১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

‘অবসরের পরে রায় লেখা’ ॥ এজেন্ডা খালেদার বাস্তবায়নের দায় এখন নতুন কাঁধে -স্বদেশ রায়


২০.৯.২০১২, গুলশান কার্যালয়ে খালেদা জিয়া সাংবাদিক সম্মেলন করেন। ওই সাংবাদিক সম্মেলনের প্রকাশিত খবরের একটি অংশ- ‘ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের স্বাক্ষর করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়া বলেন, অবসরের পরে কোন বিচারপতি আদালতে বসতে পারেন না, রায় লিখতে পারেন না।’ (২১.৯.২০১২ জনকণ্ঠ) শুধু জনকণ্ঠে নয়, ওই সময়ে দেশের প্রতিটি পত্রিকা ও বৈদ্যুতিন মিডিয়া এ সংবাদ পরিবেশন করে। সকলেরই সংরক্ষণে বেগম জিয়ার এ বক্তব্য আছে। শুধু মিডিয়ার আর্কাইভে নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টেও বেগম জিয়ার একই ধরনের বক্তব্য সংরক্ষিত আছে। অর্থাৎ পার্লামেন্ট প্রসিডিংসেও বেগম জিয়ার এমন বক্তব্য আছে। ২৯ জুন ২০১৩, পার্লামেন্টে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দেয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল রায় প্রসঙ্গে খালেদা বলেন, ‘অবসর গ্রহণের ১৬ মাস পর ওই মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর দেয়ার ঘটনা নজিরবিহীন’ (৩০ জুন ২০১৩ জনকণ্ঠ)।

খালেদা জিয়ার এ এজেন্ডা বা বক্তব্যের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়কে অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করা। ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়কে অবৈধ হিসেবে প্রমাণ করতে পারলে দেশে আবার অনির্বাচিত বা অসাংবিধানিক সরকার আসার পথ সৃষ্টি হয়। এখানে একটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া উচিত, বেগম জিয়া যখন পার্লামেন্টে ওই কথা বলছেন, তখন চার সিটি কর্পোরেশনে তাঁর দল রাজনৈতিক সরকারের অধীনে পরিচালিত নির্বাচন কমিশনের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁর দলের অনেকেই তখন দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলেও তাঁরা বিজয়ী হবে। তারপরেও কেন বেগম জিয়া অসাংবিধানিক বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল বলে যে রায় দেয়া হয়েছে তা অবৈধ প্রমাণের এজেন্ডা নিয়ে এগোচ্ছেন। শুধু তাই নয়, ১/১১ এ তিনি জেলে গেছেন তারপরেও কেন তাঁর এই অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা?

যদিও বাংলাদেশে এ বিষয়গুলো শুরু থেকে পরিষ্কার তারপরেও এখন মনে হয় সময় এসেছে একেবারে খোলাখুলি এ কথাগুলো বলা। বাস্তবে বাংলাদেশে পাকিস্তানীদের মাদার পার্টি জামায়াতে ইসলাম, তার সিস্টার অর্গানাইজেশন বিএনপি ও তাদের কোলন জাতীয় পার্টিÑ এরা সবই কিন্তু পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের একটি তথাকথিত রাজনৈতিক মুখায়ব মাত্র। এখানে জামায়াতের সবাই, বিএনপির খালেদা-তারেক গং এবং এরশাদÑ এঁরা বাস্তবে আইএসআইয়ের সুতায় বাঁধা পুতুল। ২০০৯-এ শেখ হাসিনার বিজয় ও ২০১৩তে শাহবাগে তরুণ প্রজন্মের গণজাগরণ মঞ্চের পরে বাংলাদেশকে জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে এ দেশে অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই- তা বাস্তব সত্য। কারণ, একবার শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চ হবার পরে আইএসআই বুঝে গেছে নির্বাচিত হলেও খালেদা আরও সঙ্কটে পড়বে। ক্ষমতায়ও টিকতে পারবে না। তাদের কাজও বাস্তবায়িত হবে না। একটা উদাহরণই এখানে যথেষ্ট, নির্বাচিত হলে খালেদাকে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেক্ষেত্রে তাঁর মাদার অর্গানাইজেশন জামায়াতের পক্ষেই তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আর ওই সিদ্ধান্ত নিতে গেলে শুধু শাহবাগ নয়, সারা বাংলাদেশ গণজাগরণ মঞ্চ হবে। আর তখন গোটা দেশের গণজাগরণ মঞ্চের নেত্রী হবেন অকুতোভয় নেত্রী শেখ হাসিনা। খালেদা সরকারের পতন তখন কি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের বিষয় নয়? আইএসআই এ বিষয়ে অনেক ভাল স্টাডি করেছে। তাই ২০১৩’র পর থেকে তাদের একমাত্র চেষ্টা বাংলাদেশে অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, অসাংবিধানিক সরকার ছাড়া বাংলাদেশকে কোনমতেই জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না। এ কারণে আইএসআই এমনভাবে শেখ হাসিনার সরকারের অবসান চায় যাতে শেখ হাসিনার সরকারের অবসানের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে অসাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এজন্যই তারা ২০১৪’র নির্বাচনের আগে বেগম জিয়াকে নির্বাচনে মনোযোগী হবার বদলে আরবান গেরিলাযুদ্ধের কাজে লাগায়। বেগম জিয়া সে কাজই করে। নির্বাচন থেকে সরে থাকে। যেন আরবান গেরিলাযুদ্ধকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে দেবার সুযোগ পায়। আইএসআইয়ের এই সকল নীলনক্সাকে শক্তভাবে মোকাবেলা করে শেখ হাসিনা নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রান্তে যখন পৌঁছে যান, তখন তারা জিয়াউর রহমানের কোলন এরশাদকে কাজে লাগায়। তাদের কথামতো এরশাদ তখন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে নির্বাচনকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে। যাতে বেগম জিয়ার আরবান গেরিলাযুদ্ধ গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে ও দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অন্য কোন পথে দেশে একটি অসাংবিধানিক সরকার আসতে পারে। কিন্তু দেশের মানুষের সহযোগিতায় এই সকল যড়যন্ত্র নস্যাত করে শেখ হাসিনা দেশে সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে। আইএসআই নির্দেশিত জামায়াত-বিএনপির গেরিলাযুদ্ধও দমনে আপাতত সমর্থ হন শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার ২০১৪-এ বিজয়ের পরে জামায়াত ও বিএনপিকে আবার শক্তিশালী করে যুদ্ধে নামানোর জন্যে আইএসআই সময় নেয় আরও এক বছর। ২০১৫’র জানুয়ারিতে এসে বেগম জিয়া এবার সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নেমে সর্বাত্মক আরবান গেরিলাযুদ্ধ চালানোর চেষ্টা করে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু এক মাসের ভেতরই ব্যর্থ হন বেগম জিয়া। ২০১৫তে বেগম জিয়া ব্যর্থ হবার পরে আইএসআই তাদের কৌশল বদলায়। প্রথমত তারা আবারও প্রায় এক বছর সময় নেয়। এবং এবার তারা নতুন ফ্রন্ট খোলে। দু’বারের এ ব্যর্থতার ভেতর দিয়ে বুঝতে পারে, জামায়াত, বেগম জিয়া ও এরশাদের সঙ্গে নতুন একটি ফ্রন্ট যোগ না করে দিলে তারা বাংলাদেশকে অসাংবিধানিক পথে ঠেলতে পারবে না। বাংলাদেশে জামায়াত, বিএনপি, এরশাদ ছাড়াও কিন্তু আইএসআইয়ের অনেক ফ্রন্ট আছে। কারণ, এ মাটিতে তারা বহুদিন চাষ করার সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া কে তাদের পরীক্ষিত তাও তারা প্রমাণ করার চূড়ান্ত সুযোগ পেয়েছে ১৯৭১-এ। বাস্তবে ১৯৭১-এ প্রমাণিত হয়ে গেছে কে বাংলাদেশের পক্ষে আর কে আইএসআইয়ের পক্ষে। পাকিস্তান থেকে অসম্ভবকে সম্ভব করে ভারতে প্রবেশ করে মেজর মঞ্জুর, কর্নেল তাহের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। মতিউর দুঃসাহসিকভাবে প্লেন নিয়ে পাকিস্তান থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার জন্য পালাতে গিয়ে শহীদ হয়েছেন। অখ্যাত অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন তাদের কেউ ১৪ দিন নদী সাঁতরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন। এমনকি শাহীন মাহমুদের কথা ভাবুন না ১৬ বছরের একটি মেয়ে ঢাকা থেকে একাকী বেরিয়ে আগরতলা পৌঁছেছেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে। আর বিপরীতে হবিগঞ্জ থেকে মাত্র চার মাইল দূরে ভারতীয় সীমান্ত সেখানে না গিয়ে ২২ বছরের মি. সিনহা গোলাম আযমের সৃষ্ট শান্তি বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। তাই কারা এদেশের মানুষ আর কারা মুনতাসীর মামুনের ভাষায় ‘আটকেপড়া পাকিস্তানী’ (বাস্তবে আইএসআইয়ের চর) এ দেশে সে প্রমাণ ১৯৭১ সালে হয়ে গেছে।

তাই আইএসআইকে এদেশে জামায়াত-বিএনপি, এরশাদের সঙ্গে নতুন কোন ফ্রন্ট যোগ করে দিতে কোন কষ্ট হয় না। আইএসআই যে এবার নতুন পথে এগুচ্ছে তার ইঙ্গিত ১৯.১.২০১৬তে পাওয়া গেছে। ১৯.১.২০১৬ বাংলাদেশে নতুন ষড়যন্ত্রের একটি দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই ষড়যন্ত্রের কুশীলবরা জিতবে না বাংলাদেশের মানুষ জিতবে শেষ অবধি সে কথা বলার সময় এখনও আসেনি। এবার ষড়যন্ত্রকারীদের ডালপালা বেশ বড় শুধু নয়, অনেক উচ্চস্থান থেকে এবার বেগম জিয়া ২০.৯.২০১২তে যে কথা বলেছিলেন তাকে স্বীকৃতি দেয়া হলো। ১৯.১.২০১৬ তে মি. সিনহা তার প্রধান বিচারপতি হিসেবে বর্ষপূর্তিতে সুপ্রীমকোর্টের ওয়েব সাইটে দেয়া এক বাণীতে বলেন, অবসরে যাবার পরে রায় লেখা বেআইনী ও সংবিধান পরিপন্থী। খুবই পরিকল্পিত এ পদক্ষেপ। মি. সিনহা আইনজীবী হিসেবে খুব ভালো না হলেও তিনি সংবিধান জানেন না বা এতটুকু আইন জানেন না এ ধারণা যারা করছেন, মনে হয় তারা ভুল করছেন। বরং বিষয়টি খুবই পরিকল্পিত এভাবেই দেখলে অনেক কিছু এর ভেতর দেখা যাবে। যা সম্পূর্ণ খোলাখুলি না বললেও একটি টকশোতে ইঙ্গিত দিয়েছেন প্রবীণ আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন। তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতির এ বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে কোন রিট হলে তখন সংকট সৃষ্টি হবে।

মি. সিনহা আনুষ্ঠানিকভাবে এ কথা বলার আগেও তিনি নানানভাবে কোর্টে এ কথা বলছিলেন। এবং তেমন কিছু কাজও করছিলেন। যারা কোর্ট অঙ্গনে আছেন তারা অনেকেই জানেন, ওই সময় থেকেই কিন্তু বিএনপি রিটের ড্রাফট তৈরির কাজ করছে। কোথায় হচ্ছে, কী হচ্ছে তা সরকার খোঁজ নিলেই জানতে পারবে। তবে আপাতত যতদূর জানা যায়, বিএনপি এ রিটটি ২০১৭তে করবে। ১৬ তে করতে পারে যদি তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বিএনপির ওই রিটকে লাইফব্লাড দেবার জন্যই কিন্তু মি. সিনহা তার বর্ষপূতি হিসেবে ওই বাণী দেন এবং সেটা সুপ্রীমকোর্টের ওয়েব সাইটে দেন। ওই রিট যখন হবে তখন সুপ্রীমকোর্টের ওয়েব সাইট নিয়েও কিন্তু একটি লিগ্যাল প্রশ্ন আসবে। কারণ, ওই ওয়েব সাইটটি কোন নিউজ বা সাধারণ পোর্টাল নয়। ওয়েব সাইটটি সুপ্রীমকোর্টের অফিসিয়াল সাইট। যেখানে পর্যবেক্ষণসহ কোর্টের রায় ও কজলিস্ট প্রকাশ করা হয়। তাই ওই সাইটে যখন প্রধান বিচারপতির কোন বক্তব্য যায় সেটা কোর্টের বক্তব্য না ব্যক্তিগত বক্তব্য এ প্রশ্নেরও অবতারণা হবে। এ কারণেই খালেদার বা আইএসআইয়ের এজেন্ডা কিন্তু এবার খুব সুচিন্তিতভাবে সামনে আনা হয়েছে।

এই বক্তব্য দেয়ার আগে কোন কাজটি করা হয়েছে তাও লক্ষণীয়। হাইকোর্টের একটি বারান্দায় মাত্র গোটা কয়েক বই নিয়ে একটি তথাকথিত বইমেলার আয়োজন করে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবী সমিতি। তাও বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে। অর্থাৎ ১০ জানুয়ারিতে। ওই অনুষ্ঠানে ২০০১-এ বিচারপতি লতিফুর রহমান ও বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে পেছন থেকে চালাতেন অথচ বিএনপি নন এমন একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা আইনজীবীর তৎপরতা ছিল সব থেকে বেশি। ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে মি. সিনহা বলেন, নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের সব ক্ষমতা কেড়ে নিতে চাচ্ছে। তিনি আইনজীবীদের নির্বাহী বিভাগের এই তৎপরতা রুখে দাঁড়াতে বলেন। মি. সিনহার এ বক্তব্য ১০ জানুয়ারি বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ও ১১ জানুয়ারি অধিকাংশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এর পরে ১৪ জানুয়ারি এশিয়ান হিউম্যান রাইট কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বলে, BangladeshÕs Chief Justice Surendra Kumar Sinha has made a rare public statement, he has said the Executive is usurping all the powers of the Judiciary. He called upon all the judges and lawyers to come forward and fight against the ExecutiveÕs attempt........ It is perhaps at the final stage before the sinking of the ship that the captain is making this call. ... We also call upon the UN and the world governments to take the words of the Chief Justice of Bangladesh with utmost seriousness.. (সচরাচর যা ঘটে না এমনই একটি পাবলিক স্টেটমেন্ট করেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি, যেখানে তিনি বাংলাদেশের সব আইনজীবী ও বিচারপতিদের নির্বাহী বিভাগের বিরুদ্ধে কঠোর সংগ্রামে যাবার আহ্বান জানিয়েছেন কারণ, নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের সকল ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে। এটা সম্ভবত একটা জাহাজ ডুবে যাবার আগে ক্যাপ্টেনের দেয়া শেষ বার্তা। যে কারণে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আরও মনে করে জাতিসংঘসহ সব রাষ্ট্রকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির এ হুঁশিয়ারি গুরুত্বের সঙ্গে নেবে।)

এশিয়ান হিউম্যান রাইটসের সঙ্গে বাংলাদেশের কোন কোন শক্তির যোগ আছে; তাদের অন্য বিষয়গুলোর যোগসূত্র এসব সরকারের মনে হয় অজানা নয়। তাছাড়া যদি কিছু অজানা থাকে তাও খোঁজ নিয়ে জানা খুব কঠিন কিছু নয়। তবে এখানে লক্ষণীয় ১০ তারিখের ওই বক্তব্য ও এশিয়ান হিউমান রাইটস ওয়াচসহ অন্যান্যের এ ভূমিকা কেন? এর মূল কারণ কিন্তু ১৯ তারিখে ওয়েব সাইটেÑ ‘অবসরের পরে রায় লেখা অবৈধ’ এই বিবৃতি বা বাণী প্রকাশ করার জন্য। এই বাণী দেয়া হবে বলেই কিন্তু আগে নির্বাহী বিভাগকে এভাবে আক্রমণ করা হয়। যাতে ওই বাণীর পরে সরকার কোন রিএ্যাক্ট করতে গেলে সকলেই বলবে, আসলেই সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাচ্ছে বলেই তারা এমন আচরণ করছে। সরকার যে এ বেকায়দায় ছিল তা বোঝা যায়, অবসরের পরে রায়ের বিস্তারিত অংশ লেখা অবৈধ বলা এমনকি ২১.১.১৬ তারিখ মৌলভীবাজারে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মি. সিনহা পরোক্ষভাবে অতীতের সকল প্রধান বিচারপতিকে (যাদের ভেতর কয়েকজন শুধু প্রধান বিচারপতি ছিলেন না আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সুপ-িতও ছিলেন) তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বক্তব্য রাখলেও সরকার তখনও কোন বক্তব্য রাখতে পারেনি।

সরকারকে এমন বেকায়দা অবস্থায় দেখে অনেক সুবিধা পায় বিএনপি। তারা ২০ তারিখ থেকেই মাঠে নেমে পড়ে। প্রধান বিচারপতির সপক্ষে অবস্থান নেয়। ২১ তারিখ নয়া দিগন্ত, সংগ্রাম ও দিনকাল প্রধান বিচারপতির ওই বক্তব্যকে লিড নিউজ করে। তার সপক্ষে লেখাও প্রকাশ হয়। ২২ তারিখ জামায়াতের মুখপত্র সংগ্রাম মি. সিনহার বক্তব্যকে লিড নিউজ করে। ২৩ তারিখ সংগ্রাম মি. সিনহার বক্তব্যের সপক্ষে লিড ও সেকেন্ড লিড নিউজ প্রকাশ করে। বাংলাদেশে আইএসআইয়ের মাদার অর্গানাইজেশন জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র সংগ্রামের এ ভূমিকা থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যে, এবার আইএসআই কোন পথে এগুচ্ছে। এর পরেও সরকার অবশ্য খুবই শান্ত মাথায় এগিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পার্লামেন্টে একদিন মাত্র আলোচনা হয়েছে। আইনমন্ত্রী বক্তব্য রেখেছেন। প্রাক্তন আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরুও খুবই যুক্তিসঙ্গত বক্তব্য রেখেছেন। তবে এখানে সরকারের থেকে অনেক বেশি বড় ভূমিকা রেখেছে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সপক্ষের মিডিয়া। তারা বিষয়টিকে জনগণের সামনে অনেক বিস্তারিত এনেছে। যাতে দেশের অনেক মানুষ বুঝতে পেরেছে বিষয়টি একটি ষড়যন্ত্র।

এরপরে বঙ্গভবনে একটি ডিনার হয়েছে। তা নিয়ে কিছু কিছু সংবাদ সংবাদপত্রে এসেছে। বাস্তবে তা খুবই সামান্য। তবে এখানে ডিনার কোন বড় বিষয় নয়, শেষ পর্যন্ত এসব উদ্যোগ খুব কার্যকরী কিছু হবে তাও বলার কোন সুযোগ নেই। কারণ, সবই চলছে আইএসআইয়ের ছকে। এবারের ছক সম্পূর্ণ নতুন। কেবল কিছু পরিচিত মুখ আছে যারা ২০০১ সালেও ছিলেন লতিফুর রহমান ও সাহাবুদ্দিনের ষড়যন্ত্রে। শেখ হাসিনা এখন অনেক বড় রাষ্ট্রনায়ক। রাজনীতি, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় সঙ্কট তিনিই ভাল বুঝবেন। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, নেতারা যখন অনেক বড় হয়ে যান তখন তাদের ভেতর এক ধরনের অতি-আত্মবিশ্বাস জন্মে। ওই আত্মবিশ্বাসের ভেতর থাকে লখিন্দরের বাসরের ছিদ্র, যা আমরা বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষেত্রে দেখেছি। ওই ছিদ্র দিয়ে সাপ ঢুকতেও দেখেছি। বঙ্গবন্ধু কিন্তু মোশতাকের সব জানতেন। তারপরেও মনে করতেন, ওকে আমি ওভারকাম করতে পারব। ও আমার কথার বাইরে যাবার সাহস পাবে না।

শেখ হাসিনাও নিশ্চয়ই এই চক্রান্তের সব দেখতে পাচ্ছেন। তিনি দেখতে পাচ্ছেন আইএসআই একটি নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। সেখানে কিভাবে একের পর এক জামায়াত-শিবির ও বিএনপির লোকদের বসানো হচ্ছে। এমনকি তারা আস্তে আস্তে একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানকে তাদের ঘাঁটিতে পরিণত করছে। তারপরেও তিনি মনে করছেন, তিনি ধীরে ধীরে এগুলো ওভারকাম করবেন। আইএসআইয়ের এই বিশ্বস্তদের কিন্তু শুরুতে প্রতিরোধ না করলে বা উপড়ে না ফেললে পরে অসম্ভব হয়ে ওঠে। বিচারপতি লতিফুর রহমান ৭২ সালে ৭১ এর দালালদের উকিল ছিলেন। অর্থাৎ আইএসআইয়ের বিশ্বস্ত। ২০০১-এ শেখ হাসিনা কিন্তু তাকে প্রতিরোধ করতে পারেননি। আর ইতিহাস বলে শেখ হাসিনার ওপর আঘাত করেছে কিন্তু বিচারপতি লতিফুর রহমান, বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্নরা সেবারও পাশে ছিল। এবারও তারা পাশে আছে। অন্যদিকে জামায়াত, খালেদা তো আছেই এবং এরশাদ ইতোমধ্যেই নড়াচড়া শুরু করেছে। এরশাদের এ নড়াচড়াকেও আইএসআইয়ের হাতের বাইরের কিছু মনে করা কি ঠিক হবে? ৭১-এ পরীক্ষিত আইএসআইয়ের লোকেরা শেষ পর্যন্তও আইএসআইয়ের পক্ষে থাকবে। বিচারপতি লতিফুর রহমানের মতো শেখ হাসিনার বুকে ছুরি বসাতে তাদের বিন্দুমাত্র হাত কাঁপবে না।

swadeshroy@gmail.com