১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিত্য বেকায়দায় ফেলছে ॥ ৪৫ হাজার বস্তি


রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিত্য বেকায়দায় ফেলছে ॥ ৪৫ হাজার বস্তি

গাফফার খান চৌধুরী ॥ আধুনিকতার যুগে বস্তি একটি সমাজিক ক্যান্সার। নাগরিক সমাজের অন্যতম সমস্যা। অপরাধের উৎস এই বস্তি রাষ্ট্রকে নানা দিক থেকে বেকায়দায় ফেলছে। মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যখন বিশ্বের কাছে পরিচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের হাজার হাজার বস্তির চিত্র বিশ্বদরবারে ভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। বস্তি সমস্যা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি, আলোচনা এমনকি সেমিনার-সিম্পোজিয়াম হয়েছে। সরকারের দিক থেকে বার বার উদ্যোগ নিয়েও আদালতের মামলা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ার কারণে নাগরিক জীবন থেকে বস্তির অভিশাপ মুক্ত করা যায়নি। সারাদেশে প্রায় ১৫ হাজার একর জায়গার উপর গড়ে ওঠা ছোট-বড় ৪৫ হাজার বস্তি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে এখন গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো ঝেঁকে বসেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যার সৃষ্টি করছে ঢাকার ১১০টি বস্তি। দ্রুত ঢাকা থেকে বস্তি সরাতে না পারলে ভবিষ্যতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বস্তি অপসারণের ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাঁধাও রয়েছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানে মিলেছে এমন তথ্য।

বাংলাদেশে বস্তির ইতিহাস ॥ যুগে যুগে সারা পৃথিবীতেই বস্তি রয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় দরিদ্র মানুষের বসবাস ছিল। তবে সেটি হালের বস্তির আদলে নয়। অনেকটা গ্রামের কৃষকদের আদলে বাড়িঘর বানিয়ে বসবাস করতেন। দেশের নদী ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকাগুলোতে এমন প্রবণতা ছিল সবচেয়ে বেশি।

এ বিষয়ে ঢাকার ভাষানটেক বাস্তুহারা উন্নয়ন কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হাজী মমিন খান (৭০) বলছিলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দরিদ্র মানুষদের অনেকেই ঢাকামুখী হন। তারা ঢাকায় এসে মিরপুর, কালশী, বাউনিয়াসহ যেসব এলাকায় ফাঁকা জায়গা বা ঝোপঝাড় ছিল সেখানে বসবাস শুরু করেন। তাদের মধ্যে আমিও একজন। আমার বাড়ি বরিশালের বাউফলে। নদীভাঙ্গনে বাড়িঘরে বিলীন হয়ে যায়। তখন অনেকেই ঢাকায় আসেন। তাদের মধ্যে আমিও একজন। ১৯৭৪ সালে নদীভাঙ্গা মানুষজন ট্রাকে ট্রাকে ঢাকায় আসা শুরু করে। তাতে বঙ্গবন্ধু সরকার বাধা দেয়নি। বরং সহযোগিতা করেছে। আমি যে ট্রাকে করে ঢাকায় এসেছিলাম বঙ্গবন্ধুর সরকার মানবিক কারণে সেই ট্রাকের ভাড়াও দিয়েছিল। ওই সময় ভোলা, বরিশাল, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলার নদীভাঙ্গা মানুষকে ঢাকায় আসতে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে বঙ্গবন্ধুর সরকার। আমরা ঢাকার ভাষানটেকে বসবাস শুরু করি। তখন লোকজন নেই বললেই চলে। শূন্য মাঠ। সেখানেই ঘর তুলে বসবাস শুরু করি। অনেকটা গৃহস্থের মতো। জমিতে আবাদ করতাম। ভালই চলে যেত। কিন্তু সময়ের আবর্তে মানুষজন বেশিহারে আসা শুরু করায় গৃহস্থ বাড়ির মতো আর থাকা হয় না। আস্তে আস্তে বস্তি গড়ে ওঠে। এমন চিত্র ঢাকার এক সময়কার সব বস্তিতেই ছিল।

সারাদেশে বস্তি ও সেখানে বসবাসকারীদের সংখ্যা ॥ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে বস্তির নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকা-ে জড়িত ইউপিপিআর (আরবান পার্টনারশিপস ফর পোভার্টি রিডাক্সন প্রজেক্ট) এর জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ২১ ভাগ অর্থাৎ ৩ কোটি ৩৬ লাখ। এর মধ্যে ৮ শতাংশ মানুষ হতদরিদ্র অর্থাৎ প্রায় ২৭ লাখ। এসব হতদরিদ্র মানুষই বস্তিগুলোতে বসবাস করছেন। সারাদেশে সবমিলিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার বস্তি রয়েছে।

বস্তিগুলোর অবস্থান ॥ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, টঙ্গী, ময়মনসিংহ, রংপুর, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, নবাবগঞ্জ, বগুড়া, টাঙ্গাইল, সাভার. গাজীপুর, নওগাঁ, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, পাবনা, চাঁদপুর, ফেনী, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও ফরিদপুরে বস্তিগুলোর অবস্থান। বস্তিগুলো সবমিলিয়ে অন্তত ১৫ হাজার একর জায়গা দখল করে আছে।

সরকারী জায়গায় বস্তি ও অবৈধ স্থাপনা ॥ সরকারী জায়গায় বস্তি ছাড়াও লাখ লাখ অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। যদিও বেসরকারী জায়গায় বস্তির সংখ্যা বেশি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। সারাদেশে সরকারী, আধা সরকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি শুধু রেলওয়েরই ৪ হাজার ৬৩৫ দশমিক ৫১ একর রেলওয়ের জমি অবৈধভাবে দখলে রেখেছে। এরমধ্যে শুধু ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্তই ২৩ কিলোমিটার রেলপথের দুই ধারের প্রায় ৫৮ একর জমি বেদখল হয়ে গড়ে উঠেছে বস্তিসহ নানা স্থাপনা। ঢাকায় রেলের জমিতে থাকা অবৈধ স্থাপনাগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে প্রায় ৫ হাজার স্থানীয় প্রভাবশালী। সারাদেশে অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণকারীর সংখ্যা কয়েক লাখ।

ঢাকার বস্তি পরিস্থিতি ॥ ঢাকা সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হিসাব মতে সারাদেশের ৪৫ হাজার বস্তির মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ১১০টি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের বস্তি উন্নয়ন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় দিন দিন বস্তি কমে যাচ্ছে। জানা গেছে, গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার কারণে অনেক বস্তিবাসী গ্রামে চলে গেছেন। গত তিন বছরে আস্তে আস্তে ঢাকা থেকে অন্তত ১৫টি বস্তি অনেকটাই বিলীন হয়ে গেছে। এরমধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন ২৫টি বস্তির মধ্যে হালে ১৬টির অস্তিত্ব রয়েছে। বাকি বস্তিগুলোর বাসিন্দা কমে যাওয়ায় তারা অন্য বস্তিতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঢাকায় বস্তিতে বসবাস করছেন অন্তত ২ লাখ হতদরিদ্র মানুষ। তবে টঙ্গী ও সাভারে বস্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এ দুটি জায়গায় থাকা বস্তিতে বসবাস করছেন অন্তত ৩ লাখ হতদ্ররিদ্র মানুষ।

বস্তিতে বসবাসকারীদের মধ্যে শতকরা ৪০ ভাগ বস্তির জমির দালাল বা স্থানীয় প্রভাবশালী বা বস্তির নিয়ন্ত্রকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভাড়া বা লিজ নিয়ে নিজ উদ্যোগেই ঘর তুলে বসবাস করছেন। আর ৬০ শতাংশ বস্তিবাসী ভাড়ায় বসবাস করছেন। বস্তি টিকে থাকলে ২০৩০ সাল নাগাদ জমি লিজ নিয়ে বসবাসকারী বস্তিবাসীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৬০ ভাগে। অবশিষ্ট ৪০ ভাগ ভাড়ায় বসবাস করবে।

আবারও আলোচনায় বস্তি ॥ বস্তি বহুকাল ধরেই দেশের অন্যতম সমস্যা এবং আলোচনার বিষয়বস্তু, যা বিভিন্ন সময় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও এসেছে। সর্বশেষ গত ২১ জানুয়ারি কল্যাণপুরের পোড়া বস্তি উচ্ছেদকালে পুলিশের সঙ্গে বস্তিবাসীদের দিনব্যাপী সংঘর্ষ বস্তি সমস্যা নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। ওইদিনই বস্তি উচ্ছেদপরবর্তী তিন মাস পর্যন্ত বন্ধের ঘোষণা দেন তারিকুল হাকিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ।

গত ৩১ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) নেতৃত্বাধীন চার বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রীম কোর্টের আপীল বেঞ্চ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন ড. কামাল হোসেন ও তাঁর মেয়ে ব্যারিস্টার সারা হোসেন। আর রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, ১০ বছর আগে এ বিষয়ে রিট দায়ের করা হয়। রিট করেছিল আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। তখনই হাইকোর্ট উচ্ছেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও বস্তি উচ্ছেদের চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেছেন।

আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন জনকণ্ঠকে বলেন, তাঁরা মানবিক কারণেই বস্তিবাসীদের পক্ষে অনেকগুলো রিট আবেদন করেছেন। সেসব রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টের বিভিন্ন বেঞ্চ বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন না করা পর্যন্ত বস্তি উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন। বস্তিবাসী হলেও মানবিক কারণে এবং রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে বস্তিবাসীদের বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার পাওয়ার কথা। বস্তিবাসীদের এসব মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তাঁরা বস্তিবাসীদের পক্ষে রিট আবেদন করেছেন।

বস্তিতে বসবাসকারীদের পরিচয় ॥ মানবিক কারণ দেখিয়ে বস্তিবাসীদের পক্ষে করা রিট আবেদনের কারণে বস্তি উচ্ছেদ অভিযান থমকে আছে, যা সমাজে দিন দিন নানা ধরনের অপরাধ বাড়াচ্ছে। বস্তিবাসীদের অধিকাংশ পরিবার পরিকল্পনার ধারও ধারেন না। ফলে দিন দিন দেশে লোকসংখ্যা বাড়ছে। এসব লোকজন রাষ্ট্রের জন্য রীতিমতো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বস্তিবাসীদের শতকরা ৬৫ ভাগ বাসিন্দার নিজস্ব বাড়ির জায়গা নেই। এদের সবার বাড়িই নদীগর্ভে বিলীন। নদী ভাঙ্গনপ্রবণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি বস্তিতে বসবাস করেন। এর বাইরে রিক্সাচালক, ভ্যানচালক, দোকান কর্মচারী, গার্মেন্টস কর্মীসহ নানা ধরনের নিম্ন আয়ের মানুষ বসবাস করছেন বস্তিতে। এদের সঙ্গে মিশে বসবাস করছে নানা ধরনের অপরাধীরা। যারা সমাজ ও রাষ্ট্রকে দিন দিন অস্থির করে তুলছে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: