১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

জলবায়ু পরিবর্তন ঝুঁকির মুখে এশিয়ার পানির উৎস


জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এশিয়ার পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। মঙ্গোলিয়া সীমান্তের কাছাকাছি চীনের পার্বত্য অঞ্চলের হিমবাহগুলোর অস্তিত্ব এখন ভয়াবহ সঙ্কটের মুখে। যে বরফ কোনদিনই গলবে না বলে এক সময় মানুষের মনে প্রত্যয় জন্মেছিল সেগুলো এখন গলতে শুরু করেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই অঞ্চলটি বিশ্বের তৃতীয় মেরু হিসেবে পরিচিত। কারণ উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর পর হিন্দুকুশ-হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলটি পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বরফের সঞ্চয় রয়েছে। এটি এশিয়ার পানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস।

এক সময় মানুষ মনে করত হিমবাহগুলো প্রকৃতির স্থায়ী অংশ। এর কোন ক্ষয় বা লয় নেই। বিশেষ করে ১৯৭০ ও ৮০-এর দশকে অনেকের বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে, হিমবাহের ক্ষয় নেই। এরপর ১৯৯০-এর দশক থেকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যখন কথাবার্তা শুরু হতে থাকল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশও যে বদলে যেতে শুরু করে তা নিয়ে আর কোন বিতর্ক থাকল না।

অনেক বছর ধরেই বিজ্ঞানী কিন জিয়াং এবং তার সহযোগীরা চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কিলিয়ান পার্বত্য অঞ্চলের একটি নিভৃত গবেষণাগারে বসে হিমবাহ গলে যাওয়া পর্যবেক্ষণ করছিলেন। চীনের পানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর একটি হিমবাহ। ৪২ বছর বয়সী কিন বলছিলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো হিমবাহ। মানুষ এক সময় মনে করত এগুলো কখনও গলবে না। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফল তারা এখন স্বচক্ষেই দেখতে পাচ্ছে।’ হিমবাহ খ-ের ওপর দাঁড়িয়ে তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন তখন তার ঠিক পায়ের নিচে থেকে অনবরত আসা বরফ ভেঙ্গে পড়ার শব্দ জানিয়ে দিচ্ছিল আসলেই জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম বাস্তবতা এখনই দেখা দিতে শুরু করেছে চীনের পশ্চিমাঞ্চলে। তথাকথিত তৃতীয় মেরু নামে পরিচিত হিমালয় ও তৎসংলগ্ন পর্বত শ্রেণীগুলোর হিমবাহ গলতে আরম্ভ করেছে। এর ফলে এশিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থা এখন ঝুঁকির মুখে। এখানকার ঐতিহাসিক বাণিজ্য পথ ‘সিল্ক রোডের’ পার্শ্ববর্তী অনুর্বর হেক্সি করিডরটি ছিল উট গরু ছাগলের বিচরণ ক্ষেত্র। কিন্তু সেখানে এখন অতিবৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি নিয়মিত ঘটনা। গলতে শুরু করেছে তিব্বত-কিনগাই মালভূমির স্থায়ী বরফে পরিণত হওয়া পার্মাফ্রস্ট। ফলে এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি বিঘিœত হচ্ছে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা-। তিব্বতের লাসা পর্যন্ত উঁচু এলাকায় চীন যে রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ দূষণের ফলে চীন এখন যে বিপর্যয়ের মুখে পড়তে ধরেছে সে বিষয়ে মাত্র কয়েক বছর হলো দেশটির বিজ্ঞানীরা সতর্ক করতে শুরু করেছেন। প্যারিসে জলবায়ু বৈঠক সামনে রেখে কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে দৃষ্টি দিয়েছে।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ গ্রীনহাউস নির্গমনকারী দেশ চীন। দেশটি গত বছর প্রথমবারের মতো ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নির্গমন কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উদ্যোগী ভূমিকা নেয়ার কথা জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। গত মাসে প্রকাশ করা এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, হিমবাহ গলন ও সমুদ্র তলের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে চীন জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার মুখে রয়েছে। শিল্পায়নের গতির সঙ্গে মিল রেখে বেড়ে চলেছে কার্বন নির্গমন। ফলে বেড়ে চলেছে তাপমাত্রা। যে গতি চীনের তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে তা অব্যাহত থাকলে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ চীনের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

মধ্য এশিয়াকে ঘিরে প্রাচীন ও মধ্যযুগে যে বাণিজ্যপথ গড়ে উঠেছিল তার মূলে ছিল পানির সহজ প্রাপ্যতা। সিল্ক রোড নামে পরিচিত এই বাণিজ্য পথ দিয়ে দিয়ে যাতায়াতকালে সওদাগর ও তাদের পশুগুলো এখানে সেখানে বিশ্রাম গ্রহণ ও পানি পান করতে পারত। ঐতিহাসিক সেই যোগাযোগ পথের একটি অংশ ঝড়, বন্যা ও তুষারঝড়ের দীর্ঘকালীন প্রতিক্রিয়ায় হারিয়ে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ অতিমাত্রায় কার্বন নির্গমন। কার্বন বা গ্রীনহাউস গ্যাসের মাত্রা ছাড়া নিঃসরণের ফলে হু হু করে বাড়ছে তাপমাত্রা। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী এক শতকে বিশ্বের তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরতে প্যারিস জলবায়ু আলোচনায় একটি বৈশ্বিক চুক্তি হয়েছে। জাতিসংঘের সদস্য ১৯৩টি দেশের সবক’টি এ চুক্তি অনুমোদন করেছে। বলা হচ্ছে, এবারের চুক্তিটি বাস্তবায়ন করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক হবে। যদিও চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় পুরোপুরো কাটেনি। জলবায়ু সম্পর্কিত যে কোন চুক্তি বাস্তবায়ন করতে দুটি বিষয়ের কোনো বিকল্প নেই। একটি হলো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সদিচ্ছা এবং দ্বিতীয়টি হলো অর্থ।

বায়ুম-লে কার্বনের বোঝা বাড়িয়ে চলার জন্য কয়েকটি দেশকে দায়ী করা হয়। এরা হলো যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত ও ব্রাজিল। এর মধ্যে চীন এতদিন পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে কখনোই দেখা যায়নি। ব্যাপক শিল্পায়নের প্রতিক্রিয়ায় চীনের অনেক শহরের কালো ধোঁয়া বা ধোঁয়াশা (ধোঁয়াযুক্ত কুয়াশা) অনেকদিন ধরেই একটি বড় সমস্যা হলেও এ নিয়ে সরকারীভাবে উদ্যোগ গ্রহণের কথা তেমন একটি শোনা যায়নি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় পানির উৎস নিয়ে যখন প্রশ্ন উঠেছে তখন বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ কিছুটা নড়েচড়ে বসেছে বলে মনে হয়। এবারের প্যারিস বৈঠকে চীনের সুর ছিল অনেকটাই সহযোগিতামূলক।

শহরাঞ্চলে বায়ু দূষণের প্রধান কারণ কয়লা পোড়ানো। এ মাসের গোড়ার দিকে চীন প্রথমবারের মতো বায়ু দূষণ বিষয়ে রেড এলার্ট জারি করেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। চীন সরকারের নীতি নির্ধারক মহলের এখন আর এমন কোন কর্মকর্তা নেই যিনি জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটির বিরোধিতা করছেন।

গত মাসে চীনের জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রকাশিত জলবায়ু সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তিব্বত-কিংহাই মালভূমির পার্মাফ্রস্ট (বরফে পরিণত হওয়া মাটি) আগামী শতাব্দী আসার আগেই গলে যেতে পারে। এছাড়া চীনে তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে ১.৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। বিশ্বের অন্যত্র যে গতিতে তাপমাত্রার বৃদ্ধি ঘটছে ১৪০ কোটি জন অধ্যুষিত দেশটিতে তার প্রায় দ্বিগুণ গতিতে ঘটছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গত ১০ বছরে চীনে নগর অঞ্চলে বন্যার প্রকোপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এছাড়া চীনের বিজ্ঞানীদের পৃথক এক রিপোর্টে বলা হয়েছিল চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহের আস্তরণ গত ৪০ বছরে ৩০ শতাংশ ক্ষয়ে গেছে।