২৩ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার ॥ সময়খেকো প্রকল্প


রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীর মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পের সময় বেড়েছে তিনবার। তিন দফা নির্মাণ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন গুণেরও বেশি। তবুও অর্থ আর সময়খেকো এ প্রকল্পের কাজ কবে শেষ হবে এর নিশ্চয়তা নেই। এর মধ্যে সোয়া আট কিলোমিটার এই প্রকল্পের সঙ্গে ৪৫০ মিটারের পৃথক আরেকটি লুপ যোগ হয়েছে। যা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কেন্দ্র (এফডিসি) থেকে সোনারগাঁও হোটেলের সামনে গিয়ে শেষ হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি ইতোমধ্যে ৯০ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার। বাকি কাজ শেষ করতে ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। যদিও ২০১৪ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে এলজিইডি বলছে, সর্বোচ্চ ৬৬ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা।

মগবাজার-মৌচাক ওড়াল সড়কের প্রকল্প পরিচালক নাজমুল আলম জনকণ্ঠকে বলেন, মোট প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৬৬ ভাগ। তিনি জানান, সাত রাস্তা থেকে হলি ফ্যামিলি পর্যন্ত ওড়াল সড়কের অংশটি খুলে দেয়া হবে নতুন বছরের মার্চ মাসের মধ্যে। নিউ ইস্কাটন থেকে বিশাল সেন্টার পর্যন্ত আগামী বছরের মে অথবা জুন মাসের মধ্যে খুলে দেয়ার কথা রয়েছে। রামপুরা আবুল হোটেল থেকে রাজারবাগ-শান্তিনগর অংশ ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে। এর মধ্যে কাজ শেষ হবে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় বাড়ানোর আবেদন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো কোন বিষয় নয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। তবে ওভার অল প্রকল্পের সময় ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্মাণাধীন চার লেনের এ ফ্লাইওভার তিন ধাপে চালুর প্রস্তুতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। প্রথম ধাপে ফ্লাইওভারটির সাত রাস্তা থেকে শুরু হয়ে হলি ফ্যামিলির মোড় পর্যন্ত অংশটি আগামী বছরের মার্চে খুলে দেয়া হতে পারে। এ অংশের কাজ আগামী ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়ার কথা আছে। পরের ধাপে ফ্লাইওভারটির বাংলামোটর-মৌচাকমুখী লেনটি আগামী বছরের শেষ দিকে উন্মুক্ত হবে। রাজারবাগ শান্তিনগরের দিকের অংশটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করতে ২০১৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় চাওয়া হয়েছে।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, প্রকল্পের বাংলামোটর অংশে কিছুটা কাজ চলছে। তার ধীরগতি। বিশাল সেন্টারের সামনের রাস্তাটি চাপা হওয়ায় যানবাহন চলাচলে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। রাশমনো হাসপাতালের সামনে ভারি যন্ত্রপাতি দিয়ে কাজ করার সময় সম্প্রতি মাটির নিচে থাকা গ্যাস লাইন ফেটে যায়। তা মেরামতের সময় মাটি খোঁড়া হয়েছিল। তখন ড্রেনের পাটাতনও ভেঙ্গে যায়। তা এখন পর্যন্ত মেরামত হয়নি। বিশাল সেন্টার ও আড়ংয়ের সামনের রাস্তায় বিদ্যুতের কয়েকটি খুঁটি সরিয়ে দিলে স্বাভাবিকভাবে যানবাহন চলাচল করতে পারে। রাজারবাগ এলাকায় কাজের গতি নেই। এক মাসের বেশি সময় কাজ বন্ধের কথা জানিয়েছেন শ্রমিকরা। ভাঙাচোরা রাস্তা। মেরামত না করায় দুর্ভোগের মধ্যে যানবাহন ও পথচারীদের চলতে হচ্ছে। শান্তিনগর অংশের কাজের গতি কম। মৌচাক থেকে আবুল হোটেল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ। এখানে রাস্তার দু’পাশে ভাঙাচোরা অবস্থা। রাস্তার ওপর মাটি রেখেই কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ ফ্লাইওভার এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে; যা রিখটার স্কেলে ১০ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয়। প্রতিটি পিলার ১৫০ মিটার গভীর। ফ্লাইওভারটির বিভিন্ন জায়গায় ৮টি বড় মোড় রয়েছে এবং তিনটি রেলক্রসিং রয়েছে।

যৌথ উদ্যোগের এই প্রকল্প ॥ সরকার ও দাতা সংস্থার যৌথ উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের তিনটি প্যাকেজের মধ্যে দুটি প্যাকেজের (ডব্লিউ-৫ ও ডব্লিউ-৬) কাজ করছে চীনের মেট্রোলজিক্যাল কনস্ট্রাকশন ওভারসিজ কোম্পানি ও দেশী তমা কনস্ট্রাকশন। অন্য প্যাকেজের (ডব্লিউ-৪) কাজ করছে ভারতের সিমপ্লেক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড ও দেশীয় প্রতিষ্ঠান নাভানা কনস্ট্রাকশন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পের কাজ করছে এলজিইডি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলছেন, মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্পের ২৬৫টি পিলারের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৫৫টির বেশি নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।

এক বছর আগে কাজ শেষ হওয়ার কথা ॥ জানা গেছে, মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার প্রকল্প একনেক সভায় অনুমোদন হয় ২০১১ সালে। এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, মগবাজার-মৌচাক ও মৌচাক-হাজিপাড়া-কাকরাইল- এই অংশ দুটি গত ২০১২ সালের ১৮ নবেম্বর শুরু হয়, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের নবেম্বর মাসে। তবে ড্রয়িং-ডিজাইনসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সরবরাহে সমন্বয়ের অভাব ও সঠিক নক্সা পেতে বিলম্ব হয়। সে কারণে সাময়িকভাবে এটি বন্ধ করতে বাধ্য হয় বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এরপরে প্রকল্পটির বাস্তবায়নের সময় বাড়ানো হয়। বাংলামোটর থেকে মৌচাক পর্যন্ত প্রকল্প ৬-এর কাজটিও শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরের ডিসেম্বরে, আর মৌচাক থেকে হাজিপাড়া-রাজারবাগ হয়ে শান্তিনগর-কাকরাইল পর্যন্ত দীর্ঘ ফ্লাইওভারের কাজটি শেষ করার কথা আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে।

তমার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতাউর রহমান মানিক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, বাংলামোটর থেকে মগবাজার হয়ে মৌচাক পর্যন্ত (প্রকল্প ৬-এর) কাজ শেষ করার কথা এ বছরের ডিসেম্বরে। ফ্লাইওভারের ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে বিভিন্ন সমস্যায় এ কাজটি ২ থেকে তিন মাস বেশি লাগতে পারে। আবার মৌচাক থেকে (ত্রিমুখী ফ্লাইওভার) মালিবাগ হয়ে রাজারবাগ-শান্তিনগর-কাকরাইল পর্যন্ত (প্রকল্প-৫)-এর কাজ শেষ করার কথা আগামী ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। আশা করছি ওই সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ হবে। তিনি বলেন, বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও আমরা সময় মতো কাজটি করে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

তিনি বলেন, কাজে বিলম্বের কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, বিশেষ করে ইউটিলিটির কারণে কাজে বিঘœ ঘটছে। এছাড়া নক্সা জটিলতা, ব্রিজ নক্সা এলাকায় মাটির নিচে ১৩২ কেভি ইলেকট্রিক লাইন রেখে আমাদের কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে। অনেক সাবধানতা সত্ত্বেও সমস্যা হচ্ছে। মাটির নিচে তিতাস গ্যাসের লাইন, ওয়াসার দুটি লাইন, ১৩২ কেভি বিদ্যুতের লাইনসহ টেলিফোন লাইন রয়েছে। যেগুলো মাটি কাটার সময় নিচে পড়ায় কাজ বন্ধ করতে হচ্ছে।

এক হাজার ২১৮ কোটি টাকা ব্যয় ॥ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে দফায় দফায় এ প্রকল্পের অর্থ বাড়ানো হয়েছে। সেইসঙ্গে এই প্রকল্পটি সময়মতো শেষ না হওয়ায় সড়ক পরিবহন মন্ত্রী কয়েক দফা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সূত্রগুলো বলছে, একজন প্রতিমন্ত্রীসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এ প্রকল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে যুক্ত। তাই অর্থ বরাদ্দ ও সময় বারবার বাড়লেও সবকিছু নীরবেই মেনে নেয়া হচ্ছে। অথচ চুক্তিতে আছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বদল, কালো তালিকাভুক্ত করাসহ আর্থিক জরিমানা ও কারাদ-ে দ-িত করা যাবে। প্রথম পর্যায়ে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৪৩ কোটি টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ে তা করা হয়েছে ৭৭২ কোটি টাকা। বর্তমানে এক হাজার ২১৮ কোটি টাকা নির্মাণ ব্যয় একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয়ের সাত শ’ ৭২ কোটি ৭০ লাখ টাকার মধ্যে সরকার দেবে দু শ’ কোটি ৪৭ লাখ, সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট তিন শ’ ৭৫ কোটি ২৫ লাখ এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এক শ’ ৯৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দেবে।

ফের অর্থ ও সময় বাড়ানোর আবেদন ॥ ঢাকা সিটি কর্পোরেশন থেকে দুই বছরের জন্য প্রকল্প এলাকার রাস্তার দায়িত্ব নেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে ফের রাস্তা বুঝিয়ে দেয়ার কথা। এর মধ্যে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা এলজিইডির। কিন্তু প্রকল্পের সোয়া আট কিলোমিটার রাস্তা নিয়ে হইচই কম হয়নি। রাজধানীতে যানজট ও জনদুর্ভোগের অন্যতম কারণ মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার। বর্ষা মৌসুমে প্রকল্পের এ অংশে তিন মাসের বেশি সময় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। এক পর্যায়ে গণপরিবহনগুলোকে রাস্তা পরিবর্তন করে চলতে হয়।

এই প্রকল্পের জন্য বছরের পর বছর নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে বারবার তাগিদ দেয়া হয়েছে দ্রুত কাজ শেষ করার। ঢাকা ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন অথরিটি (ডিটিসিএ) চেয়ারম্যান হিসেবে সড়ক পরিবহন মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের প্রকল্প এলাকা অন্তত ২০ বার পরিদর্শন করেছেন। রাস্তার বেহাল দশার কারণে বারবার ক্ষেভে জানিয়েছেন, মন্ত্রী থেকে শুরু করে পরিবহন মালিক, শ্রমিকরা। কিছুতেই টনক নড়ে না কর্তৃপক্ষের। জোড়াতালির সংস্কার করার কিছুদিনের মধ্যে রাস্তা ভাঙছে। কাজও শেষ হয় না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ইউটিলিটি সার্ভিসসহ নানা জটিলতার অভিযোগ তোলা হলেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চুক্তির সময় পুরো বিষয়টি উল্লেখ ছিল। তাছাড়া নক্সাতেও তা দেখানো হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে মোট প্রকল্পের সঙ্গে বাড়তি অর্থও যোগ করা হয়েছিল। সঙ্গত কারণেই কাল ক্ষেপণের জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বারবার নানা অভিযোগ তোলা হয়েছে। এদিকে সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে সময় ও অর্থ বাড়ানোর আবেদন জমা দেয়া হয়েছে। প্রভাবশালীদের তদবিরে তাও মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।