মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৭ আশ্বিন ১৪২৪, শুক্রবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

যেভাবে ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব অধ্যাপক ডাঃ এবিএম আবদুল্লাহ

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

আজ ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ক্যান্সার দিবস। গত বছর এই দিবসে প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘আমরাই পারি রুখতে’। এর আগের বছরের বিষয় ছিল ‘কুসংস্কার পরিহার করুন’। এবারের (২০১৬ সাল) বিষয় : ‘ডব পধহ, ও পধহ.’ আমরা পারি, আমিও পারি। ক্যান্সার শব্দটি শুনলেই সবাই আঁতকে ওঠেন। অনেকের ধারণা, একবার ক্যান্সার হওয়া মানেই ফল নিশ্চিত মৃত্যু। কিন্তু এই ধারণা একেবারেই অমূলক। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন আর ক্যান্সার মানেই অবধারিত মৃত্যু নয়। শুরুতেই দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে এ রোগের চিকিৎসা, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভও সম্ভব। নিত্যনতুন অধিক কার্যকরী কেমোথেরাপি জাতীয় ওষুধ আবিষ্কৃত হচ্ছে, রেডিওথেরাপিসহ অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার যথাযথ প্রয়োগে বেশকিছু ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করছে।

উন্নত বিশ্বে মৃত্যুর কারণসমূহের মধ্যে ক্যান্সার দ্বিতীয়, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তৃতীয়। এক হিসাবে দেখা গেছে, বিশ্বের ১২% মৃত্যুর জন্য ক্যান্সারই দায়ী। তাই ক্যান্সার হওয়ার আগেই একে প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। একটু সচেতন হলেই ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ক্যান্সার নামক এই বিভীষিকার হাত থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের দরকার যথাযথ শিক্ষা ও সচেতনতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ক্যান্সারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কারণ জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িত। সুতরাং এগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এক-তৃতীয়াংশ ক্যান্সারের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে যে নিয়মগুলো মেনে চলা উচিত তা হলোÑ

* ধূমপান সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা। মনে রাখতে হবে ধূমপানে বিষপান।

* অন্যান্য তামাক জাতীয় দ্রব্য যেমন সাদাপাতা, জর্দা ইত্যাদি ব্যবহার বন্ধ করা।

* মদ্যপান, শিরায় ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ এবং অন্য সকল প্রকার নেশা পরিহার করা।

* খাদ্যাভ্যাস সুন্দরভাবে অনুসরণ করা, যেমন সুষম খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত পরিমাণে আঁশ ও এন্টি অক্সিডেন্টযুক্ত খাবার খাওয়া, তাজা মৌসুমী ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়া, চর্বিজাতীয় ও তৈলাক্ত খাবার কম খাওয়া, প্রিজারভেটিভ বা কেমিক্যালযুক্ত খাবার বর্জন, ফাস্টফুড ও কোমল পানীয় বর্জন, রঙিন খাদ্য ও পানীয় বর্জন ইত্যাদি।

* আর্সেনিকমুক্ত পানি পান নিশ্চিত করা।

* নিয়মিত হাঁটাচলা, ব্যায়াম এবং সঙ্গে খাদ্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শরীরের ওজন ঠিক রাখা।

* যারা কসমেটিক্স ব্যবহার করেন তারা যেন ভেজাল ও নিম্নমানের কসমেটিক্স পরিহার করেন।

* দীর্ঘসময় সরাসরি সূর্যের নিচে না থাকা উচিত, প্রয়োজনে ছাতা বা হ্যাট ব্যবহার করা ভাল।

* যৌনাভ্যাসের ক্ষেত্রে সামাজিক নৈতিকতা মেনে চলা, বহু যৌনসঙ্গী বা পেশাদার যৌনকর্মীর সঙ্গে যৌনকর্ম এবং অস্বাভাবিক যৌনাচার পরিহার করা।

* রক্তদান বা গ্রহণ অথবা যে কোন ইঞ্জেকশন গ্রহণের সময় এবং এন্ডোস্কপি, কলোনোস্কপি ইত্যাদি পরীক্ষার সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা।

* বেশকিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে টিকা নিয়ে ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্ভব, যেমন হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের টিকা ইত্যাদি।

* যেসব জীবাণু এবং রোগব্যাধি ক্যান্সার তৈরি করতে পারে তা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত নির্মূল করা।

* কর্মক্ষেত্রে ক্যান্সার তৈরিকারী রেডিয়েশন বা কেমিক্যালের সংস্পর্শ পরিহার করা। এ ক্ষেত্রে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করা।

* পরিবেশ দূষণ, বিশেষ করে বায়ু ও পানি দূষণ বন্ধ করা।

* শরীরের কোথাও চাকা বা গোটা, ক্ষত, তিলের রং পরিবর্তন, দীর্ঘদিনের জ্বর, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, খাদ্যে অরুচি, পায়খানার কোন পরিবর্তন (যেমন পায়খানার সঙ্গে রক্ত যাওয়া, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য, হঠাৎ পাতলা পায়খানা), প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত যাওয়া ইত্যাদি দেখা দিলে অবহেলা না করা।

* প্রত্যেক সুস্থ ব্যক্তিরই উচিত নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো, যাতে শরীরে কোন ক্যান্সার দানা বাঁধতে শুরু করলে তা প্রাথমিক অবস্থাতেই দমন করা সম্ভব হয়। বিশেষ করে বয়স্কদের বৃহদান্ত্র বা কোলন, মহিলাদের জরায়ুমুখ ও স্তন, পুরুষদের প্রোস্টেট ইত্যাদি নিয়মিত পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্বীকৃত। এসব স্থানে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে বিধায় এগুলোকে নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে প্রতিরোধ সম্ভব।

ক্যান্সার মানবজাতির জন্য একটি অভিশাপ। এ অভিশাপের পরিসমাপ্তির চেষ্টা চলছে বিশ্বজুড়ে। চিন্তা, চেতনা, গবেষণা এবং জীবনযাত্রার ব্যাপক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিশ্ব এখন ক্যান্সার জয়ের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। খাবার দাবার এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের ইচ্ছাশক্তি এবং ইতিবাচক চিন্তাধারাই পারে ক্যান্সারকে জয় করতে।

একসময় ধারণা করা হতো, ‘ক্যান্সারের কোন আন্সার (উত্তর) নাই।’ আধুনিক যুগে তা ইতোমধ্যেই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ক্যান্সার আগেও ছিল, এখনও আছে, ভবিষ্যতেও হয়ত হতেই থাকবে। তাই এই প্রাণঘাতী রোগটিকে ভয় নয়, জয় করাই হোক সবার লক্ষ্য।

লেখক : ডিন, মেডিসিন অনুষদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

প্রকাশিত : ৪ ফেব্রুয়ারী ২০১৬

০৪/০২/২০১৬ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

প্রথম পাতা



শীর্ষ সংবাদ: