২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

অনুভবে একুশে বইমেলা


তরু“পল্লব্লবীথির ছায়ায় সাধ্য আর সাধনার কারিগরের এক অপূর্ব তীর্থস্থান একুশে বইমেলা। যারা লেখক তারা সাধক। তাদের কাছে অন্যসব উৎসবের থেকে একুশে গ্রন্থমেলার আমেজটাই বেশি। পাঠক আর লেখকের মিলনস্থলও এই বইমেলা। কত কলরোল উপচিয়ে লেখক আর পাঠকদের কাছে উপস্থিত হয় একুশে গ্রন্থমেলা। ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী চলে উৎসব। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। পৃথিবীর ইতিহাসে ভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার নজির একমাত্র এই বাংলা ভাষাতেই রয়েছে। সেই ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ভাষা আন্দোলনের তিন বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমি।

দীর্ঘপথ পরিক্রমা শেষে আয়োজন করা হয় একুশে বইমেলা। প্রথমে স্বল্পপরিসরে শুরু হলেও পরবর্তী সময় প্রচার এবং প্রসার বাড়তে থাকে। নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে বাংলা একাডেমির বইমেলার প্রাচুর্য বেড়েছে বহুগুণ। মাসব্যাপী এই বইমেলা রূপ নিয়েছে প্রাণের মেলায়। একুশে গ্রন্থমেলার নতুন বইয়ের বর্ণ ও গন্ধ এখন দেশব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। সারাদেশের জেলা শহর থেকে শুরু করে এমনকি উপজেলা শহরেও মেলার আয়োজন করা হয়। সাজ সাজ রবে নতুন সব বইয়ের গন্ধ আর মৌতাত পাঠক-পাঠিকাদের মাতিয়ে রাখে ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে।

বাংলা ভাষা গবেষণার জন্য রাষ্ট্রীয় সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। বড়জোর এই প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করেন শ’দুয়েক লোক। এই শ’দুয়েক লোকের ওপরই কি নির্ভর করে বাংলা ভাষা না। বাংলা ভাষার শ্রীবৃদ্ধির দায়িত্ব সমগ্র বাঙালি জাতির। তাই তো বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টিশীল গ্রন্থ প্রকাশের জন্য গড়ে উঠেছে প্রায় হাজারের ওপরে বেসরকারী প্রকাশনা সংস্থা। এই প্রকাশনা সংস্থার উপস্থিতিতে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলার পরিসর বৃদ্ধি পেয়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যান পর্যন্ত গড়িয়েছে। এটা শুভ লক্ষণ। কিন্তু হাতের আঙুলে গোনা কয়েকটি প্রকাশনার নাম ব্যতীত আর সব নামেমাত্র প্রকাশনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নামধাম তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্রকাশনা সংস্থা বৃদ্ধি আশংকা নয় বরং শুভ খবর বটে। তবে কথা থেকে যায় । সত্যিকারের মননশীল পাঠক সেখানেই আটকে যায়। এই যে প্রত্যেক বছর ত্রিশ হাজারের উপরে প্রকাশিত নতুন বইয়ের খবর দেখে। আজ যে বই প্রকাশ হচ্ছে তা অনাগত ভবিষ্যতের কাছে ইতিহাস। সেই চিন্তাকে ধারণ করার সক্ষমতা কয়জন প্রকাশকইবা রাখেন! তারল্যের অর্থে অনায়াসে তেলেসমাতিতে পাঠককে মাতিয়ে রাখতে চায়। ঝকমারি আয়োজনে বিজ্ঞাপনের ডামাডোলে আর সব কিছু বাজিমাত করা গেলেও সত্যিকারে ঋদ্ধ ও মননশীল পাঠককে আঁকড়ে ধরা যায় না। বই জ্ঞানের প্রতীক। মনের খোরাক জুগিয়ে থাকে। সেই উপাদানটিই যদি না থাকে তাহলে পাঠক কেন বারবার আপনার বই পড়বেন?

অনেকে হরদম প্রকাশনাকে বলে দেন ‘প্রকাশনা শিল্প’। সত্যিকার অর্থে প্রকাশনা এখনো শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেনি। প্রকাশনাকে শিল্পের মান দিতে হলে একজন লেখক এবং প্রকাশকদের পরিবর্তন দরকার। স্বরূপসন্ধানী শব্দচাষীকে খুঁজে বের করা এবং তাকে যথাযথভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব অনুসন্ধানী প্রকাশকের কাজ। সেই কাজটাইবা কয়জনে করেন। প্রকাশক যত বৃদ্ধি পাবে লেখকদের কদর তত বাড়বে। প্রকাশনা সংস্থা বৃদ্ধি কখনোই অশনি সংকেত নয়। বড় আক্ষেপ তখনই ফুটে ওঠে, যখন আগপাসতলার মতো বই বাজারে ছাড়ে। ছাপার অক্ষরে নিজের নামটি দেখার মোহময় লোভ সংবরণ না করতে পারার তাগিদে এক ধরনের লেখক যথাযথভাবে পা ুলিপি প্রকাশকের হাতে ছেড়ে দেন। আর প্রকাশক সাহেবও পা ুলিপিটি গ্রন্থ আকারে বাজারে ছাড়েন।

অনেক লেখকের বইয়ের ভূমিকা পাঠে যে বিষয়টি অনুধাবিত হয়েছে, ‘অমর একুশে বইমেলায় নিজের বই প্রকাশিত না হলে মেলা তাদের কাছে নাকি অপূর্ণ থেকে যায়। সহজলভ্য প্রকাশনার বদৌলতে জাতির এই গুণধর লেখকদের বইও প্রকাশ হয়ে যায় তির তির করে। মুক্তির আলো দেখে সদ্য লেখা তার পা-ুলিপিটি। আহারে! তাই বলে নিজের পাঠঅযোগ্য বই প্রকাশ করতে হবে! কোনো প্রকার বাছবিচার ব্যতীত বই প্রকাশ হচ্ছে অহরহ। বিশেষ করে বিগত কয়েক বছরে প্রবাসী লেখকদের বই বেশ প্রকাশিত হচ্ছে। এটা দারুণ খবর বটে। প্রবাসে থেকেও মা, মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকেই তো সাহিত্যের চর্চা। কিন্তু হিতে বিপরীত ঘটে যায় অনেক প্রবাসীর বই বাজারে যেনতেন মানে বানান, বাক্যের অসঙ্গতি তো রয়েছে। প্রবাসীদের বই প্রকাশের জন্যও গড়ে উঠেছে কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ওই যে কথা আছে না তেলের তেলেসমাতিতে বেগুনভাজি। সেই ভাজি কতটুকু স্বাস্থ্যকর সে বিষয়টি তো খুব কম প্রকাশকই বিবেচনা করেন। নিমপাতা যেমন ততো, সে সত্য আমরা সবাই মেনে নিয়েছি। কিন্তু খাঁটি বয়ান মেনে নেয়ার প্রবণতা আমাদের মধ্যে এখনো গড়ে ওঠেনি। বাংলাদেশের এমন অনেক লেখক আছেন, যাদের নিজের লেখা পা-ুলিপিটি পাঠযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য সময়ও তাদের নেই। অনায়াসে বলে দেন, বই কে পড়বে। নিজের নামের সাথে বইয়ের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তারা বই লিখে থাকেন। বই না বের হলে কেমন দেখায়। বই কারা পড়বে? এমন সব বাক্য বলে দেন যারা। তাদের কথার এমন সুরে মোটা দাগে বলার কিছুই নেই। শুধু এটুকুই জোর করে বলা যায় । আপনার কালো কালির কারিশমা যদি থাকে সেই পা ুলিপি মাটির নিচ থেকে হলেও পাঠক খুঁজে বের করে পড়বেন। আর সত্যিকারের লেখক কখনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া চান না। ভবিষ্যতের দ্বারে ছেড়ে দেন অনায়াসে। বইকে পাঠকের গোড়দোরায় পৌঁছে দেয়ার জন্য বাংলাদেশে যথেষ্ট ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।

একুশের চেতনাকে ধারণ করে এই সুধীজনেরা লিখে থাকেন এবং তাদের বইও যথাসময়ে প্রকাশ করতে হবে। তাই তো কোমরটাকে আঁটসাঁট করে বেঁধে কতিপয় লেখক এবং প্রকাশক ময়দানে উপস্থিত হন। আসলে লেখা তো এক ধরনের তাড়না। এই তাড়না লেখককে তাবৎ তাড়নাকে পিছে রেখেই পঠন-পাঠন। তারপর লিখন। বাংলাদেশে যত প্রকাশনী আছে তত প্রকাশনীর জন্য যদি সম্পাদনার নির্দিষ্ট লোক নিয়োগ করা হতো, তাহলে প্রকাশনা সংস্থা সত্যিকার অর্থেই শিল্পে রূপ নিত। ওই যে কথা আছে না ‘অল্প টাকা যার কুঁজো বেগুন তার।’ থাক সেসব কথা। এগোই তবে অন্য ক্ষেত্র ধরে। আপনার সদ্য প্রকাশিত বইটি যে ভোরের মুক্ত আলোর মতো জ্বলজ্বল করে উঠল। একবার কি ভেবে দেখেছেন আপনার এই বইটির আলোর মুখ দেখতে কতজনের করস্পর্শ রয়েছে ? কত হাত পেরোতে হয়! শুধুমাত্র প্রকাশনা আর প্রকাশকের নাম, প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম, ছাপাখানার নাম উল্লেখ থাকে । সব রক্ত আর ঘামে শীতের মধ্যরাত অবধি কাজ করেন যে শ্রমিকেরা তাদের নাম তো সাদা অক্ষরের সাথে মিশে থাকে! এইসব শ্রমজীবী বাঁধাইকারী আর পেস্টিং-লেমেনেটিংকারী এবং প্রুফরিডিংদের কোনো আক্ষেপ নেই।

আরো সব কথা থেকে যায় স্বনামে ও সুনামে খ্যাত কয়জন প্রকাশকইবা সম্ভাবনাময় তরুণদের বই প্রকাশ করেন। সেই মনমানসিকতার প্রকাশকের পরিমাণ খুবই সীমিত।

জীবনানন্দের বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক সিগনেট প্রেসের কথাই বা কয়জন মনে রাখি। বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থের সাথে মিশে আছে সিগনেট প্রেস আর প্রকাশকের নাম। প্রকাশনা অনেক ধীর প্রক্রিয়ার অপর নাম। সে কথা ভুলে আমরা সবই তারল্যে অর্থের দিকে ঝুঁকছি। ‘বর্ষা চলে গেলে সর পড়ে শরতে।’ সেকথা ভুলে গেলে তো চলবে না। শিল্প উচ্চমানের লোকের কাজ । শিল্প সাধনার ব্যাপার-স্যাপার। উচ্চমান এবং পরিশীলিত মন আর মননের পরিচয় বহন করে শিল্প।

একশ্রেণির বোদ্ধা পাঠক হৈহৈ তুলেছিলেন। অনলাইনের ঝকমারি আয়োজনে ছাপার অক্ষর হারিয়ে যাবে। হা হা সেই সব অনলাইন বা ফেসবুককেন্দ্রিক পাতিবুদ্ধিজীবীরাই নিজের নামটি ছাপার অক্ষরে দেখার জন্য নিজেদের বই প্রকাশের জন্য একধরনের রেডিমেট প্রকাশনাও গড়ে তুলেছেন। এরাই মূলত প্রকাশনার মানক্ষুণœ করেছেন। সে বিষয়টি খতিয়ে দেখারইবা কে আছে। হায়রে লেখক হওয়ার অতৃপ্ত বাসনা! আমরা ভুলে যাই জীবনানন্দের সেরা বইগুলো তো প্রকাশ হয়েছে তাঁর মৃত্যুর পরে। যতীন সরকারের মতো একজন পন্ডিত ও সুসাহিত্যিকের প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে তার বয়স যখন পঞ্চাশ। বিচারপতি হাবিবুর রহমান লেখা শুরু করেছেন তাঁর অবসর জীবনে। বলতে পারেন বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের প্রথম বই তো গাঁটের পয়সা খরচ করেই বের করেছেন। পরবর্তীকালে সেই সব লেখকের পা-ুলিপি আনার জন্য স্বয়ং প্রকাশকরাই অগ্রিম সম্মানী দিয়েছেন। সে সত্যের সন্ধানে আমরা কখনো হাঁটব না। আমরা মনেপ্রাণে সঁপে নিয়েছি যতদিন বাঁচব প্রত্যেক বছরে একটা করে নতুন বই প্রকাশ করতে হবে। এর জন্য বছরে নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থও সরবরাহ করতে হবে। পাঠ আর পাঠকের চিন্তা কখনো ভাবা হবে না। সর্বোপরি প্রকাশনার ছাপা, বাইন্ডিং, পেজ মেকআপ, গেটআপ, প্রচ্ছদ উন্নত হয়েছে। বই বিপণনের সিস্টেমও উন্নত হয়েছে। সীমাবদ্ধতার জাল উতরিয়ে তবুও বলব একুশে বইমেলা বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে প্রাণের মেলা। সর্বোপরী আশাবাদ থাকাটাই স্বাভাবিক একুশে বইমেলা নিয়ে। সময় আর সুযোগের ব্যবহার তথা লেখক-প্রকাশক উভয়ই পেশাদারিত্বের উচ্চতম স্তরে পৌঁছবে।