১৫ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জঙ্গী উত্থানে পাকিস্তানের হাত আছে ॥ নিউইয়র্ক টাইমস


তৌহিদুর রহমান ॥ সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ প্রতিরোধে বাংলাদেশকে অসহযোগিতা করছে পাকিস্তান। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রশ্নে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ছাড়াও বিভিন্ন দেশকে পাকিস্তান কোন প্রকার সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার বিভিন্ন ফোরামেও দেশটির অসহযোগিতা বাড়ছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিযোগ- পাকিস্তানের অসহযোগিতার কারণেই এ অঞ্চলে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটছে। এছাড়া ঢাকা-ইসলামাবাদের মধ্যে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক টানাপোড়েনে নিরাপত্তা ইস্যুতে পাকিস্তানের অসহযোগিতা ধীরে ধীরে আরও বাড়ছে। একাধিক কূটনৈতিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এদিকে রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়- আইএসসহ বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠীর উত্থানে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাত রয়েছে।

সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনের সার্কের বেশ কয়েকটি ফোরাম রয়েছে। ১৯৯৫ সালে কলম্বোতে সার্কভুক্ত দেশের জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি ফোরাম গঠিত হয়। এ পর্যন্ত ওই ফোরামের চারটি বৈঠক হয়েছে। ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল কলম্বোতে সর্বশেষ বৈঠক হয়। তবে প্রতিটি বৈঠকেই অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তান এ ফোরামকে যথাযথ সহযোগিতা করছে না।

এদিকে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনের লক্ষ্যে ১৯৮৭ সালের ৪ নবেম্বর আরেকটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তি অনুযায়ী সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য আদানপ্রদান করা হবে। এছাড়া ওই চুক্তিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশু পাচারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সার্কের একাধিক বৈঠকে সদস্য দেশগুলো বরাবরই সহযোগিতা না করার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছে।

দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনের লক্ষ্যে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের ভূমিকাকেই প্রাধান্য দেয়া হয়। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে এ চারটি দেশেই জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। সে কারণে চারটি দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অসহযোগিতার কারণেই জঙ্গীবাদ পুরোপুরি দমন করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে।

সার্কের সদস্য দেশ হিসেবে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সহযোগিতা করার কথা। তবে জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বাংলাদেশকে কোন সহযোগিতা করছে না পাকিস্তান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তথ্য চাওয়ার পরে বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও পাকিস্তানের দিক থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা-ইসলামাবাদের মধ্যে টানাপোড়েনে এক্ষেত্রে অসহযোগিতা আরও বাড়ছে। আবার একদিকে পাকিস্তান কোন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা না করে উল্টো ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তারাই জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কাজে সরাসরি মদদ দিয়ে থাকেন। যে কারণে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদকে বহিষ্কার করা হয়। আর এই বহিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় ইসলামাবাদে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে বহিষ্কার করে পাকিস্তান।

দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে দুই দেশই সহযোগিতা জোরদার করেছে। দুই দেশের জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নিয়মিত তথ্য আদানপ্রদান করা হচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে। এছাড়া সার্কের সদস্য দেশ না হলেও প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনের বিষয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা জোরদার করতে চায়। তবে পাকিস্তানের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ও ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের জাল টাকা তৈরি, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ইত্যাদির বিস্তারে পাকিস্তানের ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পেছনে মদদ দেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জঙ্গীগোষ্ঠীকেও মদদ দিয়ে থাকে পাকিস্তান।

সূত্র জানায়, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন সন্ত্রাস ও জঙ্গীগোষ্ঠীকে পাকিস্তান মদদ দিয়ে আসছে। আল কায়েদা, লস্কর-ই-তৈয়বা, জইশ-ই-মোহাম্মদসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পেছনে রয়েছে পাকিস্তানের মদদ। আর পাকিস্তানের কারণেই ভারত, বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানে জঙ্গীবাদের ঝুঁকি বাড়ছে। সম্প্রতি ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের পাঠানকোট বিমানবন্দরে হামলা হয়। হামলাকারীরা পাকিস্তানের একটি বিমান ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছিল বলে দাবি করেছে ভারত। জইশ-ই-মোহাম্মদের জঙ্গীরা পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এ হামলা চালায় বলে জানিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী।

এদিকে গত বছর আগস্টে কাবুলে বোমা হামলায় ৫৬ নাগরিক মারা যান। সে সময় আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি সরাসরি পাকিস্তানকে দোষারোপ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, পাকিস্তানের প্রশ্রয় পেয়ে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আফগানিস্তানকে অস্থিতিশীল করার জন্য পাকিস্তান জঙ্গীবাদ উস্কে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন আফগান প্রেসিডেন্ট।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঘিরে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন তলানিতে ঠেকেছে। দুই দেশের মধ্যে এখন নামমাত্র কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে সন্ত্রাস দমন ইস্যুতে পাকিস্তানের অসহযোগিতা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে রবিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছেÑ মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়ায় তৎপর জিহাদীগোষ্ঠী আইএসসহ বিশ্বের বিভিন্ন জিহাদীগোষ্ঠীর উত্থানের জন্য পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার হাত রয়েছে। শুধু তাই নয়, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এসব গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। আফগানিস্তানসহ বিশ্বের নানা যুদ্ধে দেশটির হস্তক্ষেপের বিষয়টি সংবাদ বিশ্লেষণে বিশেষ গুরুত্ব পায়।

‘পাকিস্তানের হাত ধরে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জিহাদের উত্থান’ শীর্ষক এ সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়Ñ আফগানিস্তানে পাকিস্তানই তালেবান হামলার সুযোগ করে দিয়েছেÑ এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পেয়েছেন। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ ধরনের ব্যবহার শুধু আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেশটি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক যুদ্ধ বা দ্বন্দ্বেও হস্তক্ষেপ করছে। এতে বলা হয়, দেশটির গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক জিহাদী গোষ্ঠীগুলোর ব্যবস্থাপক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট রয়েছে। এমনকি মত আছে যে, আইএসের উত্থানের পেছনেও তারা জড়িত।

সংবাদ বিশ্লেষণে বলা হয়, আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আশঙ্কা করেছেন, তার দেশটি ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত টিকে নাও থাকতে পারে। আর পাকিস্তান তালেবান বাহিনীর মাধ্যমে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। তালেবান উত্থানের পেছনে পাকিস্তানের যে হাত রয়েছে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের হাতে যথেষ্ঠ প্রমাণ রয়েছে। তালেবান দমনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পক্ষ থেকে পাকিস্তানকে যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, ইসলামাবাদ সে বিষয়ে কিছুই করছে না বলে অভিযোগ করে আসছে আফগানিস্তান। উল্টো তালেবানদের উত্থানে পৃষ্ঠপোষকতা করছে পাকিস্তান।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা আফগান নেতৃত্বের সমালোচনা করে বলেছেন, শুধু যে পাকিস্তানের কারণেই আফগানিস্তানে জঙ্গীবাদের উত্থান হচ্ছে তেমনটি নয়। প্রতিবেশী দেশকে দোষারোপ করার পাশাপাশি অন্যান্য বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক বিভাজন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, যুদ্ধাবাজিতা ও দুর্নীতি এসবও এক্ষেত্রে দায়ী।

সংবাদ বিশ্লেষক নিজের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে বলেন, ২০১৩ সালে পাকিস্তানের একটি মাদ্রাসা পরিদর্শন করেছিলাম। সেখানে পাকিস্তানের পাশাপাশি আফগানিস্তানের তালেবানদেরও প্রশিক্ষণ দেয়া হতো। ওই মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা নিয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশ করত তালেবানরা। মাদ্রাসা সুপার সৈয়দ ইউসুফ শাহ বলেছিলেন, তিনি বিশ্বাস করেন, তালেবানরা একদিন ক্ষমতায় আসবে। আর পাকিস্তানের পাশাপাশি আফগানিস্তানেরও সাধারণ মানুষের তালেবানদের প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

সাংবাদিক ক্যারলোটা গলের ওই সংবাদ বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়Ñ মার্কিন দৈনিকটির সংবাদ বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দীর্ঘ হাতিয়ার হিসেবে পরিচিত দেশটির মাদ্রাসাগুলো প্রস্তুত ও উত্তরাঞ্চলীয় আফগানিস্তানের উপজাতির লোকদের জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: