১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

দঃ পশ্চিমাঞ্চলে রেললাইন, রেলস্টেশন নির্মাণে ছয় প্রকল্প নেয়া হচ্ছে


নাজনীন আখতার ॥ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন রেললাইন নির্মাণ, রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে ১০ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ৬টি প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পগুলোতে খুলনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। খুলনা থেকে ঢাকার দূরত্ব কমিয়ে আনাসহ খুলনা ও মংলায় পর্যটকদের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ ও সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১১টি স্টেশনে সিগন্যাল ব্যর্থতার কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ৯৫ শতাংশ কমে আসবে এবং ১৪টি লেভেল ক্রসিং গেটের দুর্ঘটনার মাত্রা ৭৫ শতাংশ কমে আসবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি রেলওয়ে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে আগামী ২০ বছরে রেলওয়ে নিয়ে সরকারের মহাপরিকল্পনার বিষয়টি নিয়েও কথা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেলের উন্নয়নে এ প্রকল্পগুলো সেই মহাপরিকল্পনারই অংশ। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক ২০১০ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে বাস্তবায়নে রেলওয়ের একটি মহাপরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেছে বলে জানান। তিনি জানান, মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি ২১ লাখ টাকা।

এদিকে সংসদীয় কমিটি সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প প্রতিবেদনে ৬টি প্রকল্পের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, খুলনা থেকে মংলা পর্যন্ত ৬৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক নির্মাণ নামে ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকার প্রকল্পটিতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ৭০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। গত বছর ২৪ আগস্ট ব্রিজ নির্মাণসংক্রান্ত এবং ২০ অক্টোবর রেল লাইন নির্মাণসংক্রান্ত চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। প্রকল্পটি শেষ হবে ২০১৮ সালের জুন মাসে।

সংশ্লিষ্টরা প্রকল্পটি সম্পর্কে জানিয়েছেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে রেলওয়ের বর্তমান নেটওয়ার্কের সঙ্গে মংলা পোর্টের সংযোগ স্থাপনের কারণে মংলা সমুদ্র বন্দরের সঙ্গে আঞ্চলিক রেলওয়ে সংযোগ স্থাপন হবে এবং মংলা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি রফতানি কার্যক্রম বৃদ্ধি পাবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। খুলনা শহরের যানজট কমে আসবে। পর্যটকদের জন্য মংলা সমুদ্র বন্দর পর্যন্ত আরামদায়ক ভ্রমণ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীব দর্শনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। রাজস্ব আয় বাড়বে বাংলাদেশ রেলওয়ের।

খুলনায় একটি তিনতলা বিশিষ্ট আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ এবং বেনাপোল রেলওয়ে অপারেশনাল সুবিধাদি বৃদ্ধি ও আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচলে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর জন্য ৭৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ের আরেকটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। জানা গেছে, প্রকল্পের আর্থিক আর্থিক অগ্রগতি ৩৫ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৪০ শতাংশের বেশি হলেও প্রকল্প এলাকার রেলভূমি অবৈধ দখলদারদের দখলভুক্ত থাকায় কাজের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ২০১৬ সালের জুন মাসে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে ‘ঈশ্বরদী-দর্শনা-সিরাজগঞ্জ বাজার সেকশনের বিভিন্ন স্টেশনের ইয়ার্ড পুনর্বাসন এবং লুপলাইন বর্ধিতকরণ’ শীর্ষক নতুন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ৭৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্রকল্পটিতে গত অর্থবছর ২৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ঈশ্বরদী থেকে দর্শনা পর্যন্ত ৮টি স্টেশন অর্থাৎ দর্শনা, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, হালসা, মিরপুর, ভেড়ামারা, ঈশ্বরদী জংশন এবং সিরাজগঞ্জ বাজার স্টেশন ইয়ার্ডের পুনর্বাসন ও লুপলাইন বর্ধিত করা হবে। রেললাইন, স্টেশন উন্নয়নের পাশাপাশি সিগন্যালিং ব্যবস্থার মান উন্নয়নেও নতুন একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ১৭৬ কোটি ৪ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটির মেয়াদও ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য ছাড় দেয়া হয়েছে ৫৬ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো- ঈশ্বরদী ও দর্শনার মধ্যে দর্শনা, জয়রামপুর, চুয়াডাঙ্গা, মোমিনপুর, মুন্সিগঞ্জ, আলমডাঙ্গা, হালসা, পোড়াদহ, মিরপুর, ভেড়ামারা ও পাকশী রেলওয়ে স্টেশন অর্থাৎ ১১টি স্টেশনে ১৯৪২ সালের পুরনো ও ম্যানুয়াল সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন করা। প্রকল্পের মাধ্যমে ১১টি স্টেশনে রঙিন বাতির সিগন্যালিং ব্যবস্থাসংবলিত কম্পিউটারভিত্তিক ইন্টারলকিং সিগন্যালিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। ১৪টি লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেন আগমন সম্পর্কে অগ্রিম সতর্কতামূলক সিগন্যালিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। সেকশনের ১১টি স্টেশন ও ১৪টি লেভেল ক্রসিং এলাকায় অপটিক্যাল ফাইবার সংযোগ দেয়া হবে। সিগন্যালিং ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে দর্শনা-ঈশ্বরদী অঞ্চলে নিরাপদ, গতিশীল এবং সুষ্ঠু ট্রেন পরিচালনার সুযোগ বাড়বে। লাইন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেকশনাল স্পীড ২৫ কিলোমিটার/ ঘণ্টা থেকে আরও বাড়বে। প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিগন্যাল ব্যর্থতার কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ৯৫ শতাংশ কমে আসবে। লেভেল ক্রসিং গেটগুলোর দুর্ঘটনার মাত্রা ৭৫ শতাংশ কমে আসবে।

২০২০ সাল নাগাদ ঢাকা থেকে পদ্মা ব্রিজ হয়ে ভাঙ্গা যশোর পর্যন্ত ৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের সম্ভাবতা যাচাইয়ের কাজ প্রক্রিয়াধীন। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনা থেকে ঢাকার দূরত্ব ৪২৭ কিলোমিটারের জায়গায় ২৮০ কিলোমিটার হবে। দূরত্ব কমে যাওয়ায় সময়ও বাঁচবে।

বিদ্যমান রেললাইনের সমান্তরালে খুলনা থেকে দর্শনা পর্যন্ত ১২৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হবে। ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে। অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে খুলনা থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত যে সংখ্যক ট্রেন চলাচল করে তার দ্বিগুণ পরিমাণ ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে এবং খুলনা আসা যাওয়া ভ্রমণের সময় কমে যাবে।

এদিক জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশের ৪৪টি জেলা রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত। রেলওয়ের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে করিডর ডাবল লাইন করা, রেলপথের মান উন্নয়ন, রোলিং স্টক সমস্যা দূর করা, জনবলের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রেলের আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১০ সাল থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ২০ বছরে বাস্তবায়নে রেলওয়ের একটি মহাপরিকল্পনা সরকার নিয়েছে। মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ২৩৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। মহাপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে নতুন ১৫টি জেলা রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে এবং রেলওয়েতে পর্যাপ্তসংখ্যক কোচ ও রোলিং স্টক বিদ্যমান থাকবে। তখন রাজধানী ঢাকা থেকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত সব জেলায় সরাসরি ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: