১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৩ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

উপকূলের আট থানা জুড়ে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা


মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকার ওপারে মরণনাশা মাদক ইয়াবা ট্যাবলেটের উৎপাদন কারখানা আরও বেড়েছে। উৎপাদিত এ ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল গন্তব্য বাংলাদেশ। ফলে ইতোমধ্যে স্থল ও সমুদ্র পথে ইয়াবার চালান বাড়ানোর রুটও বেড়েছে। ইতোপূর্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ইয়াবা চোরাচালানে মূল গডফাদার ও সিন্ডিকেট সদস্যদের তালিকা সরকারের কাছে হস্তান্তর করার পর বিহিত কোন ব্যবস্থা না হওয়ায় এরা আবারও এই অবৈধ ও ভয়াবহ এ পথে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করে দেশের নবপ্রজন্মের একটি বড় অংশকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাওয়ার দুঃখজনক খেলায় মেতে উঠেছে। এ অবস্থা অব্যাহত গতিতে এগিয়ে গেলে এ দেশ একটি বিকলাঙ্গ জাতিকে পরিণত হতে খুব বেশিদিন সময় লাগবে না বলে বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন সূত্রের অভিমতে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছর সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ঘটনা রোধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক চাপ সৃষ্টির পরও পথটি এখন থমকে আছে। তা থেকে সরে এসে চোরাচালানী চক্র এখন দ্বিগুণ উৎসাহে মেতে উঠেছে ইয়াবা চোলাচালান কর্মকা-ে। বিভিন্ন সূত্রে অভিযোগ মিলেছে মিয়ানমারে উৎপাদিত ইয়াবা বাংলাদেশ হয়ে এখন প্রতিবেশী দেশ ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন রাজ্যসমূহেও অনুপ্রবেশ ঘটেছে। সে দেশের বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ ইয়াবা আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ছে। পুরো কক্সবাজারসহ এর আওতাধীন উপকূলবর্তীসহ ৮টি থানা এলাকাজুড়ে অবৈধ ইয়াবার রমরমা বাণিজ্য চলছে। হাত দিলেই টাকা। ধরা না পড়লে সহজে লাখপতি ও পরে এমনকি কোটিপতি পর্যন্ত হওয়ার হাতছানিতে একশ্রেণীর মানুষ উন্মাদের মতো ছুটছে এ অবৈধ ব্যবসার পেছনে।

এদিকে, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন ওপারে আগে ৩৫টি স্থানে ৩৭ ইয়াবা উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছিল। ইতোমধ্যে তা ১৮টি স্থানে ৪০ কারখানায় উন্নীত হয়েছে বলে সীমান্তের ওপারের বিভিন্ন সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। এসব ইয়াবা উৎপাদিত হওয়ার পর ৪২ থেকে ৪৫টি রুট দিয়ে কক্সবাজার অঞ্চলে প্রবেশ করে। এরপর আরও একাধিক রুট হয়ে এগুলো দেশের বিভিন্নস্থানে পৌঁছে যায়। তবে মূলত চট্টগ্রাম ইয়াবা পাচারের মূল রুটে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের ওপারে ইয়াবা ট্যাবলেট উৎপাদনে কারখানা গড়ে উঠার বিষয়টি মিয়ানমার সরকার অফিসিয়ালি স্বীকার করে না। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এসব কারখানা সীমান্তের কোন্্ কোন্্ স্থানে গড়ে উঠেছে তা সুনির্দিষ্ট তথ্য হস্তান্তর করা হয়েছে। কিন্তু সে দেশের সরকার এ ব্যাপারে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা সরকার সে দেশের সেনাবাহিনী ও সীমান্ত রক্ষীবাহিনী অর্থাৎ নাসাকা ও বিজিপির একশ্রেণীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরাগভাজন হতে অনিচ্ছুক। নাসাকা ও বিজিপি’র একশ্রেণীর অসৎ কর্মকর্তারা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ইয়াবা ট্যাবলেট উৎপাদন ও বাংলাদেশে চোরাপথে পাচারের কাজে চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সূত্রে স্বীকার করা হয়েছে, বৃহত্তর চট্টগ্রামের উপকূলজুড়ে ইয়াবার চালান নিয়ে বিভিন্ন নৌযানের আনাগোনা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। সড়ক পথে এমন কোন যানবাহন নেই যেখানে কোন না কোন যাত্রী বা হেলপারের শরীর তল্লাশিতে ইয়াবা মিলছে না। শুধু তাই নয়, রোগী বহনের কাজে নিয়োজিত এ্যাম্বুলেন্স, মাছ, শাকসবজি, কাঠসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনে যানবাহনেও বিশেষ কায়দায় পরিবাহিত হচ্ছে ইয়াবার চালান। এর পাশাপাশি সাগর ও নৌপথে বিভিন্ন নৌযানযোগে কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন দ্বীপ হয়ে ইয়াবার চালান চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। ইয়াবা সেবনকারীরা এখন জেলা শহর থেকে উপজেলা এমনকি গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাড়ছে। যা দেশের জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

মরণনাশা মাদক ইয়াবার নীল ছোবল থেকে রক্ষা পেতে দেশে বিভিন্ন স্তর থেকে বলাবলী কম হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবই যেন ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে সমুদ্র পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ঘটনা ও এর লোমহর্ষক চিত্র দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হওয়ার পর সরকার এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মানব পাচারকারীরা থমকে যেতে বাধ্য হয়। এ মানব পাচারকারীরাই কখনও সরাসরি কখনও নেপথ্যে মিয়ানমারে উৎপাদিত মাদক ট্যাবলেট ইয়াবা পাচারের কাজে জড়িত। মানবপাচারের আধিক্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন পাচারকারীরা ব্যাপকভাবে ঝুঁকে পড়েছে ইয়াবা পাচার কাজে। যে কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চালানে চালানে ধরা পড়ছে ইয়াবা ট্যাবলেট। কিন্তু এর বাইরে আরও অসংখ্য চালান পৌঁছে যাচ্ছে গন্তব্যে। পরবর্তীতে বিভিন্ন হাত করে সেবনকারী বিশেষ করে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশের হাতে চলে যাচ্ছে। যা দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বড় ধরনের একটি অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত একাধিক বাহিনীর সদস্যরা সত্যিকার অর্থে ইয়াবা পাচার রোধ কার্যক্রমে কি কুলিয়ে উঠতে পারছে না। নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের অসৎ কিছু সদস্যের যোগসাজশের কারণে মিয়ানমার সীমান্ত গলিয়ে দেশের অভ্যন্তরে ইয়াবার চালান ঢুকছে স্থল পথে ও সীমান্ত পথে। ইয়াবার চালান আসা যেন অপ্রতিরোধ্য থেকে অপ্রতিরোধ্য হয়ে যাচ্ছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: