১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এবার পুলিশের বিরুদ্ধে চা দোকানিকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ


এবার পুলিশের বিরুদ্ধে চা দোকানিকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশ ব্যাংক ও ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দুই কর্মকর্তাকে মারধরের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পুলিশের কয়েক সদস্যের বিরুদ্ধে ঢাকায় এক চা দোকানিকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার শাহ্ আলী থানাধীন গুদারাঘাট এলাকার চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরের গায়ে কেরোসিনের স্টোভ ছুড়ে মারলে মারাত্মক দগ্ধ হন তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার সূত্র ধরে চার কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে পুলিশের তরফ থেকে গঠন করা হয়েছে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি। নিহত বাবুলের প্রতিবেশী পারুলী বেগমের মাদক ব্যবসার সূত্র ধরে ঘটনাটি ঘটে বলে নিহতের পরিবারের দাবি। এমন ঘটনায় রীতিমতো আতঙ্কিত নিহতের পরিবারের সদস্যরা।

নিহত পরিবারের সদস্যদের সান্ত¡না দিয়ে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হবে। ব্যবস্থা না নেয়া হলে উচ্চ আদালতে যাওয়া হবে।

বুধবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে রাজধানীর শাহ্ আলী থানাধীন গুদারাঘাট এলাকার কিংশুক সমবায় সমিতির কাছে ঘটনাটি ঘটে। স্থানীয়রা জানান, ঘটনার সময় দেলোয়ার নামে পুলিশের এক সোর্স এবং পোশাক পরিহিত দুই পুলিশ সদস্য সেই চায়ের দোকানে যায়। তাদের সঙ্গে চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরের (৪৫) ঝগড়া হয়। এক পর্যায়ে দেলোয়ার ও পুলিশ সদস্যরা লাঠি দিয়ে কেরোসিনের স্টোভে জোরে আঘাত করে। এতে স্টোভের গরম তেল আগুনসহ বাবুলের গায়ে গিয়ে পড়ে। পরে বাবুলের গায়ে থাকা জ্যাকেটে দ্রুত আগুন ধরে যায়। পরবর্তীতে লাঠি দিয়ে স্টোভটি ছুড়ে মারলে তা গিয়ে পড়ে বাবুলের গায়ে। এতে বাবুলের সারা শরীরে আগুন ধরে যায়। এ সময় পুলিশ সদস্যসহ দেলোয়ার চলে যায়। বাবুলকে রাতেই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। কিন্তু সবচেষ্টা বিফল হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে বাবুলের মুত্যু হয়।

হাসপাতালের আবাসিক সার্জন ডাঃ পার্থ শংকর পাল বলছিলেন, বাবুলের শরীরের ৯৫ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। ফলে তাকে বাঁচানোর আর তেমন কোন পথই খোলা ছিল না।

নিহতের পিতার নাম সাদেক আলী মাতুব্বর। বাড়ি ভোলা জেলা সদরের মুন্সীরচরে। স্ত্রী লাকি বেগম এবং দুই ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে গুদারাঘাটের ৭ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাড়িতে ভাড়ায় বসবাস করছিলেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছিলেন বাবুল মাতুব্বর। বড় ছেলে রাজু পেশায় অটো চালক। মেয়ে রোকসানা আক্তার, মনি আক্তার ও লাবণী আক্তার। আর সবার ছোট ছেলে জুনায়েদ। এ ব্যাপারে মেয়ে রোকসানা আক্তার বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় পারুলী বেগম নামের এক মহিলাকে আসামি করা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। পারুলী বেগম পেশায় মাদক ব্যবসায়ী। মাদক ব্যবসার সূত্র ধরেই ঘটনাটি ঘটে।

অনুসন্ধানে ও স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা গেছে, নিহত বাবুল ও পারুলী বেগম ৭ নম্বর সড়কের একই গলিতে বসবাস করে। বাবুলের বাড়িটি আগে। এর পরেই পারুলীর ঘর। পারুলী বহুদিন ধরেই পুলিশ ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় মাদক ব্যবসা করে আসছিল। হরহামেশাই মাদক ক্রেতারা পারুলীর বাড়ি মনে করে বাবুলের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। আর বাবুলের ছেলেমেয়েদের কাছে ভুল করে মাদক চেয়ে বসে। এ নিয়ে পারুলীর সঙ্গে বাবুলের বহুদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে। বছর দুয়েক আগে বাবুল অতিষ্ঠ হয়ে পারুলীকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিল। এরপর থেকেই পারুলী বেগম বাবুলকে শায়েস্তা করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করে আসছিল।

নিহতের ছেলে রাজু মাতুব্বর বলেন, পারুলীর সহযোগী হিসেবে ছিল পুলিশের স্থানীয় দুই সোর্স দেলোয়ার হোসেন ও আইয়ুব আলী। এই দুই সোর্স বিভিন্ন সময় পারুলীর কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে পুলিশকে দিয়ে বাবার চা দোকান তুলে দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। এরপর থেকেই সোর্স দেলোয়ার বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তিনি নিয়মিত পিতার কাছে চাঁদা চাইতে থাকেন। চাঁদার একটি ভাগ স্থানীয় প্রশাসনের পকেটেও যায়। প্রতিদিন বাবাকে তিন শিফটে অন্তত ৯০ টাকা চাঁদা দিতে হতো লাইনম্যানদের।

বৃহস্পতিবার রাতে দেলোয়ার কয়েকজন পুলিশ নিয়ে বাবুলের বাবার দোকানে যায়। বাবাকে পুলিশ সদস্যরা প্রথমেই মাদক ব্যবসায়ী বলে অভিযোগ করেন। এরপর বাবাকে পুলিশের লোকজন জোর করে গাড়িতে তোলার চেষ্টা করে। বাবা আপত্তি করলে শুরু হয় টানা হেঁচড়া। টানা হেঁচড়ার এক পর্যায়ে বাবা থানায় যাবেন না বলে জেদ করে দোকানের খুঁটি ধরে বসে পড়েন। এ সময় সোর্স দেলোয়ার ও পুলিশের সঙ্গে বাবার চরম হাঙ্গামা শুরু হয়। তারই জের ধরে দেলোয়ার ও পুলিশ সদস্যরা রাগের মাথায় লাঠি দিয়ে স্টোভে আঘাত করে। স্টোভটি আগুনসহ বাবার শরীরে গিয়ে পড়ে। এতেই মারাত্মক দগ্ধ হয়ে বাবার মৃত্যু হয়। অথচ মাস ছয়েক আগে মিরপুরের ডিসি নিজেই আমার পিতা মাদক ব্যবসায়ী নয় বলে জানিয়েছেন। এমনকি কেউ যেন বাবুলকে কোন প্রকার বিরক্ত না করেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন। এরপর ছয় মাস ভালই ছিল। বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই এমন ঘটনা ঘটল। এর সঙ্গে পারুলী বেগমের হাত থাকার বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট। পারুলী বেগম পুলিশের দুই সোর্স ও টহল পুলিশকে টাকা দিয়ে এমন কাজ করিয়েছে বলে আমার ধারণা। পারুলী বেগম আমাদের আরও নানাভাবে হয়রানি করতে পারে। এ জন্য আমরা রীতিমতো আতঙ্কিত।

যদিও শাহ্ আলী থানার ওসি একেএম শাহিন ম-ল বলছেন, বাবুল মাদক বিক্রেতা। পুলিশের সোর্স দেলোয়ার রাতে তার দোকানের সামনে গেলে বাবুল দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। তখন স্টোভের চুলা ছিটকে পড়ে তার শরীরে আগুন ধরে যায়। আর তাতেই বাবুলের মৃত্যু হয়। পুলিশের কোন সদস্য বাবুলের কাছে চাঁদা চাইতে যায়নি। সেখানে আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশ গিয়েছিল।

মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোঃ কাইয়ুজ্জামান ডিএমপি কমিশনারের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ব্যক্তির দায় কেন পুলিশ বাহিনী নেবে? কোন ক্রমেই পুলিশ সেই দায় নেবে না। তদন্ত চলছে। দোষীদের বিরুদ্ধে অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া বিভাগের উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার জানান, বাবুল নিহতের ঘটনায় তার মেয়ে রোকসানা বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন। সেই মামলার প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ সদর দফতরের তরফ থেকে এক সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-কমিশনার টুটুল চক্রবর্তীকে তদন্ত শেষে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দিয়েছে ডিএমপি সদর দফতর। অন্যদিকে ঘটনা তদন্তে মিরপুর পুলিশের উপ-কমিশনার মোঃ কাইয়ুজ্জামানের নির্দেশে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাসুদ আহমেদ ও সহকারী কমিশনার মাহবুব হোসেনের সমন্বয়ে অপর আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। এদিকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে টহল ডিউটিতে থাকা শাহ্ আলী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিয়াজ উদ্দিন মোল্লা ও মমিনুর রহমান খান, সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) দেবেন্দ্র নাথ ও কনস্টেবল জসিম উদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। এ ব্যাপারে বিভাগীয় মামলা দায়ের হয়েছে।

এদিকে দুপুর আড়াইটার দিকে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিহত বাবুলের পরিবারকে সান্ত¡না দিতে যান। তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পুলিশ দিন দিন সীমা অতিক্রম করে যাচ্ছে। এখনই রুখে দেয়া প্রয়োজন। যে বাহিনীর সেবা দেয়ার কথা, সেই বাহিনীর এটিই কি সেবা দেয়ার নমুনা! প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হবে। উপযুক্ত বিচার না হলে, প্রয়োজনে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হব। তিনি দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারটিকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: