১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

শিক্ষার্থীরা জঙ্গীবাদের মতো বিভ্রান্তির পথে যেন না যায়


শিক্ষার্থীরা জঙ্গীবাদের মতো বিভ্রান্তির পথে যেন না যায়

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীরা যাতে জঙ্গীবাদের মতো বিভ্রান্তির পথে না যায় সে জন্য শিক্ষক-অভিভাবকদের সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্ম কখনও বলেনি যে সুইসাইড (আত্মহত্যা) কর। যে সুইসাইড করবে, সে দোজখে যাবে। সেই ইসলাম ধর্মের নামে সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদী কার্যক্রম- এটা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ যেন ইসলামের নামে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৬ উদ্বোধন ও প্রাথমিক শিক্ষা পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জঙ্গীবাদ এবং মাদকের সঙ্গে যেন কোনভাবেই আমাদের শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ না ঘটে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। মাদ্রাসা, মসজিদ ও সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এ বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েদের যেন কেউ বিভ্রান্ত করতে না পারে।

স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে সকলকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিজ দায়িত্বে নিজ নিজ এলাকার শিক্ষা কার্যক্রম উন্নত করার জন্য শিশুদের মিড ডে মিল কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে। সমাজের সামর্থ্যবান বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, শিক্ষক-অভিভাবকরা এগিয়ে এলে আমাদের আর কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না। তিনি বলেন, আমরা কারও মুখাপেক্ষী হতে চাই না। সকলে মিলে কাজ করলে আর কারও মুখাপেক্ষী হতে হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, শিক্ষকতা মহান পেশা। তাঁদের সম্মান অনেক ওপরে। এখনও আমি আমার শিক্ষকদের যেখানে পাই সম্মান জানাই। তিনি বলেন, জাতির পিতা প্রায়ই বলতেন ‘সোনার বাংলা গড়ার জন্য সোনার মানুষ চাই।’ আপনারা হচ্ছেন সেই মানুষ গড়ার কারিগর। আপনারা পারেন-নীতি ও মূল্যবোধের চর্চা শিখিয়ে দেশের প্রতিটি শিশুকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। ভাল-মন্দ কিংবা ন্যায়-অন্যায় বিবেচনার জ্ঞান এবং দেশাত্মবোধের শিক্ষা দেয়া আপনাদের দায়িত্ব। তাদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। দরিদ্র প্রতিবন্ধীদের আপন করে নেয়ার শিক্ষাও আমি আশা করি শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীদের দেবেন। তিনি বলেন, আসুন আমরা সবাই মিলে দেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়নে এগিয়ে এসে দেশ থেকে নিরক্ষরতা চিরতরে দূর করে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলি।

অনুষ্ঠানে পদকপ্রাপ্তদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্জিত পদক আগামী দিনে ‘সোনার মানুষ’ হিসেবে গড়ে ওঠার উৎসাহ ও প্রেরণা যোগাবে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সারাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা, ক্রীড়া এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১০৬ জনকে ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০১৫’তে ভূষিত করেন। পুরস্কার বিজয়ী ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিদ্যোৎসাহী ও বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিবর্গের হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রেস্ট, সনদপত্র এবং উপহারের চেক তুলে দেন।

পুরস্কার বিজয়ীরা হচ্ছেন- শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন (কুষ্টিয়া), শ্রেষ্ঠ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান খান (বিয়ানীবাজার সিলেট), শ্রেষ্ঠ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ড. রহিমা খাতুন (সোনাইমুড়ি নোয়াখালী) শ্রেষ্ঠ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবদুস সালাম (পাবনা, রাজশাহী), শ্রেষ্ঠ পিটিআই সুপারিনটেনডেন্ট মোঃ জয়নাল আবেদীন (কুমিল্লা পিটিআই), শ্রেষ্ঠ উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ অহিদুল ইসলাম (ডুমুরিয়া খুলনা), শ্রেষ্ঠ পিটিআই ইন্সট্রাক্টর যুথিকা রানী দাস (দিনাজপুর পিটিআই), শ্রেষ্ঠ ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর আবদুর রহিম (কালিয়াকৌর, গাজীপুর), শ্রেষ্ঠ ইউআরসি ইন্সট্রাক্টর মোস্তাফিজুর রহমান (চারঘাট ইউআরসি, রাজশাহী), শ্রেষ্ঠ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মেজর শিরীন আক্তার (পটুয়াখালী সদর, পটুয়াখালী), শ্রেষ্ঠ বিদ্যোৎসাহী সমাজকর্মী অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আবদুল হক (মিঠামইন, কিশোরগঞ্জ), শ্রেষ্ঠ শিক্ষক প্রাথমিক বিদ্যালয় মোঃ সিদ্দিকুর রহমান পূর্ব চড়কগাছিয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বরগুনা সদর বরগুনা, শ্রেষ্ঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষকা তাসলিম চৌধুরী (সদর মৌলভীবাজার) প্রমুখ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মোতাহার হোসেন এমপি। স্বাগত বক্তৃতা করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব হুমায়ুন খালেদ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলমগীর। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের ক্রেস্ট তুলে দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় দফতর ও বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের আয়োজনে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর সরকারের সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, নিজেদের উদ্যোগেই বাচ্চাদের টিফিন তৈরি করে খাওয়ানো যায়। অতীতে এভাবেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলত। শিশুদের স্কুলে চলমান মিডডে টিফিনের মানোন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের লালিত স্বপ্ন ছিল ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন।

তিনি বলেন, কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ‘প্রাইমারী এডুকেশন অর্ডিন্যান্স-১৯৭৩’ এবং ‘প্রাইমারী স্কুল (টেকিং ওভার) এ্য্যাক্ট ১৯৭৪’-এর আওতায় ৩৬ হাজার ১৬৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ এবং ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭২৪ জন শিক্ষকের পদ সরকারীকরণ করেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ’৭৫ সালের আগস্ট ট্র্যাজেডির পর বাকি সুপারিশসমূহ ২১ বছর আলোর মুখ দেখেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একদিকে তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন করেন, অন্যদিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচনা করে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে নারীদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু প্রাথমিক শিক্ষা জাতীয়করণ করার ৪০ বছর পর আমি ২০১৩ সালে দেশের ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেছি। সেদিন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১ লাখ ৩ হাজার ৮৪৫ জন শিক্ষকের চাকরি সরকারীকরণের ঘোষণা দিয়েছিলাম। আমরা ঘোষিত পদের চেয়ে ৫ হাজার বাড়িয়ে ১ লাখ ৮ হাজার ২০০ শিক্ষকের চাকরি সরকারী করেছি। তিনি বলেন, খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের ব্যবস্থাসহ জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সব কিছুই আওয়ামী লীগ সরকার করছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর ’৯৬ সালে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের পদক্ষেপের ফলে মাত্র দু’বছরে সাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়ায়। এ অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ ‘ইউনেস্কো সাক্ষরতা পুরস্কার ১৯৯৮’ লাভ করে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে সেটা তো বাড়াইনি বরং আমাদের রেখে যাওয়া হারের চেয়ে ২০ শতাংশ কমিয়ে ৪৪ শতাংশে নামিয়ে আনে। প্রধানমন্ত্রী বিগত ৭ বছরে শিক্ষা-স্বাস্থ্য উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমরা গত ৭ বছরে মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে ১৯৩ কোটি বই বিতরণ করেছি। পৃথিবীতে বিনামূল্যে এত বিপুল পরিমাণ বই সরবরাহের আর কোন নজির আছে কিনা আমার জানা নেই। তিনি বলেন, এবারও পহেলা জানুয়ারি ২০১৬ তারিখে দেশব্যাপী ‘বই উৎসব’ হয়েছে এবং মাধ্যমিক পর্যন্ত ৪ কোটি ৪৪ লাখ ১৬ হাজার ৭২৮ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে ৩৩ কোটি ৩৭ লাখ ৬২ হাজার ৭৭২টি নতুন পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়েছে। এ বছর শুধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে ১০ কোটি ৮৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৭টি বই বিতরণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১০ সালে আধুনিক-বিজ্ঞানসম্মত জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছি। এতে প্রাথমিক শিক্ষা-শিক্ষার্থীর মানসিক বিকাশ, আচরণ ও ভাষা শেখানোর বিষয়টি মৌলিক স্তর হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট এবং নিজস্ব সামান্য সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় কোষাগারে দান করে তা দিয়ে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্ট গঠন করে শিক্ষার্থীদের বৃত্তি-উপবৃত্তি এবং দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘এখন দেশে উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ কোটি ৩০ লাখ। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ৪৮ লাখ ১৫ হাজার ৬৩৬ জন। ২০১০ সালে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৭৮ লাখ ১৭ হাজার ৯৭৭ জনে উন্নীত করেছিলাম। আমরা এ বছর উপবৃত্তির অর্থের পরিমাণও বাড়িয়েছি।’

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: