১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

দুই দিগন্তের নায়িকা!


গ্রামের আর দশটা সাধারণ পরিবারের যেমন হয়, শুরুর দিকে তার গল্পটাও ছিল তেমন। খেলতে যেতে চাইলেই পথ আগলে ধরতেন বাবা-মা। মেয়ে যখন, কি দরকার ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর! কিন্তু খেলা পাগল কন্যার মন তো মানে না। ছেলেদের মতো মন পড়ে থাকে শুধুই খেলার মাঠে। এই খেলার জন্য বাবার কাছে মিনতি নিয়ে গেছেন কতবার। কিন্তু বাবা রজব আলী খাঁনের সাফ কথা, ‘এসব তোমার খেলা লাগবে না।’ মা ফতেমা বেগম তো বলতেন আরেকটু বাড়িয়ে, ‘বড় হলে বিয়ে দিতে হবে। ঘরকন্যে মন দাও।’ এই গল্প সাতক্ষীরার কিশোরি মাসুরা পারভিনের। যিনি আজ ঘরের সেই চৌকাঠ তো পেরিয়েছেনই, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিনিধিত্ব করছেন নিজ দেশকে। তাও আবার একটি খেলায় নয়, দু-দুটি খেলার জাতীয় দলের হয়ে। ফুটবলের পর এবার তিনি ঠাঁই করে নিয়েছেন জাতীয় মহিলা কাবাডি দলে।

ফুটবলার হিসেবে নিজেকে পরিচিত করেছেন বছর দুই আগেই। ২০১৪ সালে ঘরের মাঠে এএফসি অনুর্ধ ১৬ টুর্মামেন্টে দিয়ে তার আন্তর্জাতিক ম্যাচের শুরু। সেই টুর্নামেন্টে ভাল করেই জায়গা করে নেন জাতীয় দলে। সুযোগ পান সে বছরই পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়া তৃতীয় সাফের দলে। পাকিস্তান মাতিয়ে ফেরার পর আন্তর্জাতিক এবং ঘরোয়া নানা পর্যায়েই খেলেছেন নিয়মিত। তবে নিজেকে শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। খেলেছেন কাবাডিও। কাবাডিতে অংশ নিয়েছেন জেলা পর্যায়ে, এমন কি বাংলাদেশ গেমসেও। আর এবার তো জায়গা করে নিয়েছেন এসএ গেমসে অংশ নিতে যাওয়া জাতীয় মহিলা কাবাডি দলেও। ধানম-ির সুলতানা কামাল মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্সের সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে মাসুরা পারভিন শোনালেন তার ‘ছোট্ট’ জীবনের বর্ণিল পথচলার গল্প। ‘ আব্বু-আম্মু তো কিছুতেই খেলায় আসতে দিতে চাইত না। কিন্তু বলতে পারেন আমার মধ্যে এক ধরনের জেদ ছিল। আমার বান্ধবীরা খেলতে যেত নিয়মিত। আব্বু-আম্মুর কথা অমান্য করেই আমি ওদের সঙ্গে যেতে থাকি। খেলতে খেলতেই তখন একটা নেশা তৈরি হয়ে যায়। আর যখন দেখি খেলাধুলায় ভাল করলে সবাই মাতামাতি করে তখন বেশি করে আকৃষ্ট হই খেলার প্রতি।’ বলতে বলতে মাসুরা যেন ফিরে যান ২০১০ সালের তার শুরুর দিনগুলোতে।

এত গেল খেলাধুলার প্রতি মাসুরার ভাললাগা তৈরির গল্প। কিন্তু বাবা-মাকে রাজি করালেন কি করে? উত্তর দিতে গিয়ে নিজের প্রথম গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা ঝরে এই কিশোরীর কণ্ঠে, ‘সেই সময় চারদিকে সাবিনা আপুর (জাতীয় দলের ফুটবলার) নাম ডাক ছড়িয়েছে। আব্বুও শোনে ছিল তার কথা। আপুর কথা (সাবিনা খাতুন) বলার পরই একটু নরম হয়েছিলেন তিনি। তবে আব্বুকে রাজি করাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আমার প্রথম কোচ আকবর আলী স্যারের। স্যার বাসায় এসে আব্বুকে অনেক বোঝানোর পরই আসলে আমাকে খেলায় ঢুকতে দেয়। সেখান থেকে আনুশীলন করতে করতেই আমার এত দূর আসা।’ শুধু আসা নয়, মাসুরার এর পরের যাত্রা এক রকম বিজয় যাত্রারার মতো। নয়লে দুই বছরের ব্যবধানে ফুটবলের পর কাবাডি জাতীয় দলেও অভিষেক হয় কি করে! আর কি বর্ণিল শুরু দেখুন। ফুটবলে অভিষেক সাফে, আর কাবাডিতে অভিষেক হতে যাচ্ছে এসএ গেমসে। অবশ্য ফুটবলের পশাপাশি মাসুরার কাবাডিতে আসা হঠাৎ করেই। ২০১৪ সালে বিচ কাবাডি হয়েছিল কক্সবাজারে। সেই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন এই কিশোরী। যেখানে সেরা খেলোড়ের পুরস্কার জিতে নজরে পড়েন জাতীয় দলের কোচ আব্দুর জলিলের। এর আগে অবশ্য জেলা কাবাডি এবং বাংলাদেশ গেমসেও খেলেছেন। সেখানেও পারফর্মেন্স ছিল নজরকাড়া। তবে কক্সবাজারের সেই বিচ গেমসই তার কাবাডি ক্যারিয়ারে মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

কিন্তু ফুটবলের জাতীয় দল ছেড়ে কাবাডিতে আসতে কি ভাবনায় পড়তে হয়নি? মাসুরা বলেন, ‘আসলে এসএ গেমসে মেয়েদের ফুটবল হবে কি না তা নিয়ে সংশয় ছিল। তাই কাবাডির বিচ গেমসে সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পর পরের প্রশিক্ষণগুলোতে অংশ নেই এবং জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে যাই।’ তখন না হয় একটা অনিশ্চয়তা ছিল বলে কাবাডিতে চলে আসা। কিন্তু ভবিষ্যতে যদি যে কোন দুইটি থেকে একটি বেছে নিতে হয়? উত্তরে মাসুরা এমন বিচক্ষণ যে বয়সের সঙ্গে তা যায় না, ‘আসলে এনিয়ে এখন কিছু ভাবছি না। কাবাডিতে আছি, এখন এটা নিয়েই ভাবতে চাই। ফুটবলে যখন যাব তখন ফুটবল নিয়ে ভাববো। দুই দিকে চিন্তা করলে তো কোনটাই হবে না।’ তবে কাবাডিতে নিজের অভিষেকের আগে কিছুটা নার্ভাসনেস কাজ করছে তার মনে, ‘কাবাডিতে আগে তো এত বড় টুর্নামেন্ট খেলিনি। তাও আবার দেশের বাইরে খেলা হবে। তাই কিছুটা নার্ভাস লাগছে। তবে বড় আপুরা অনেক সাহায্য করছেন আমাকে। আশা করি সব বাধা আমরা জয় করতে পারব।’

সাফল্যের পথ বেয়ে ক্যারিয়ারে যখন তিনি নতুন দিগন্ত ছোঁয়ার অপেক্ষা, তখন মাইলফলকের কথা মনে হলে অবশ্য রোমাঞ্চই জাগে তার মনে, ‘ফুটবলের পর কাবাডিতেও জাতীয় দলে খেলতে যাচ্ছি। এটা ভাবতেই ভাল লাগছে। দুইটা ভিন্ন খেলা হলেও দলীয় খেলা দুটিই। তাই দুটিই আমার কাছে সমান প্রিয়। ফুটবলে ডিফেন্সে খেলি। আর কাবাডিতে রেইডিং বা অলরাউন্ডার। এ কাজগুলো আমি উপভোগ করি।’ আর নিজের স্বপ্ন? আপাতত কাবাডিতে প্রতিষ্ঠা পাওয়াটাই তার লক্ষ্য বলে জানালেন, ‘কাবাডিতে সবে শুরু করলাম। এসএ গেমসই আমার প্রথম আন্তর্জাতিক কাবাডি হতে যাচ্ছে। স্বপ্ন দেখি ওপরে ওঠার। তবে এই মুহূর্তে আসল লক্ষ্য ভাল করে দলে টিকে থাকা।’ সাতক্ষীরার এই কিশোরী কাবাডিতে প্রথম চোখে পড়েছিলেন যার, বর্তমান মহিলা কাবাডি দলের প্রধান কোচ সেই আব্দুল জলিল বড় কিছুর সম্ভাবনাই দেখেন তার মধ্যে। মাসুরা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জলিল জানালেন, ‘বিচ কাবাডিতেই তাকে আমি প্রথম দেখি এবং বাছাই করি। সেখান থেকে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণের পর ও মূল দলে জায়গা করে নেয়। মাসুরা পারভিন যদি কাবাডিতে লেগে থাকে তবে সে ভবিষ্যতে ভাল মানের একজন মহিলা খেলোয়াড় হবে বলে বিশ্বাস আমার। কারণ রেইডিং সাইড তার খুবই ভাল।’ কৈশরের গ-ি এখনও না পেরলে কি হবে, খেলার মাঠে কিন্তু প্রারতপক্ষকে চুল পরিমাণ ছাড় দেন না তিনি। এ কারণেই ফুটবলে ডিফেন্স এবং কাবাডির রেইডিংয়ের মতো দায়িত্ব সামলাতে পারেন। ফুটবলের রক্ষণ সামলাতে গিয়ে তো নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের এক ম্যাচে লাল কার্ডও পেতে হয়েছিল তাকে।

দুই খেলায় সমান পরদর্শী এই সব্যসাচীর পথ চলায় পরিবার থেকে বাধার কথা বলা হয়েছিল লেখার শুরুতে। কিন্তু এখন আর সেই রকম কিছু নেই বলেই জানালেন তিনি। বরং বাবা-মা গর্ব করেন মেয়েকে নিয়ে, ‘পরিবার থেকে এখন আর কোন সমস্যা নেই। এখন বাবা-মা সবভাবেই সহযোগিতা করেন খেলতে। আমাকে নিয়ে তারা গর্ব করেন এখন।’ মেয়েদের খেলাধুলার পথ মসৃণ হলে বাংলাদেশের নারী জাগরণের পথ আরও সুগম হবে বলে বিশ্বাস এই কিশোরী।