২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড সেনা কর্মকর্তাদের বয়ান -মুনতাসীর মামুন


(৭ ফেব্রুয়ারির পর)

আবদুর রাজ্জাক যিনি ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান, তিনিও আমাকে আলোচনায় জানিয়েছিলেন, কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। সাখাওয়াত লিখেছেন, পুরো পরিবেশে কোনো শৃঙ্খলা ছিল না। “মনে হচ্ছিল সমগ্র দেশ কয়েকজন মেজরের হাতে জিম্মি আর সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা বেমালুম সহাস্যে সহ্য করে যাচ্ছিলেন চরম স্বেচ্ছাচারিতা যার প্রতিবাদও করার সাহস কেউ করেননি। আমার মনে হলো সকলেই স্রোতের সাথে গা এলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। আবার অনেকে অভ্যুত্থানের নায়কদের চোখে পড়ার জন্য স্বউদ্যোগেই অনেক কিছু করার চেষ্টা করেন। অনেকে একমতও প্রকাশ করেন। মনে হচ্ছিল যেন একটা free for us পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল।” [পৃ. ৪৭]

এ পরিপ্রেক্ষিতেই আসে জেনারেল জিয়ার কথা। সাখাওয়াত সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন নিজের দেখাশোনার অভিজ্ঞতা ও যারা এ সম্পর্কে লিখেছেন তাদের তথ্য থেকে। ডালিম সাখাওয়াতকে জানিয়েছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন এবং সিনিয়র অফিসারদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। উচ্চপদস্থ অনেক অফিসারের সঙ্গে আলোচনা সূত্রে জেনেছি, জিয়া প্রায়ই তাদের কাছে সেনাপ্রধান হতে না পারার ক্ষোভ প্রকাশ করতেন এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রাখতে চাইতেন। সাখাওয়াত লিখেছেন, এ রকম একটা খবর শুনে জিয়া নির্বিকার ছিলেন কীভাবে? “How could remained so unnerved after hearing such as shocking news without any reaction.” [পৃ. ৫০]

‘র’ সম্পর্কে লেখা এক বইয়ে অলোক রায় লিখেছেন, অভ্যুত্থানের আগে সে বিষয়ে আলোচনার জন্য জিয়ার বাসায় ফারুক, রশীদ ও জেনারেল ওসমানী বৈঠক করেছিলেন। এ খবর পাওয়ার পর র-এর প্রধান কাও এসে কথা পর্যন্ত বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারো কথায়ই কর্ণপাত করেননি। আর সেনাবাহিনী মানসিকভাবে যে পাকিস্তানের প্রতি অনুরক্ত ছিল তার উদাহরণ সাখাওয়াত হোসেনের মন্তব্যÑ“এটা ঠিক যে, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় বেশিরভাগ সদস্যই ২৫ বছরের চুক্তিকে সহজভাবে নিতে পারেননি এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগকে ভারতঘেঁষা মনে করতেন। আর এও বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের কারণেই বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে স্বাভাবিকভাবে গড়তে দেয়া হয়নি।” [পৃ. ৫৪]

কর্নেল তাহেরের ভূমিকারও উল্লেখ করেছেন সাখাওয়াত। দেখা যায়, কর্নেল তাহেরের সঙ্গে সখ্য ছিল জিয়ার এবং সে কারণে তিনি জিয়ার সাহায্য চেয়েছিলেন। এখানে একটি প্রশ্ন অনুক্ত থেকে যায়, তাহলো কর্নেল তাহের যে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে চেয়েছিলেন তা তো বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধেই ছিল। এবং তিনি জিয়ার সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন বটে কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের রুখে দাঁড়াননি বরং তার অনুগতরা খালেদ মোশাররফকে হত্যা করেছে।

সাখাওয়াত হোসেন এরপর জিয়া হত্যার কথাও বর্ণনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরবর্তী সময় থেকে জিয়া পর্যন্ত সময়টুকুতে তিনি যা দেখেছেন স্মৃতিকথার আকারে তা লিখেছেন। এর নির্যাস ক্রমাগতই পাকিস্তান ফেরতরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং এরশাদকে ক্ষমতায় আনতে সহায়তা করে। রাজনীতিবিদদের ‘নিম্নমানের সংস্কৃতি’রও উল্লেখ করেছেন। আমাদের ধারণা, আসলে বঙ্গবন্ধু পরবর্তী রাজনীতিবিদ ও পূর্ববর্তীদের মধ্যে চারিত্রিক গঠনেই পার্থক্য ছিল। পরবর্তীকালের রাজনীতিবিদরা যে সেনা শাসন বা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেননি, তা নয়, করেছেন কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অগণতান্ত্রিক সেনাশক্তির সঙ্গে সমঝোতা করেছেন, সেনা কর্তৃত্বকে সিভিল কর্তৃত্বের অধীনে আনার চেষ্টা করেননি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুদলের ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।

১৬.

মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী যে নীরব সাক্ষ্য দিয়েছেন তা চমকে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। ২০০০ সালে তার আত্মজীবনীটি মাওলা ব্রাদার্স প্রকাশ করেছে। এখনও আমরা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি সেসব বিষয় তিনি অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে কিন্তু সরলভাবে লিখে গেছেন। বাংলাদেশে সেনা রাজনীতির প্রথম দুই দশকের না জানা ইতিহাসের জন্য মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীরবিক্রমের এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদের কথা বাদ দিই। যে জেনারেল শফিউল্লাহর বই নিয়ে আলোচনা করছি তারও অনেক বিবরণ নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, তথ্য নিয়েও কথা উঠতে পারে কিন্তু মইনুলের বই নিয়ে উঠবে না। কেন এই মন্তব্য করছি? মইনুল ছিলেন ১৯৭৪-এ লে. কর্নেল এবং ৪৬ ব্রিগেডের অধিনায়ক। শফিউল্লাহ লিখেছেন, তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে এত কথা বলা হয়েছিল যে, মইনুলকে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। তিনি নিজেও নিশ্চয় তা জানতেন। কিন্তু তার গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার সমস্ত সুখস্মৃতি বা সমবেদনার ছোঁয়া আছে। একটুও শ্লেষ নেই যা অন্যান্য সেনাকর্তার লেখার মধ্যে আছে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, যেসব সেনাকর্তার বইয়ে তার উল্লেখ আছে সেখানে তার সম্পর্কে কোনো সমালোচনা নেই। জেনারেল শফিউল্লাহও তার গ্রন্থে মইনুল সম্পর্কে কোনো অভিযোগ করেননি, কোনো সমালোচনা করেননি। হয়তো তার মধ্যে এক ধরনের সততা ছিল যে কারণে কেউ তাকে একেবারে অগ্রাহ্য করতে পারেননি।

মইনুল লিখেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নয়জন কর্মরত এবং পরে পাকিস্তান থেকে আগত তিনজন মোট ১২ জন মেজর মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। জিয়া ও শফিউল্লাহ একই ব্যাচের কিন্তু প্রশিক্ষণের ফলের ভিত্তিতে জিয়া ছিলেন জ্যেষ্ঠ। বঙ্গবন্ধু নিজ থেকেই শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন। এজন্য বিশেষ কোনো সুপারিশ ছিল না। জিয়া এতে ক্ষুব্ধ হন। খালেদ মোশাররফের সঙ্গেও জিয়ার সম্পর্ক ভালো ছিল না। ধারণা করা হতো শফিউল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো। তারা দুজনই প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট ছিলেন এবং সিনিয়র অফিসাররা তা জেনে সুযোগ দিতেন। শফিউল্লাহ এদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। মইনুল লিখেছেন, “মূলত গত ২৮ বছরে বিভিন্ন সময় সেনাবাহিনীতে সেনাপ্রধানের কমান্ড ও কন্ট্রোল না থাকায় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটেছে, তা পুরো জাতিকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে। তবে এসব দুঃখজনক ঘটনার দায় সেনাপ্রধানের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের ওপরও বর্তায়।” [পৃ.৪২]

মইনুল জানিয়েছেন, শফিউল্লাহ-জিয়া দ্বন্দ্বে শওকত, তাহের, জিয়াউদ্দিন ও মনজুর সমর্থন দিতেন জিয়াকে। পরে অবশ্য তা প্রমাণিত হয়েছে। তবে মইনুল এসব থেকে সব সময় দূরে ছিলেন।

জিয়াউদ্দিন ৪৬ ব্রিগেডে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিলেন। মইনুল লিখেছেনÑ “তখন সেখানে প্রায় বিদ্রোহের মতো পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল এবং যে কোনো সময়ে গুরুতর সামরিক শ্ঙ্খৃলাভঙ্গের আশঙ্কা দেখা দেয়।” বঙ্গবন্ধু তখন বিদেশে ছিলেন। ফিরে এসে এসব জেনে মইনুলকে তিনি ৪৬ ব্রিগেডের প্রধান হিসেবে বদলি করেন। এতে আবার রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ ক্ষুণœ হন।

জিয়াউদ্দিন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর প্রবন্ধ লিখতেন। মইনুল তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন তার প্রবন্ধের তথ্যাবলি কোথায় পান। “উত্তরে তিনি আমাকে জানান, জেনারেল ওসমানী তাকে এসব তথ্য সরবরাহ করেন এবং তিনি তা বিশ্বাসও করতেন।” [পৃ. ৮৬]

মইনুল কাজে যোগ দিয়ে ব্রিগেডে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। তিনি লিখেছেন, “শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম সামরিক বাহিনীর ভিত্তি। উচ্ছৃঙ্খল সামরিক বাহিনী রাস্তার দাঙ্গাবাজদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তারা একটা দেশকে যে কোনো সময় ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।” [পৃ. ১৮] তার এই মন্তব্যের সঙ্গে আমরা একমত। কারণ, গত চার দশকের অভিজ্ঞতাই এর উদাহরণ বিশেষ করে ২০০৬-০৮-এর ঘটনাবলি।

১৯৭৩ সালের শেষের দিকে পাকিস্তান থেকে বাঙালি অফিসাররা ফিরতে শুরু করেন। অনেক নিয়মনীতি তাদের ক্ষেত্রে ‘অনুসৃত’ হয়নি। পাকিস্তান ফেরত জেনারেল এরশাদ সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছিলেন। দুই বছরে লে. কর্নেল থেকে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। মইনুলের ভাষায়Ñ “শান্তিকালীন সময়ে এরকম পদোন্নতি নজিরবিহীন, তার ওপর এ সময়ে তিনি কোনো পর্যায়ে অধিনায়কত্বও করেননি। তবু পাকিস্তান ফেরত অনেক সামরিক অফিসার মুক্তিযোদ্ধাদের দুই বছরের সিনিয়রিটি ও পদোন্নতি মনে-প্রাণে মেনে নেননি যার বহির্প্রকাশ ঘটেছে পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায়।” [পৃ. ৫৭]

এ সময় থেকেই মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয় এবং মুক্তিযোদ্ধা অফিসাররা এতে হেরে যান। শুধু পরাজয়ই নয়, তাদের প্রাণও হারাতে হয় এবং এ ক্ষেত্রে নিয়ামকের ভূমিকা পালন করেন জেনারেল জিয়া ও এরশাদ।

শেখ কামালের গুলিবিদ্ধের ঘটনাটিও তিনি লিখেছেন যা তার সম্পর্কিত গুজবের অবসান ঘটাবে।

মইনুলের মতে, শেখ কামাল তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ‘শহর টহলে’ বের হন। সিরাজ শিকদারের খোঁজে রত স্পেশাল পুলিশ ফোর্স এই মাইক্রোবাসটি দেখে এবং কোনো রকম সতর্কবাণী না দিয়ে গুলি চালায়। ফলে কামালসহ ছয়জন আহত হন। পুলিশই তাদের হাসপাতালে নিয়ে যায়।

পরদিন ছিল বিজয় দিবসের প্যারেড। বঙ্গবন্ধু খুবই বিপর্যস্ত ছিলেন। মইনুলের সঙ্গে আগে দেখা হলে কথা বলতেন। মইনুল প্যারেড পরিচালনা করলেও শেখ মুজিব তার সঙ্গে কথা বলেননি। মইনুল লিখেছেনÑ “এত মর্মাহত হতে তাঁকে কখনো দেখিনি।” [পৃ. ৬৬] মইনুল তারপর হাসপাতালে কামালকে দেখতে যান। সেখানে শুধু বেগম মুজিব ছিলেন। “প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব কামালের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মনঃক্ষুণœ হন। প্রথমে তিনি তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যেতে পর্যন্ত অস্বীকৃতি জানান। পরে অবশ্য বিকালের দিকে তিনি কামালকে দেখতে যান।” [পৃ. ৬৬]

তিনি আরও লিখেছেনÑ “এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগবিদ্বেষীরা এই ঘটানাকে ভিন্নরূপে প্রচার করে। ‘ব্যাংক ডাকাতি’ করতে গিয়ে কামাল পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তারা প্রচারণা চালায় এবং দেশে-বিদেশে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও এমন প্রচারে সত্যের লেশমাত্র ছিল না।” [পৃ. ৬৬]

এ পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয়, রাজনৈতিক নেতা ও তাদের পরিবারবর্গকে ক্ষমতায় থাকার সময় যতটা সতর্কভাবে সচেতন থাকতে হয় সেটি ছিলেন না, যার ফলে বিরূপ প্রচারের শিকার হতে হয়। পরবর্তীকালেও এ ধারা অব্যাহত ছিল এবং আছে। আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়। মইনুল লিখছেন, বাকশাল সৃষ্টি এবং বিভিন্ন ঘটনার ফলে সরকার জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছিল। কিন্তু “শেখ মুজিবকে অবহিত করার মতো সৎসাহস তাঁর কোনো উপদেষ্টা, পারিষদবর্গ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের ছিল না বলে আমার বদ্ধমূল ধারণা।” [পৃ. ৬৮] এ ধারণা এখনও অব্যাহত। চলবে...