মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, সোমবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

জিকার ভয়াবহতা ছোট মাথার শিশু

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, ১২:১৮ এ. এম.
  • টুটুল মাহফুজ

জিকা ভাইরাস। বিশ্বব্যাপী ভয়াবহ এক নাম। মশা এ ভাইরাসের জীবাণু বহন করে। আমাদের দেশে এ রোগের নাম নতুন হলেও লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় ১৯৪৭ সালে প্রথম এ ভাইরাস রোগের সূত্রপাত। পূর্ব আফ্রিকার দেশ উগান্ডার অতি পরিচিত জিকা (স্থানীয় ভাষায় ‘বাড়ন্ত’)। অফ্রিকান ভাইরাস রিসার্স ইনস্টিটিউট একটি বানরের শরীর থেকে এ ভাইরাসের জীবাণু শনাক্ত করে। এই ভাইরাসে কেউ এখনও মারা যায়নি, মানব শরীরে সামান্য জ্বর আর মাথাব্যথা ছাড়া তেমন কোন সমস্যাও তৈরি করেনি এটা। কিন্তু ঘটনা ঘটাচ্ছে অন্য জায়গায়। গর্ভবতী মাকে কামরালে তার গর্ভের সন্তানটির ‘মাথা’ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক ছোট হবে, যার ফলে জন্ম নেবে ছোট মাথার শিশু। এই শিশুরা আদৌ সুস্থভাবে বড় হবে কিনা তা নিয়ে ইতোমধ্যেই সন্দেহ দেখা দিয়েছে। যার ফলে শিশু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হতে পারে। মস্তিষ্কের গঠন থাকতে পারে অপূর্ণ। এ রোগকে বলে মাইক্রোসেফালি। তবে এ বিষয়ে এখনও গবেষণা চলছে।

জিকা ভাইরাস দুই আমেরিকার ২৪টি দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে বলে দি প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন জানিয়েছে। এতে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ লাখ। শুধু ব্রাজিলেই এই ভাইরাসের কারণে ৪০ হাজার শিশু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নিয়েছে। জিকা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে ব্রাজিল সরকার দুই লাখ ২০ হাজার সেনা মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে জনগণকে জিকা ভাইরাস সম্পর্কে করণীয় জানাবে। কলম্বিয়ায় দুই হাজার ১১৬ জন গর্ভবতী নারীসহ অন্তত ২০ হাজার মানুষ জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত বলে জানিয়েছে দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থা। কলম্বিয়ায় জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত গর্ভবতী নারীদের প্রায় ৩৮ শতাংশ ভেনিজুয়েলা সীমান্তবর্তী নর্তে দে সান্তানদার প্রদেশের বাসিন্দা। এরই ফলে অনেকগুলো দেশ ইতোমধ্যেই সেই দেশের মায়েদের আগামী দুই বছরের জন্য গর্ভধারণ করতে নিষেধ করে দিয়েছে।

এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার কোন লক্ষণ ধরা পরে না। একজন মা সন্তান জন্ম দেয়ার পরই শুধু বুঝতে পারে কি ক্ষতি তার সন্তানের হয়ে গেল।

লক্ষণ

# এ রোগে আক্রন্ত হওয়ার আর একটি লক্ষণ হচ্ছে জ্বর, গিরায় ব্যথা, চোখ লাল।

# মাংশপেশিতে ব্যথা হবে, মাথাব্যথা করবে।

# জ্বর এক সপ্তাহ থাকবে এবং শরীর মৃদু দুর্বল হবে।

# প্রতি পাঁচজনে একজন ভয়ানক অসুস্থ হবে।

চিকিৎসা

# জিকা ভাইরাসের কোন ভ্যাকসিন বা ওষুধ এখন বের হয়নি।

# জিকা আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসকরা প্রাথমিকভাবে বিশ্রাম ও বেশি পানি পান করতে বলেছেন।

# মশা যাতে না কামড়ায় সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এখনও আবিষ্কার হয়নি জিকা ভাইরাসের প্রতিষেধক। তবে এমতাবস্থায় করণীয় হচ্ছেÑ

# হাত এবং গলা ঢেকে জামা-প্যান্ট পরতে হবে।

# বসবাসের আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।

# গর্ভবতীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে।

# বসবাসের স্থাান মশামুক্ত রাখতে হবে।

অধ্যাপক ও গবেষক ইউরিয়েল কির্টন জিকার প্রাদুর্ভাবের জন্য নগরায়নের ধরনকেও দায়ী করেছেন। তার মতে, গত সাত দশকে ব্রাজিলে নগরায়নের হার ২০ থেকে বেড়ে ৮০ শতাংশ হওয়াও এডিস এজিপ্টির বিস্তার বাড়ার অন্যতম কারণ। বংশবৃদ্ধির জন্য এ মশার পরিষ্কার পানি দরকার হয় না। ফুলের টবের মতো ছোট ও বদ্ধ পাত্রে সহজেই ডিম পাড়তে পারে। আর সঙ্গে আছে প্রচুর খাবার, মানে মানুষের রক্ত। নগরের ঘিঞ্জি পরিবেশও এই মশা বিস্তারের সহায়ক।

বাহক এডিস এজিপ্টি

এ প্রজাতির মশার দুটি প্রজাতি রয়েছে। যার প্রথমটি এডিস এজিপ্টি ফরমোসাসকে ‘নির্বিষ’ই বলছেন বিজ্ঞানীরা। এটি মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। সমস্যা ফরমোসাসের জাত ভাই এডিস এজিপ্টি। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকারীরা আফ্রিকা থেকে মশার এই জাতকে সমুদ্র পার করে আমেরিকায় নিয়ে আসেন বলে গবেষকদের ধারণা।

অধ্যাপক কির্টন জানান, জিকার বাহক মশা এডিস জন্মস্থানের কাছাকাছি থাকতে ভালবাসে। ১০০ মিটারের বেশি উড়তে চায় না। স্বভাবে ‘অলস’ হলেও এ মশা ‘ভ্রমণপিপাসু’। যানবাহনে চড়ে পৌঁছে যেতে পারে কয়েক শ’ মাইল দূরে। এ প্রজাতির মশা সাগরে ভাসমান কোন নৌকায় ওঠার পর পুরো জীবনচক্র সেখানেই কাটিয়ে দিতে পরে।

এডিস এজিপ্টি ফলের রসেই জীবনধারণ করে। তবে ডিম পাড়তে মেয়ে মশার প্রয়োজন হয়- মানব রক্ত। ওই রক্তের মাধ্যমেই আক্রান্ত ব্যক্তির দেহ থেকে জিকা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে মানব দেহে। এ প্রজাতির মেয়ে মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায় বলে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন।

১৯৪৭ সালে প্রথম এই ভাইরাস আফ্রিকায় দেখা দিলেও তার প্রকোপ এতদিন ছিল না কিন্তু হঠাৎ করে এটা আবার ২০১৫ সালে ব্রাজিলে দেখা দেয় আর তারপর থেকে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে।

দক্ষিণ আমেরিকার পর জিকা ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্বময় জরুরী অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। স্বাস্থ্যবিষয়ক এই জরুরী অবস্থা ঘোষণা করে বিশ্ব সংস্থাটি বলেছে, মশাবাহিত এই ভাইরাসটি সংক্রামণ ঠেকাতে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

সূত্র : সেন্টার ফর ডিজিসেস কন্টোল এন্ড প্রিভেনশন,বিবিসি

প্রকাশিত : ৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, ১২:১৮ এ. এম.

০৫/০২/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: