১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

অসুস্থ রাজনীতি


সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় এবং স্বাধীনতা আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনকে ম্লান প্রতিপন্ন করার জন্য স্বাধীনতার পর থেকে বিগত সাড়ে চার দশকে স্বাধীনতা বিরোধীরা নানাভাবে অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক উস্কে দিয়েছেন এক নেত্রী, যার প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। কয়েকদিন আগেও একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিক যথার্থই বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে রাজনীতি মানে রুগ্ন রাজনীতির লক্ষণ। এটা কোন বিতর্কের বিষয় হতে পারে না। এই বিতর্কটি জিইয়ে রেখে একটি মহল ফায়দা লুটতে চায়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, যে যেই দল করুক না কেন বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে সংবিধান অমান্য করার কোন অধিকার নেই। সংবিধান সবাইকে মানতে হবে।

কিছুদিন আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। হঠাৎ করে সেদিন কেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন তা বোধগম্য হয়নি অনেকেরই। ফলে স্বভাবতই এর জের ধরে বিতর্ক ও বাদানুবাদ শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সর্বোপরি সরকারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এ নিয়ে জানিয়েছে তীব্র প্রতিবাদ। জনসভা, মিছিল মিটিংও হয়েছে রাজধানীসহ সারাদেশে। একাধিক মামলা-মোকদ্দমাও হয়েছে। সর্বশেষ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এহেন বক্তব্য রাখায় রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আমলে নিয়ে আদালত সমনও জারি করেছে। খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে শুনানি হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এবং বাঙালী জাতির চিরদিনের অহঙ্কার ও গৌরবের। সবাই জানেন অন্ততপক্ষে ত্রিশ লাখ শহীদান ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা। এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সর্বজনীন সত্য। সংবিধানেও বিষয়টি লিপিবদ্ধ আছে। এ বিষয়ে সামান্যতম সন্দেহ নেই যে, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে বা যারা বিতর্ক সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালায় তারা সংবিধানবিরোধী। প্রকারান্তরে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে স্বীকার করতে চায় না।

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার এক রায়ে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহীদ হওয়া ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। এই ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র আবেগ ও গৌরবের মধ্যে মিশে আছে। সে অবস্থায় শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পর তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাষ্ট্রদোহ মামলা বিবেচনা করতে হবে।

মানবতাবিরোধীও স্বাধীনতাবিরোধী কর্মকা-ে অভিযুক্ত ও ফাঁসির দ-প্রাপ্ত সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদের মৃত্যুদ- কার্যকরের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের নিদারুণ অবনতি ঘটেছে। একাত্তরের পরাজিত শক্তি হিসেবে পাকিস্তান বরাবরই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। সে দেশের সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে এ কথাও বলার অপচেষ্টা করা হয় যে, একাত্তরে বাংলাদেশে কোন গণহত্যা ঘটেনি। সম্প্রতি ঢাকাস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনের একাধিক কর্মকর্তার জঙ্গী অর্থায়নসহ বাংলাদেশবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে বহিষ্কার-পাল্টা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটেছে। জাতীয় সংসদসহ বিভিন্ন মিছিল মিটিং সমাবেশে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবিও উঠেছে। এ অবস্থায় খালেদা জিয়ার বক্তব্য কাদের স্বার্থ রক্ষায় তা সহজেই অনুমেয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ যেহেতু একটি মীমাংসিত বিষয় এবং ত্রিশ লাখ শহীদানসহ দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানিও, সেহেতু তা নিয়ে কারও কোন বিতর্ক বা বক্তব্য রাখার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে যথাসম্ভব আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। তাহলেই দেশ এ ধরনের অসুস্থ বা রুগ্ন রাজনীতি থেকে মুক্ত হবে।