২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শ্রদ্ধাঞ্জলি ॥ প্রগতিশীল চিন্তাধারার আইকন কবীর চৌধুরী


প্রগতিশীল চিন্তাধারার আইকন কবীর চৌধুরীর জন্মদিন ৯ ফেব্রুয়ারি, ১৯২৩ সাল। দেশের ঘোরতর সঙ্কটে, দুর্দিনে এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধের আন্দোলন-সংগ্রামে যে মানুষটি প্রথম সারিতে থেকে জাতিকে আলোর পথ দেখিয়েছেন তার জন্মদিনের কথা আমরা কেউ স্মরণ করি না। দেশের মানুষের চেতনাগত পরিবর্তন আনার জন্য তিনি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কাজ করেছেন। সেই অসাধারণ মানুষটির জন্মদিনে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

মনে পড়ে ২০১১ সাল, ১৩ ডিসেম্বর একরাশ বেদনা নিয়ে সকাল শুরু হলো। খবর পেলাম নিদ্রা থেকে চিরনিদ্রায় চলে গেছেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। রায়হানা হোসেনকে নিয়ে ছুটে গেলাম তার প্রিয় আবাসস্থল নয়াপল্টনের ‘গাজী ভবনে’। ইতোমধ্যে সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে চলে এসেছেন তার বাসভবনে। বিনম্র শ্রদ্ধায় শোকবিহ্বল চিত্তে সমবেত হয়েছেন সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিসেবী, চিকিৎসক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সরকারী কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সাংসদ, মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মরদেহ রাখা হয়েছিল তার বাসভবনে। কবীর চৌধুরীর অন্তিম ইচ্ছা ছিল তাই। ২০০৬ সালে তিনি তার ডায়েরিতে লিখে রেখে গেছেন তার মৃত্যুর খবর টেলিফোনে আত্মীয়স্বজনকে দেয়ার পর খুব দ্রুতই যেন তাকে সমাধিস্থ করা হয়। সাত-আট ঘণ্টার মধ্যেই যেন কাজটি সম্পন্ন হয়। বাড়ির কাছের মসজিদে জানাজার পর সাধারণ কোন কবরস্থানে যেন কবর দেয়া হয়। মৃত্যুর পরে কুলখানি বা চল্লিশা বা শোকসভার মতো আয়োজন এড়াতে বলেছিলেন।

মা-বাবার প্রথম সন্তান কবীর চৌধুরীর আকিকার নাম আবুল কালাম মোহাম্মদ কবীর। ডাক নাম মানিক। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারী চাকরির নথিপত্রে এ নামটিই ব্যবহৃত হয়। পঞ্চাশ দশকে তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন তখন বাবার পদবি নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে হলেন কবীর চৌধুরী। কবীর চৌধুরীর বাবা ছিলেন সরকারী চাকুরে। চাকরিসূত্রে তার বাবা মেদিনীপুর, কাঁথি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মানিকগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ, বাখরগঞ্জ, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, খুলনা প্রভৃতি স্থানে অর্থাৎ সারা বাংলাদেশ ঘুরেছেন। সেই সুবাদে কবীর চৌধুরীর দেশের প্রত্যন্ত এলাকা দেখার সুযোগ হয়। মাটি ও মানুষের কাছাকাছি আসেন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন।

কবীর চৌধুরীর লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় ১৯৩০ সালে তার বাবা যখন বগুড়ার হাকিম। বাবা ছিলেন অত্যন্ত নিয়মানুবর্তী এবং সুশৃঙ্খল। নানারকম পদ্ধতিতে তিনি ছেলেকে পড়াতেন। উচ্চৈঃস্বরে পড়ার ওপর জোর দিতেন। কবীর চৌধুরী বলেছেন, তিনি যে শুদ্ধ উচ্চারণে সাবলীল ভাষায় বক্তৃতা দিতেন তার ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছিলেন বাবা সেই ছেলেবেলাতেই। কবীর চৌধুরী হয়ে ওঠার পেছনে ছিলেন তার শিক্ষাজীবনে পাওয়া বেশ কয়েকজন দৃঢ়চেতা, আদর্শনিষ্ঠ ও নীতিবান শিক্ষক। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পড়াশোনা করার সুযোগ ঘটেছিল সেই ছেলেবেলায় স্কুলজীবনে। ‘নাই বা হল পারে যাওয়া’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেনÑ

‘শুধু স্কুলে পাঠ্যসূচী নয়। তার বাইরেও অনেক কিছু পড়তে হয়েছে, শিখতে হয়েছে। বিদ্যা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে অসামান্য প্রতিভার অধিকারী আমার পিতৃদেবের কাছ থেকে।’

১৯৩৫ সালে বাবা ঢাকায় বদলি হলেন। তিনি ভর্তি হলেন কলেজিয়েট স্কুলে। অত্যন্ত মেধাবী কবীর চৌধুরী ১৯৩৮ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় সপ্তম স্থান অধিকার করেন। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে মেধা তালিকায় চতুর্থ স্থান অধিকার করে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৪০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীতে অনার্সে ভর্তি হন। সাবসিডিয়ারি ছিল অর্থনীতি ও ইতিহাস। অনার্স পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বুদ্ধদেব বসুর পর এত বেশি নম্বর কবীর চৌধুরীই অর্জন করেন।

১৯৪৪ সালে এমএ পরীক্ষার পর বাবার কর্মস্থল পাবনায় যান। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে ইংরেজী অধ্যাপকের ছুটিকালীন শূন্যপদে জীবনের প্রথম চাকরি করেন। এরপর চাকরি করেন রংপুর জেলার মহিমাগঞ্জে সুবীরনগরে বার্মা রিফিউজি ক্যাম্পে। শরণার্থীদের জীবনযাপন প্রণালী, আচার-আচরণ, কথা বলার ভঙ্গি, সংস্কার-কুসংস্কার সব কিছুই ছিল নতুনের চমক ও চ্যালেঞ্জ। মাত্র এক বছর পর ১৯৪৫ সালে সাবডিভিশনাল কন্ট্রোল অব সিভিল সাপ্লাইজ এবং বেসামরিক সরবরাহ বিভাগের মহকুমা নিয়ন্ত্রক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। শিক্ষকতা ছিল কবীর চৌধুরীর প্রাণের পেশা। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি ইস্ট পাকিস্তান এডুকেশন সার্ভিসে ইংরেজীর অধ্যাপক হিসেবে রাজশাহী কলেজে যোগ দেন। এরপর একে একে ঢাকা কলেজ, বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ, ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ১৯৬৯ সালের প্রথমার্ধে প্রেষণে বাংলা একাডেমির পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কবীর চৌধুরীর অন্তরের প্রগাঢ়তম অনুরাগ ছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি। বাংলা একাডেমির প্রধান হিসেবে কাজ করার সুযোগে তিনি বাংলাকে ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা নিবিড়ভাবে করার দক্ষতা অর্জন করেন। থিয়েটার স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে নাট্যচর্চা, নাট্য আন্দোলন এবং নাটকের ব্যাপ্তি ঘটানোর ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক প্রয়াস চালিয়েছেন।

ছাত্রজীবনে কবীর চৌধুরী রাজনীতিমনস্ক ছিলেন না। যদিও তার অনুজ মুনীর চৌধুরী এবং বোন নাদেরা চৌধুরী কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। চাকরি জীবনে এসে বেশকিছু তরুণ-বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। তাদের কাজকর্মে তার ছিল নৈতিক সমর্থন এবং মাঝে মাঝে তিনি আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা করতেন। তবে সাহিত্যের পথ ধরে তিনি প্রগতিশীল মানবতাবাদী জীবনদর্শনের দিকে আকৃষ্ট হন। ঢাকার প্রগতি সাহিত্য সংঘের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয় হয়। ধীরে ধীরে তিনি রাজনীতিমনস্ক হয়ে ওঠেন এবং কর্মে-কথায়, চিন্তা-চেতনায় সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হন। এরই ধারাবাহিকতায় জীবনাচরণে কবীর চৌধুরী হয়ে উঠলেন উদার, সত্যনিষ্ঠ, মানবতাবাদী এবং অসাম্প্রদায়িক একজন দৃপ্ত ব্যক্তিত্ব। পরিচয়, পূর্বাশা, নতুন সাহিত্য প্রভৃতি পত্রিকা নিয়মিত পড়তে শুরু করলেন। গোপাল হালদার, সঞ্জয় ভট্টাচার্য, সুনীল জানা, ব্যাম্ফ ফক্স, কল্ডওয়েল প্রমুখের লেখার প্রতি আকৃষ্ট হন। একই সঙ্গে ও’নীল, হেমিংওয়ে, ফকনার, সিনফ্লেয়ার লুইস, থিওডোর ড্রাইসার এদের লেখাও পড়তে শুরু করেন। এ সময়েই নজরুলের কয়েকটি কবিতা ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। কবি আবুল হোসেনের লেখা ‘শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং’ শিরোনামের কবিতাটির চিত্রকল্প, সুরঝংকার, শব্দের ব্যঞ্জনা ইঙ্গিতময়তা, সর্বোপরি বিষয়ের সঙ্গে ছন্দের সাযুজ্য কবীর চৌধুরীকে আকৃষ্ট করে। এই দুরূহ কবিতাটি তিনি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন। অনুবাদ সাহিত্যে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ বিশ্বস্ত কারিগর। ইংরেজী, বাংলা উভয় ভাষায় তিনি ছিলেন প-িত মানুষ। তার অনুবাদ সাহিত্য একদিকে যেমন ছিল রসোত্তীর্ণ তেমনি হৃদয়গ্রাহী ও সুখপাঠ্য। ব্যক্তিগত জীবনে কবীর চৌধুরী ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। চৌদ্দ ভাইবোনের মধ্যে বড় ভাই হিসেবে তিনি ছিলেন স্নেহপ্রবণ এবং কর্তব্যপরায়ণ। ১৯৪৫ সালের ২৯ জুন অত্যন্ত মেধাবী বিদুষী মেহের তৈমুরের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। তাদের প্রথম সন্তান সিনা মাত্র আট মাস বয়সে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট মারা যায়। কর্মে একনিষ্ঠ মানুষটি গভীর বেদনা অন্তরে ধারণ করে অফিসের কাজ সম্পন্ন করেন।

কবীর চৌধুরী মানুষ হিসেবে ছিলেন আকাশচুম্বী। অসুস্থ স্ত্রীর সেবা করেছেন যতেœর সঙ্গে, যারা তার সান্নিধ্যে এসেছেন সবাই জানেন। সদা হাসিমুখে গভীর মমতায় সহধর্মিণীকে সহযোদ্ধা হিসেবে দেখেছেন এবং সঙ্কটে সম্পদে আলোকিত পথে হেঁটেছেন। নারী অধিকারের কথা শুধু মুখে নয়- জীবনাদর্শে ধারণ করেছেন, লালন করেছেন। এ দেশের সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সংগ্রাম আন্দোলনে তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি সরাসরি রাজনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে মিছিলে, সংগ্রামে, আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দেন। গত চার দশক থেকে অসাম্প্রদায়িক সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য মৃত্যু পর্যন্ত নিরন্তর কাজ করেছেন। ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে বলিষ্ঠ কণ্ঠে আহ্বান জানিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করতে বলেছেন। মঞ্চে তিনি যখন যুক্তিঋদ্ধ ক্ষুরধার ও আবেগময় ভাষায় বক্তৃতা করতেন, তখন তার ব্যক্তিত্ব আশ্চর্য প্রাণময় হয়ে উঠত। আর আমরা যারা শুনতাম আর ভাবতাম- এই সেই মহামানব যার জন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য/উচ্চ হেথা শির।’ কর্মে-কথায় এক হওয়া মানুষ খুব একটা বেশি চোখে পড়ে না। এই মহৎপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন সেই অল্পসংখ্যক কয়েকজনের মধ্যে একজন। তিনি তার গুলশানের ‘ঝরোকা’ বাড়িটি বিক্রি করে তিন মেয়ের নামে তিনটি ফ্ল্যাট কিনে দেন। বিশাল অংকের অবশিষ্ট অর্থ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষা প্রসারের জন্য প্রদান করেন। না কোন রকম আনুষ্ঠানিকতা নয়। প্রচার করে নয়। আপন চিত্তের বৈভবে, বিশাল মনের ঔদার্যে সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি নিয়েই তিনি অর্থদান করেছেন।

যখনই তার কাছে গিয়েছি প্রতিবারই লিফট পর্যন্ত আমাদের এগিয়ে দিতেন। আমাদের মতো ক্ষুদ্র মানুষকে তিনি স্নেহ করতেন, প্রশ্রয় দিতেন। কারণ আমরা সৃজনশীল কাজ করছি। তিনি শুধুমাত্র কথায় উদার, সত্যনিষ্ঠ, মানবতাবাদী ছিলেন না। তার প্রতিটি কর্মে, চলনে, জীবনাচরণে প্রয়োগ করতেন। মনের দিক থেকে আমৃত্যু তরুণ ছিলেন। বাঙালী সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম প্রতিভূ কবীর চৌধুরীর নিজের ইচ্ছার ওপর জোর ছিল প্রবল। অসম্ভব সুশৃঙ্খল জীবন ছিল। নিয়মিত ভোর পাঁচটায় উঠতেন। ধীরে-সুস্থে লেখার টেবিলে বসতেন। শেষের কয়েক বছর প্রতিদিন তিনি নিয়ম করেই লিখতেন। তার লেখালেখির পরিধি ছিল বিশাল বিপুল। তিনি বাংলা প্রবন্ধ ও অনুবাদ সাহিত্যভা-ার করেছেন ঋদ্ধ। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত তিনি লিখেছেন। রাত দশটা পর্যন্ত কন্যা শাহীনের সঙ্গে গল্প করেছেন। যথারীতি কন্যার সঙ্গে তার প্রিয় গান গেয়েছেন- ‘নাই বা হল পারে যাওয়া’ গানটি। রাত তিনটার দিকে একবার ঘুম থেকে ওঠেন। পানি পান করেন। কাজের মেয়ের সঙ্গে শেষ কথা বলেন, ‘আমি ঘুমোতে গেলাম। তুমি ঘুমিয়ে পড়।’ তারপর সেই ঘুম পৌঁছে গেল চিরঘুমে। ভোরে আর উঠলেন না। পড়ার টেবিলে আর বসলেন না।