১৭ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

সুদের হার হ্রাস ॥ কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ


অর্থনীতির জন্য একটা দুঃসংবাদ সবার জানা ও বোঝা উচিত। উন্নয়ন ও উন্নতির পাশাপাশিই এটা চলছে। চলছে বিশ্বায়ন, অবাধ বাণিজ্য ও বাজার অর্থনীতির পাশাপাশি। কেউ কেউ মাঝে মাঝে এই সম্পর্কে কথা বলেন, কিন্তু তা তত গুরুত্ব পায় না। অথচ পাওয়া উচিত নয় শুধু, পাওয়া ‘ফরজ’ কাজ। কারণ মূল্যস্ফীতি যেমন মানুষের বিশেষ করে সাধারণ মানুষের শত্রু, তেমনি আয় বৈষম্যও তাই। আয় বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন বিঘিœত করে। বাজার অর্থনীতির বাজার ধ্বংস করে। ক্রেতার সংখ্যা কমতে থাকে। দেখা যাচ্ছে এই আয় বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে বাংলাদেশে। মানুষের আয় কমছে, মানুষ আয়হীন হচ্ছে, আয় মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম হচ্ছে। হরেক রকম কারণে আয় বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা উপলব্ধিই করতে পারছি না গত বিশ বছরে বাংলাদেশে আয় বৈষম্য দ্বিগুণ হয়েছে। মজার বিষয় উন্নতি কিন্তু হচ্ছে, উন্নয়নের কাজ চলছে সর্বত্র। সাড়ে ছয় শতাংশ ‘জিডিপি’ প্রবৃদ্ধির হার। সাত শতাংশ ছুঁই ছুঁই। কত বড় ভাল সংবাদ আমাদের জন্য। চীনের প্রবৃদ্ধির সমান, ভারতের কাছাকাছি হারের প্রবৃদ্ধি। কিন্তু এই খবরের সঙ্গে সঙ্গেই যখন কেউ বলে আয় বৈষম্য ১০ বছরে তোমাদের দ্বিগুণ হয়েছে তখন মনটা খারাপ হয়ে যায়। মনটা খারাপ হয় বিশেষভাবে দুটো কারণে। আয় বৈষম্য বাড়লে এটা ভবিষ্যতে সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে। সামাজিক অস্থিরতা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্ম দেবে। আয় বৈষম্য আবার সম্পর্কিত আঞ্চলিক বৈষম্যের সঙ্গে। এর সঙ্গে সম্পর্কিত সমাজের বিভিন্ন অংশের আয় বৈষম্যের সঙ্গে। কোন ধর্মীয় গোষ্ঠী বেশি আয় করছে, কেউ করছে কম। এসব সমস্যা দৃশ্যত বড় সমস্যা নয়, কিন্তু যখন সমস্যা হবে তখন তা বড় আকার ধারণ করবে। লক্ষ্য করার মতো বিষয় আয় বৈষম্যের পাশাপাশি আরেকটি খবর। গত বুধবার একটি দৈনিক খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি খবর থেকে দেখা যায় দেশের ধনীরা কর দেয় না। কয়েক দিন আগে দেখলাম বাংলাদেশের বস্ত্র ব্যবসায়ীরা অর্থাৎ গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ কোন কর দেন না। একদিকে আয় বৈষম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে ধনীরা কোন কর দেয় না- কী বিপজ্জনক সংবাদ। এই মুহূর্তের খুবই বিপজ্জনক সংবাদ হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত অবসরভোগী লোকজন, বেওয়া-বিধবা ইত্যাদি শ্রেণীর লোকদের আয় মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বে যেমন এক শতাংশ লোকের হাতে ৯৯ শতাংশ সম্পদ আছে বলে দু’দিন পর পর খবর ছাপা হচ্ছে তখন এসব দুঃসংবাদ আমরা পাচ্ছি। এতক্ষণ বৈষম্যের খবর দিলাম। এবার আসা যাক আয় হ্রাসের ঘটনায়।

নিত্যদিনের ঘটনা। বোঝা যায় না কেউ চোখে আঙুল দিয়ে না বললে। আমরা উন্নয়ন, বিনিয়োগ, দারিদ্র্য হ্রাস ও নানা সামাজিক ফ্রন্টের অগ্রগতি নিয়ে এত সংবাদ-ভারাক্রান্ত যে, আমরা টেরই পাচ্ছি না লাখ লাখ লোকের আয় দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। এই খবরটা কোথায় পাওয়া যায়? পাওয়া যায় ব্যবসায়ীদের আনন্দ সংবাদে। ব্যবসায়ীরা, শিল্পপতিরা খুব বেশি, তাদের ঋণের ওপর সুদের হার হ্রাস পাচ্ছে। অনেক হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু তারা খুশি নন। তারা চান সুদের হার ‘সিঙ্গেল ডিজিট’-এ নামুক। কারণ তারা মনে করেন দেশে শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান সমস্যা ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার। সরকার ব্যবসায়ীদের তোষামোদ করতেই ব্যস্ত। অতএব মূল সমস্যা কী কী তার গভীরে না গিয়ে ব্যবসায়ীরা যা বলেন, তাই তারা বিশ্বাস করেন। অতএব ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার কমছে। কিন্তু কেউ ভাবে না যে, ব্যাংক ঋণের সুদের হারের সঙ্গে সম্পর্কিত আরও দুটো জিনিস। প্রথমত মূল্যস্ফীতি, দ্বিতীয় আমানতের ওপর সুদের হার। সর্বোপরি বলাবাহুল্য, জাতীয় সঞ্চয় হার। ২৯ জানুয়ারির একটা খবরে দেখলাম ব্যাংকে মেয়াদী আমানতের ওপর সুদের হার ৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। কারণ, হিসেবে ঋণের কম চাহিদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পরক্ষণই বলা হয়েছে ২০১৪ এবং ২০১৫ সালে আমানতের ওপর সুদের হার ছিল ৭-৯ শতাংশ। আরও খবর ব্যাংকে ব্যাংকে টাকার পাহাড় জমেছে। এক লাখ কোটি টাকা নাকি অতিরিক্ত তারল্য (একসেস লিক্যুইডিটি)। এক শ’ টাকা আমানত থাকলে ব্যাংক এখন ঋণ দিতে পারে ৮০ টাকা ৫০ পয়সা। অতিরিক্ত তারল্য মানে ঐ পরিমাণ টাকা ব্যাংক ঋণ দিতে পারছে না। অতএব খবরে বলা হয়েছে আগামীতে আমানতের ওপর সুদের হার আরও কমতে পারে। বড় ব্যবসায়ীরা বিদেশ থেকে ঋণ করতে পারেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেছে বেছে তাদেরকে অনুমতি দেয়। ব্যবসায়ীরা কম সুদে বিদেশ থেকে ঋণ করতে পারে। এ কারণেও নাকি দেশের ভেতরে ঋণের চাহিদা কমেছে। অতএব ব্যাংকে ব্যাংকে অতিরিক্ত তারল্য। অতএব আমানতের ওপর সুদের হার হ্রাস ইত্যাদি ইত্যাদি।

এখানে প্রথম প্রশ্ন ব্যাংকের ঋণের ওপর সুদ কত হবে এটাই কী সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, না প্রশ্ন আমানতের ওপর সুদের হার কত হবে? আমানতের প্রশ্নে দেখা যায়, দেশে ২০১৩ সালের জুনেই মোট হিসাব ছিল ছয় কোটি ১২ লাখ ১২ হাজার ১৭৫টি। এর মধ্যে শুধু সঞ্চয়ী হিসাবই ছিল প্রায় এক কোটির মতো। এদিকে স্থায়ী আমানতের সংখ্যা ছিল দুই লাখ ৯৮ হাজার ৬১টি। অর্থাৎ ব্যাংকে সঞ্চয়কারীর সংখ্যা লাখ লাখ নয়, কোটি কোটি। এরা আমানতের কিছু সুদ পায়। ইদানীং দেখা যাচ্ছে ব্যাংক আমানতকারীদের কোন সুদ দিচ্ছে না, কিভাবে? দেখা যাচ্ছে মূল্যস্ফীতির হার ছয় শতাংশের ওপরে। লাখ লাখ সঞ্চয়ী হিসাবে ব্যাংকগুলো ৩-৪ শতাংশ সুদ দেয়। তার ওপর থেকে বছরে দু’বার নানা মাসে নানা চার্জ কেটে নেয়া হয়। তারপর রয়েছে আয়কর। সকল ব্যাংক সুদের ওপরেই রয়েছে অগ্রিম আয়কর কর্তনের নিয়ম। রিটার্নে দেখানো থাকলে পাঁচ শতাংশ, না দেখানো থাকলে দশ শতাংশ। তাহলে সুদের হার কত দাঁড়ায়? শুধু সঞ্চয়ী আমানত নয়, মেয়াদী আমানতের একই অবস্থা। মূল্যস্ফীতির হার যেখানে ছয়, সাড়ে ছয় শতাংশ, সেখানে ব্যাংক সুদ দেয় চার শতাংশ। বিচারটা কেমন দাঁড়াল? ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে যদি এমন একটা ঘটনা ঘটত তাহলে তারা এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী কেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে কান্নাকাটি করতেন। আদায় করতেন তাদের দাবি। লাখ লাখ আমানতকারীর কোন সংগঠন নেই। এদের মধ্যে বিরাট সংখ্যক আমানতকারী অবসরপ্রাপ্ত লোক যাদের অন্য কোন আয় নেই। এদের বেলায় কী ঘটছে। ২০১০-১১ সালের দিকে এক লাখ টাকা ব্যাংকে মেয়াদী আমানত রেখে ১২-১৩ হাজার টাকা সুদ পাওয়া যেত। আজকে তা চার হাজার টাকা মাত্র। ভাবা যায়, সুদ আয়ের ওপর নির্ভরশীল লোকদের অবস্থা। আয় কমে হয়েছে তিন ভাগের এক ভাগ। অথচ ২০১০ সালের পর কী বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচ, শাকসবজির খরচ, মাছ-মাংসের খরচ, স্কুল খরচ কমেছে? প্রশ্নই উঠে না। তাহলে মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, অবসরপ্রাপ্ত লোকজনদের অবস্থা কী? ব্যাংকগুলো সুদ কমাচ্ছে না, মূল্যস্ফীতির নিরিখে তারা আমানতকারীদের কোন সুদই দিচ্ছে না। ছয়, সাড়ে ছয় শতাংশের মূল্যস্ফীতির বিপরীতে প্রাপ্ত সুদ মাত্র চার শতাংশ।

ব্যবসায়ীদের বাঁচানোর লোক আছে। তারা বিদেশী ক্রেতাদের কাছে পর্যন্ত সাহায্য চায়। গরিব লোকদের সরকার দেখে। সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ে রয়েছে তারা। কিছু সাহায্য-সহযোগিতা মাসে মাসে তারা পায়। হেলাফেলার বস্তু হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত, অবসরভোগী এবং সুদ আয়ের নির্ভরশীল লোকেরা? যদি তারা সংগঠিত থাকতে পারত তাহলে তাদের কথা কেউ না কেউ শুনত। কিন্তু এই অবস্থা নেই। অতএব তাদের ভোগান্তি। এখন তারা কী করবে? প্রথম বিকল্প হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য করা। সাধারণ মধ্যবিত্তের পক্ষে কী ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব? অবসরপ্রাপ্ত যারা তারা কী বাণিজ্য করবে? তাদের তো একবার ডাক্তার, একবার ওষুধের দোকান করতে হয়। আর ব্যবসা করার জন্য ভাবলেও তা কী করে সম্ভব? ব্যাংকগুলো কী দুই-চার-দশ লাখ টাকা ঋণ দেয়। খবর নিন, তাহলে জানতে পারবেন বড় ঋণ কত পরিমাণের, আর ছোট ছোট ঋণ কত পরিমাণের। ব্যবসা না করলে দ্বিতীয় বিকল্প থাকে শেয়ারবাজারে যাওয়া। এই বাজারের অবস্থা কী- তা সবাই আমরা জানি। লাখ লাখ বিনিয়োগকারী এই বাজারে ৫ বছর আগে সর্বস্বান্ত হয়েছে। অবসরপ্রাপ্তরা কী তাদের ‘রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট’ নিয়ে শেয়ার বেচা-কেনায় নামবে? অসম্ভব পরিকল্পনা ছাড়া আর কী? আরেক বিকল্প টাকা-পয়সা নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া। এই কাজটি ধনীরা করছেন, পয়সাওয়ালারা করছেন। করছেন ভালভাবেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত এ কাজটি পারবে না। তাহলে বিকল্প? বিকল্প নেই। ধুঁকে ধুঁকে মরা ছাড়া গতি নেই যদি না সরকার কিছু একটা করতে ভাবে। অথচ ভাবা উচিত। লাখ লাখ লোক এভাবে সুদ আয় কমার ফলে আয় বৈষম্যের কবলে পড়বে আর কিছু সংখ্যক লোক থাকবে আনন্দ-ফুর্তিতে তা হতে পারে না। আশা করি সরকার এটা বোঝে। এমতাবস্থায় সরকারকে বলব সুদের হারকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে, সরকার কখনও সুদের হারকে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে, দরকার বোধে অসচ্ছল, অবসরভোগী ও দরিদ্র আমানতকারীদের জন্য ভর্তুকির ব্যবস্থা করতে। শত হোক ব্যবসায়ীদের হাজার হাজার কোটি ভর্তুকি দিতে পারলে মধ্যবিত্তদেরও কিছু একটা পাওনা হয়।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক, ঢাবি