুব ভাল লাগছে। ঘুরে বেড়াচ্ছি, বই দেখছি। নজরুল ইসলাম আমার পছন্দের লেখক। তার লেখা কয়েকটি বই কিনব বলে ঠিক করেছি। উপন্যাস বই-ই আমি পড়তে ভালবাসি।’

বাঙালীর এই প্রাণের বইমেলা হয়ে উঠুক সাধারণ মানুষের সংস্কৃতিচর্চার অন্যতম কেন্দ্র। একুশের চেতনা আর মূল্যবোধকে সঙ্গী করে মেলা হোক আরও প্রাণবন্ত আর উচ্ছেসের স্থান। তাই আবারও বলতে চাই, ‘বই হোক মানুষের নিত্যসঙ্গী।’

মডেল : সামী ও ইভা

ফটোগ্রাফার : নেওয়াজ রাহুল