২৩ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

দুই সপ্তাহেও হদিস মেলেনি ছাত্রলীগ নেতা তপুর


দুই সপ্তাহেও হদিস মেলেনি ছাত্রলীগ নেতা তপুর

শংকর কুমার দে ॥ রাজধানীর রামপুরা থানা ছাত্রলীগ সভাপতি এস এম মোয়াজ্জেম হোসেন তপু নিখোঁজ হওয়া নিয়ে রহস্য ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহেও হদিস মেলেনি তার। তপু কি অপহৃত হয়েছেন? নাকি তাকে আইনশৃঙ্খলার নাম ভাঙ্গিয়ে তুলে নিয়ে জিম্মি করা হয়েছে? আদৌ বেঁচে আছেন কি? নাকি গুম করে ফেলা হয়েছে? তদন্তে ঘুরপাক খাচ্ছে এসব প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পুুলিশের আইজি, ডিএমপি কমিশনার, র‌্যাবের ডিজি এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের কাছে তাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি মিনতি জানানো সাহায্য কামনা করেছেন তার পরিবার। রহস্যজনক অন্তর্ধানের দুই সপ্তাহ পরও তাকে উদ্ধার করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজধানীর ভাটারা থানায় ছাত্রলীগ নেতা তপু অন্তর্ধান হওয়ার বিষয়ে প্রথমে একটি জেনারেল ডায়েরি (জিডি) করা হয় রাজধানীর ভাটারা থানায়। তার অন্তর্ধান রহস্যের কূল-কিনারা না হওয়ায় অপহরণের অভিযোগ এনে গত ১ ফেব্রুয়ারি মামলা করেছেন তার মা সালেহা বেগম। মামলার এজাহারে অপহরণের অভিযোগ আনা হয় আট জনের বিরুদ্ধে।

অপহরণ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সন্দেহে তার মা সালেহা বেগম যে আট জনের নাম এজাহারে উল্লেখ করেছেন তারা হচ্ছেন ইমন, তাজুল ইসলাম, শিবলু, তানিম, রইছ উদ্দিন রইছ, অর্ণব, জুয়েল ও নিশি।

রাজধানীর ভাটারা থানায় তপুর মা সালেহা বেগমের দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করেছেন, চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের কাছিয়াপাড়া গ্রাম থেকে গত ২৬ জানুয়ারি সকাল ৯টার দিকে লঞ্চে উঠে তপু। রাজধানীর সদরঘাটে এসে নামেন দুপুর ১টায়। আগে থেকে সেখানে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন পূর্ব পরিচিত তাজুল ইসলাম। তাজুল কালো রঙের মোটরসাইকেলে উঠিয়ে ভাটারা এলাকায় নিয়ে আসেন তপুকে। তাজুলের বন্ধু অর্ণবের বাসায় অবস্থান করেন তারা। ওই বাসা থেকে তাজুল তার মোটরসাইকেলে করে বাড্ডায় সুবাস্তুটাওয়ারের তিন তলায় নিয়ে যায় তপুকে। সেখান থেকে আবার তপুকে নেয়া হয় অজ্ঞাতস্থানে।

তপুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তপুকে ফোন করে গ্রামের বাড়ি থেকে আনা হয় ঢাকায়। তাকে ঢাকায় আসতে বলে তাজুল ও ইমন। তপু লঞ্চে ঢাকার সদরঘাটে এসে নামেন। সদরঘাটে আগে থেকে অপেক্ষায় থাকা তাজুল তপুকে মোটরসাইকেলে উঠিয়ে ভাটারা এলাকায় নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অর্ণবের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে তপুকে নেশাজাতীয় কিছু একটা খাওয়ানো হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় অর্ণবের বাসায় নিশি নামে এক তরুণী তাদের সঙ্গে যোগ দেন। নিশি ওই বাসায় যাওয়ার পর ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। তপুকে অচেতন অবস্থায় নিশির জিম্মায় রেখে দেন তাজুল, ইমন, অর্ণবরা। রাত পৌনে ১১টার দিকে সাদা পোশাকে তিন ব্যক্তি ওই বাসায় ঢোকেন।

তপুর পরিবার নিশির সঙ্গে কিছু কথা বলার উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, তপুকে অপহরণের প্রস্তুতি নেন সাদা পোশাকের তিন ব্যক্তি। ওই তিনজনের মধ্যে একজনের কাছে হাতকড়া ছিল। তপুকে ধরে নেয়ার আগে একজন জানতে চান, তপু ঢাকায় কবে এসেছেন। তাকে তারা খুঁজছেন বলেও জানায় তারা। ট্রাউজার বা শীতের কাপড় থাকলে সঙ্গে নিতে বলেন তারা। এরপরই তারা তপুকে ধরে নিয়ে যান।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) মারুফ হোসেন সরদার দৈনিক জনকণ্ঠকে জানান, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কিংবা ডিএমপিতে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি তারা তপুকে গ্রেফতার বা অপহরণ করেনি। এ বিষয়ে কোন খোঁজখবর জানেন না তারা। রাজধানীর ভাটারা থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে অপহরণের ঘটনায় যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের গ্রেফতার করে তপুকে উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে বলে জানান ডিবির উপকমিশনার।

রামপুরা থানার ওসি নুরুল মুত্তাকিন গণমাধ্যমকে বলেন, গত ২৬ জানুয়ারি এ্যাপোলো হাসপাতালের পেছনের একটি তিনতলা বাসা থেকে নিশি নামের এক তরুণীর সামনেই সাদা পোশাকের তিনজন তপুকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ পেয়েছেন। অপহৃত তপুকে উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। মামলার এজাহারে পরিবার যাদের নাম দিয়ে অভিযোগ করেছে তাদের সম্পর্কে তথ্য যাচাই-বাছাই, জিজ্ঞাসাবাদ ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান ভাটারা থানার পুলিশ কর্মকর্তা।

তপুর পরিবার সূত্রের দাবি, রাত পৌনে ১২টার দিকে তপুর বড় ভাই চিকিৎসক মাইনুল হোসেনকে ফোন করে ইমন জানান, তপুকে তিনজন লোক ভয় দেখিয়ে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এরপর নিশি নামের ওই মেয়েটিও তপুকে অপহরণের ঘটনার বিস্তারিত জানান।

মাইনুল হোসেন দাবি করেন, তপুকে কৌশলে তাজুল, ইমন ও নিশির মাধ্যমে চাঁদপুর থেকে ঢাকায় আনা হয়। এরপর পূর্ব পরিকল্পিতভাবে অপহরণ করা হয়। ঘটনায় ডিবি জড়িত থাকতে পারে। তাজুল, ইমন ও নিশি ডিবির সোর্স হয়ে থাকতে পারেন। এসব কথা তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হচ্ছে।

তপুর বড় ভাই মাইনুল হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তপু ভাল ছাত্র ছিল। অনার্সে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে এমবিএ করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তার বিয়ের কথা চলছিল। আমার পরিবারের সবাই শিক্ষিত। আমি নিজে ডাক্তার। ঢাকায় আগে থেকেই আমাদের নিজেদের বাড়ি আছে। আমার বাবা-মা হজ করেছেন। আমার ভাইকে অন্যায়ভাবে অপহরণ করা হয়েছে। রামপুরা থানা এলাকায় পুলিশের সাবেক এক উর্ধতন কর্মকর্তা খুনের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করার পর তপুকেও ওই ঘটনায় জড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। রাজনৈতিক কারণে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হলেও তা সফল হয়নি। এখন আবার নতুন করে এ ধরনের ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে কিনা তা তদন্ত হলেই প্রকৃত ঘটনা বের হয়ে আসবে বলে তপুর পরিবারের দাবি। এতদিন রামপুরা থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। তপু ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান তপুর বড় ভাই।

তপুর পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক কারণে স্থানীয় যুবলীগের সঙ্গে তপুর বিরোধ ছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের লোকজনের কারণেই পুলিশ প্রশাসনও তপুর বিপক্ষে ছিল। তপু অপহরণ হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই স্থানীয় যুবলীগ পুলিশের পাহারায় তাদের রামপুরার বাসার সামনে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয়। এছাড়া পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে তপুর বিরুদ্ধে এলাকায় পোস্টারিংও করেছে। যুবলীগ নেতাদের ইন্ধনে তপুর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলাও করা হয়। গ্রেফতারের ভয়ে তপু বাসায় থাকত না। স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের ইন্ধনে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার একদল সদস্য এই অপহরণের ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন।

তপু রহস্যজনক অন্তর্ধান হওয়ার পর থেকেই তার পরিবারের কান্না থামছে না। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট তপু। সবার ছোট হওয়ায় আদরের সন্তানের কথা মনে করে কান্না থামাতে পারছেন না তার ষাটোর্ধ বয়সী বাবা মোশারফ হোসেন। মা সালেহা বেগম শোকে কাতর, পাগলপ্রায়। তপুর অন্তর্ধানে পর থেকে রামপুরার বাসাটি যেন এক মৃতপুরী। মা-বাবা, ভাই-বোন সবারই আশা একদিন ফিরে আসবে তপু। প্রিয় সন্তানের মুখ দেখতে পাবে। আত্মীয়স্বজন যারাই সান্ত¡না দিতে যাচ্ছেন তাদেরই তপুর মা-বাবা পাগলের মতো প্রলাপ বকছেন আর বলছেন, আমার তপুকে তোমরা কেউ দেখছ? আমার তপুকে এনে দাও না?

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: