২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিশ্বময় আরেক ভয়াবহ মন্দার পদধ্বনি!


[আমরা কি আরেক বৈশ্বিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি? সেই মন্দা কি ১৯৩০ দশকের ভয়াবহ মন্দার মতো হবে? নাকি হবে ২০০৮ সালের মতো? সম্প্রতি ডাভোসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তিন হাজার ব্যাঙ্কার ও সিইওর সমাবেশে বিভিন্ন জনের বক্তব্য থেকে এমন একটা আশঙ্কার সুর বেরিয়ে এসেছে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় পরিবেশিত জেমি ডাউয়ার্ড, ল্যারি ইলিয়ট, রড আর্ডেহালি ও টেরি ম্যাকলিস্টারের ‘দি ওয়ার্ল্ড হ্যাজ প্লিম্পসড ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস বাট ইজ দি ওয়ার্স্ট টু কাম?’ শীর্ষক নিবন্ধে সেই মন্দার পদধ্বনিকে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে তা ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে পরিবেশিত হলো। গতকালের পর আজ প্রকাশিত হলো শেষাংশ]

ডাভোস সম্মেলনে আইএমএফয়ের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ক্রিস্টিন লেগার্ড যদিও তাঁর সংস্কার পক্ষ থেকে পূর্বাভাস দিয়েছেন যে, বিশ্ব অর্থনীতি গত বছরের ৩.১ শতাংশের স্থলে এ বছর ৩.৪ শতাংশ বাড়বে তথাপি তিনি এও স্বীকার করেছেন যে, তাঁর এই পূর্বাভাসের মধ্যে চারটি বড় ধরনের নেতিবাচক ঝুঁকিও বিদ্যমান। যেমন চীনের শ্লথ প্রবৃদ্ধি, উৎপাদকদের ওপর পণ্যের দরপতনের প্রভাব, রাশিয়া ও ব্রাজিলের মতো কতিপয় উদীয়মান বাজার অর্থনীতির নাজুক অবস্থা এবং ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ও ব্যাংক অব জাপানসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও যেখানে বাড়তি প্রণোদনা যুগিয়ে চলছে সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়ালে সেক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় সম্ভাব্য বিপর্যয়। এসব ঝুঁকি সম্পর্কিত উদ্বেগ ক্রমশ জোরালো আকার ধারণ করেছে। থিয়াম উল্লেখ করেছেন যে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে তাদের অর্থ তুলে নিচ্ছে। অশোধিত তেলের দাম যখন ব্যারেলপ্রতি এক শ’ ডলারের ওপরে ছিল সে সময় প্রধান প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ বিপুল অঙ্কের সভরিন অয়েলথ ফান্ড গড়ে তোলে। এসব ফান্ডের মাধ্যমে বেশ কিছু অর্থ বাইরে চলে যায়, এখন তেলের দাম ক্রমাগত পড়তে থাকায় তেলশিল্পে বিনিয়োগও বন্ধ হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে মনস্তত্ত্বেরও একটা ভূমিকা আছে। সভয়ে হুড়মুড় করে চলার ফলে পদদলিত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে।

ডাভোস সম্মেলনে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে বিরাজমান মত হলো এই যে, ২০১৬ সালটা বড়জোর হবে সাফল্য ব্যর্থতায় ভরা এক অস্বাচ্ছন্দ্যকর বছর যেখানে প্রবৃদ্ধি হবে মাঝারি

রকমের এবং বাজারের অবস্থা হবে টালমাটাল। তবে ঘরোয়াভাবে এই ব্যক্তিদের অনেকে অধিকতর নৈরাশ্যবাদী চিত্র তুলে ধরেছেন। তবে যে আশঙ্কাটা ব্যক্ত করা হয়নি তাহলো ২০১৬ সালটি আরেক মন্দার বছরে পরিণত হতে পারে ঠিক সেই ধরনের মন্দার মতো যার পরিণতিতে ২০০৮ সালে লেহম্যান ব্রাদার্সের লালবাতি জ্বলেছিল।

অর্থনীতিবিদ এলবার্ট এডওয়ার্ডস নিঃসন্দেহে এমন মত পোষণ করেন। এক নৈরাজ্যজনক বক্তব্যে তিনি হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে, বিশ্ব ‘আরেকটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে যা প্রতিটি দিক দিয়ে ২০০৮ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কটের মতোই ভয়াবহ।’ তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি যেসব ঘটনা আমরা এখন উন্মোচিত হতে দেখছি তা আমাদের বৈশ্বিক মন্দায় ঠেলে দেবে।’ তিনি উল্লেখ করেন ১৯৩০-এর দশকের মতো বাণিজ্যযুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা যে নেই তা নয়। যেমন রফতানি পণ্য সস্তায় পরিণত করার জন্য চীন তার মুদ্রা ইউয়ানের মূল্যমান হ্রাস করেছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র চীনের ইস্পাত আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দিয়েছে ২৫৬ শতাংশ। এ ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধের পরিণতি ধ্বংসাত্মক হতে পারে। এর মাঝখানে পড়ে শ্রমিকদের জীবনে নাভিশ্বাস উঠবে। সাউথ ওয়েলসের পোর্ট ট্যালবটে টাটা স্টিলস প্ল্যান্টে কর্মরত সাড়ে সাত শ’ শ্রমিককে সম্প্রতি লেঅফ করা হয়েছে। চীনের ইস্পাতের দাম সস্তা হওয়ার অর্থ কি তারা বেশ ভালমতোই জানে।

বিশ্বের প্রধান প্রধান তেল উৎপাদনকারী কোম্পানি উৎপাদন অব্যাহত রেখে বা বেশি বেশি করে উৎপাদন করে বিশ্ববাজারে তেলে সয়লাব করে দিচ্ছে। এতে উত্তর সাগরের অয়েল বিগের শ্রমিকরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মুখীন হয়েছে। তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় উত্তর সাগরে তেল অনুসন্ধান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একই কারণে সেখানকার ডজনখানেক অফশোর রিগ অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে যা ঘটছে তার জন্য কাকে দায়ী করা যায় সে ব্যাপারে এডওয়ার্ডসের বক্তব্য পরিষ্কার। সেটা হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ‘কোয়ান্টিটেটিভ ইজিং’ নিয়োগ অর্থাৎ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকে বস্তু বা সিকিউরিটি কিনে নিচ্ছে। উদ্দেশ্য সেই ব্যাংকগুলোর হাতে নগদ অর্থ দেয়া যাতে করে ব্যাংকগুলো আবার গ্রাহকদের ঋণ দিতে পারে। এর ফলে সারা বিশ্বে এ্যাসেটের দাম বেড়ে গেছে। এডওয়ার্ডস হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, এ্যাসেটের দাম ফুলে ফেঁপে উঠেছিল। তা এখন ফানুসের মতো ফেটে যাওয়ায় সমৃদ্ধির ইলিউশন ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে।

অনেক অর্থনীতিবিদই অবশ্য এডওয়ার্ডসের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তবে অধিকতর মডারেট ভাষ্যকাররাও এই ভেবে উদ্বিগ্ন যে, অর্থনীতির টেকনিক প্লেটগুলোর স্থানচ্যুতি ঘটতে শুরু করেছে। অর্থাৎ অর্থনীতির ক্ষেত্রে একটা ভূমিকম্পের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এদের মধ্যে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিপলিজও আছেন। স্টিগলিজ কদিন আগে বলেছেন, “এমন এক যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা বিদ্যমান যে অধিকতর মৌলিক একটা কিছু চলছে। এক ধরনের মাত্রাতিরিক্ত উৎফুল্লভাব ছিল। ‘কোয়ান্টিটিটিভ ইজিং’ নীতির মাধ্যমে এ্যাসেটের দাম নিঃসন্দেহে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে প্রকৃত অর্থনীতিকে স্ফীত করে তুলতে সেটা খুব একটা কাজে দেয়নি। তাহলে ঐ যে এতসব নগদ অর্থ সেগুলো গেল কোথায়? কিছুটা ঢুকে গেছে ব্যালেন্স শীটের মধ্যে এবং কিছুটা চলে গেছে এ্যাসেটের দাম বাড়িয়ে দিতে।

স্টিগলিজ বলেন, “আমিসহ অনেক বিশ্লেষকের বিশ্বাস, বাজারের একটা বড় ধরনের সংশোধন ঘটতে চলেছে। কখন সেটা হবে বলা খুব কঠিন। যখনই এমন বড় ধরনের সংশোধন ঘটবে তখনই একটা উত্থান পতন, একটা তোলপাড় হবে।” বাজারগুলোতে তোলপাড় সৃষ্টি হওয়ায়, বিশেষ করে যে গতিতে এই তোলপাড় উঠেছে তাতে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড বেকায়দায় পড়ে গেছে। গত বছরের শেষ দিকেও ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে ব্যাংকটির বেশ ফুরফুরে ভাব ছিল। গবর্নর ম্যাক কারণি এখন বলছেন যে, ‘যুক্তরাজ্যে ব্যাংকের সুদের হার বাড়ানোর সময় এটা নয়।’ এর মধ্য দিয়ে বিব্রতকরভাবে স্বীকার করে নেয়া হলে সে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আর যাই হোক না কেন সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেনি। সম্প্রতি প্রকাশিত পরিসংখ্যানে এই বক্তব্যের সত্যতা মিলেছে। তাতে দেখা যায় যে ব্রিটেনে বড়দিনে খুচরা কেনাকাটার পেছনে ব্যয় বছরওয়ারী হিসাবে গত ৬ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কম হয়েছে। এতে আরও প্রকাশ পেয়েছে যে, ব্রিটেনের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ছে।

এতসব নিরানন্দ চিত্রের মধ্যে ভরসা পাওয়ার মতো কথা শুনিয়েছেন অন্যরা। যেমন জেমস মরগানের এ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট টিম। তাদের মতে, খারাপ কবরগুলোর বেশিরভাগ তো ইতোমধ্যে বাজারে যা প্রভাব ফেলার ফেলেছে। চীনের প্রকৃতি মন্থর হয়ে পড়লেও এখনও অন্য যে কোন দেশের চেয়ে বেশিই আছে। আগামী পাঁচ বছরে এর অর্থনীতি ৫ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি প্রসারিত হতে পারে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

সূত্র : গার্ডিয়ান