১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিশ্বময় আরেক ভয়াবহ মন্দার পদধ্বনি! -অনুবাদ : এনামুল হক


[আমরা কি আরেক বৈশ্বিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি? সেই মন্দা কি ১৯৩০ দশকের ভয়াবহ মন্দার মতো হবে? নাকি হবে ২০০৮ সালের মতো? সম্প্রতি ডাভোসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তিন হাজার ব্যাঙ্কার ও সিইওর সমাবেশে বিভিন্ন জনের বক্তব্য থেকে এমন একটা আশঙ্কার সুর বেরিয়ে এসেছে। গার্ডিয়ান পত্রিকায় পরিবেশিত জেমি ডাউয়ার্ড, ল্যারি ইলিয়ট, রড আর্ডেহালি ও টেরি ম্যাকলিস্টারের ‘দি ওয়ার্ল্ড হ্যাজ প্লিম্পসড ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস বাট ইজ দি ওয়ার্স্ট টু কাম?’ শীর্ষক নিবন্ধে সেই মন্দার পদধ্বনিকে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে তা ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে পরিবেশিত হলো।]

তেলের দরপতন এবং চীন সম্পর্কে সংশয়- আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রগুলোতে বিপদসঙ্কেত বেজে উঠছে। পরিস্থিতি হয়ত এক পর্যায়ে স্থিতিশীল হয়ে আসবে। তবে কারোর কারোর আশঙ্কা আমরা বিশ্বব্যাপী আরেক মঙ্গার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি।

এর মধ্যে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের স্কী রিসর্ট ডাভোসে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক ব্যবসার রথী-মহারথীদের বার্ষিক সমাবেশ। এ উপলক্ষে ৩ হাজার ব্যাংকার ও সিইও সেখানে সমবেত হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রে বয়ে চলেছিল ভয়ঙ্কর তুষার ঝড়। সেদিকে তাদের ছিল বিশেষ দৃষ্টি। কারণ এ সপ্তাহান্তে তেলের দর পড়তে পড়তে ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে চলে আসলেও উত্তর আমেরিকায় আবার এর দর বাড়ছিল। কেননা তুষার ঝড়ের কারণে তেলের চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল।

বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলোও হারানো ভূমি আঁকড়ে ধরেছিল। অনেক বাজারে আবার এই আভাস থেকে তেজীভাব সঞ্চার হয়েছিল যে, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইউরোজোনের ধসেপড়া অর্থনীতি জোরদার করে তুলতে আরও পদক্ষেপ নেয়ার কথা ভাবছে।

আরব উপসাগর থেকে ওয়াল স্ট্রীট পর্যন্ত গোটা তল্লাট থেকে কয়েকদিন ধরে একটানা খারাপ সংবাদ আসছিল। তার ওপর বোমা ফাটানোর এই ঘোষণা আসে যে চীনের জিডিপি ২০১৫ সালে মাত্র ৬.৯ শতাংশ বেড়েছে। যা কিনা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই সমস্ত টানা খারাপ সংবাদগুলোর কারণে বাজারগুলো যে মরিয়া হয়ে উঠেছিল এ হলো তারই লক্ষণ।

ডাভোস সম্মেলন শেষে ক্রেডিট সুইসের প্রধান নির্বাহী তিদজেন থিয়ামের বক্তব্য থেকে সম্মেলনের মনমানসিকতা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজার’ চীনকে নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। চীনের তথ্য পরিসংখ্যানে দেখানো হচ্ছিল যে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের কাছাকাছি ঘটে চলেছে। কিন্তু এই পরিসংখ্যান নিয়ে ব্যবসায়ীরা যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিল। তাদের ধারণা ছিল যে প্রবৃদ্ধির ঐ লক্ষ্য অর্জন চীনের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে কিংবা প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাসও পেতে পারে। তাই যদি হয় তবে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর ওপর এর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এমনও আশঙ্কা আছে যে আমরা এক বৈশ্বিক মঙ্গার দিকে এগিয়ে চলেছি।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদের হার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও এবং শত শত কোটি পাউন্ড কাগজী মুদ্রা ছাপার কাজে ব্যয়িত হওয়া সত্ত্বেও মুমূর্ষু বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চারের দায়িত্ব যেসব প্রতিষ্ঠানের তাদের হাতে অস্ত্র তেমন একটা নেই। অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অস্ত্রভা-ার উল্লেখযোগ্যভাবে নিঃশেষিত হয়েছে এবং অবিশ্বাস্য রকমের জটিল স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী যেসব চ্যালেঞ্জ তাদের সামনে রয়েছে সেগুলো মোকাবেলা করার মতো নানা ধরনের বিকল্প পথের অস্তিত্ব এখন আর নেই। এসব কিছু বিবেচনায় নিলে আমার মতে বিশ্ব অর্থনীতি এখন অতি নাজুক অবস্থায় আছে। সামান্য একটু এদিক ওদিক হলেই লঙ্কাকা- বেধে যেতে পারে। সংক্ষেপে বলতে গেলে অতি সামান্য অভিঘাত বা অস্থিরতা অতি মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এই মন্তব্য করেছেন এরিক আর পিটারসন নামে এক বিশেষজ্ঞ।

ইরান উপকূলের অদূরে হরমুজ প্রণালীতে আনুমানিক পাঁচ কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে বিশাল বিশাল এক একটি ট্যাঙ্কার তাদের গন্তব্য কোথায় তা জানবার অপেক্ষায় বসে আছে। অবরোধ উঠে যাওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদন দেশগুলোর অন্যতম ইরানে আবার প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ফলে সেদেশ থেকে নতুন নতুন ব্যবসার সুযোগ উন্মোচিত হয়েছে। তবে এই নতুন ব্যবসার ব্যাপারে লন্ডনের শিপ ব্রোকারদের সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ শিপ ব্রোকার ক্লার্কসনের ট্যাঙ্কার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে ইরানের অশোধিত তেল পশ্চিমমুখী কোন গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুয়েজ ম্যাক্স সাইজের একটি ট্যাঙ্কার ভাড়া করার অনুরোধ ইতোমধ্যেই তাদের নজরে এসেছে। এক ব্রোকারের ভাষায় পরিস্থিতি এ মুহূর্তে কিছুটা ধোঁয়াটে। তবে সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলতে সময় লাগবে।

কিন্তু তেলের বাজারে ইয়ানের পুনঃপ্রবেশ ইতোমধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। তবে যে সময় এটা ঘটেছে তার মতো খারাপ সময় আর হতে পারে না, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে যে এ বছর চাহিদার অতিরিক্ত সরবরাহে তেলের বাজার সয়লাব হয়ে যেতে পারে। ফ্র্যাকিং পদ্ধতিতে তেল আহরণে যুক্তরাষ্ট্র যে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে তার ফলে বিশ্বের এই পরাশক্তি এখন আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর এত প্রবলরূপে নির্ভরশীল নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সৌদি আরব ও অন্যান্য প্রধান প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ তেল আহরণে আগের মতোই অব্যাহত রেখেছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে বাড়িয়েও দিয়েছে। ব্যাপারটা এমন এক সময় ঘটছে যখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ছে এবং তার ফলে তেল বা জ্বালানির চাহিদাও হ্রাস পাচ্ছে।

আর এ ক্ষেত্রে শুধু যে চীন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তা নয়। আইএমএফয়ের সর্বশেষ বৈশ্বিক পূর্বাভাসে দেখা যায় অনেক উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বিশেষ করে রাশিয়া, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রবৃদ্ধির চেহারা নিম্নগামী। বৈশ্বিক অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়ার ফলে আকরিক লোহা আহরণকারী ও ইস্পাত উৎপাদনকারীর মতো পণ্য উৎপাদক দেশগুলোর মুনাফা অর্জন হুমকির মুখে পড়েছে। অনেক দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন ঘটেছে।

লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের অর্থনীতির অধ্যাপক ওউটার ডেন হান এক নিরানন্দ অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, “অর্থনীতির পুনরুদ্ধার পরিস্থিতিটা নাজুক থাকায় এসব দেশে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা বেড়েছে এবং তার প্রভাবটা পড়ছে শেয়ারবাজারের ওপর। আর বাজারের প্রতিক্রিয়াটা যদি বাড়াবাড়ি রকমের হয় তাহলে শেয়ারের দরপতন অর্থনীতির জন্য খারাপ হতে পারে। সেক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার থেমে যেতে পারে এবং আরেক মন্দা আবির্ভাব ঘটতে পারে। আমি রোজ কেয়ামতের সম্ভাবনা দেখছি না তবে মনে হচ্ছে ধস নামার ঝুঁকিগুলো ক্রমশ বড় আকার ধারণ করছে।

প্রধান উদ্বেগের বিষয়টা হলো এই যে, ২০০৮ সালের ধসের পর অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের ব্যাপারটা এক দুর্বল ভিত্তির ওপর গড়ে উঠেছে। ডেন হান বলেন, আমরা এই বড় ধরনের মন্দার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছি এবং মন্দার জন্য দায়ী সমস্যাবলীর অনেক সত্যিকার অর্থে দূর করা যায়নি। আর্থিক খাতের অবস্থা খুব একটা বদলেছে বলে মনে হয় না। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র প্রবৃদ্ধি ভালই হয়েছে। তবে অতীতে মন্দা থেকে পুনরুদ্ধারের সময় যে ধরনের প্রবৃদ্ধি আমরা হতে দেখেছি এটা সেই ধরনের প্রবৃদ্ধি নয়।’

চলবে...

সূত্র : গার্ডিয়ান