২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বিজয়ের মাসে মনে পড়ে তোমাদের


সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

ডিসেম্বর মাস এলেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সরব হয়ে উঠতে দেখা যায়। অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে গোটা দেশ। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরকেই মুক্তিযুদ্ধের মাস বলে অনেকে মনে করেন। সারা বছর আর মুক্তযুদ্ধ, দেশপ্রেম, স্বাধীনতা নিয়ে তেমন কোন খবর থাকে না। যেমনটা হয় একুশে ফেব্রুয়ারি বা পহেলা বৈশাখে। সারা বছর বাংলা নিয়ে কোন মাথাব্যথা না থাকলেও এই দিনটাতে সবাই অতি বাঙালী হয়ে ওঠে।

মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা হচ্ছে, সামরিকজান্তা ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে একাত্তরে পঁচিশে মার্চে রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানী সেনারা অনৈতিকভাবে ঢাকায় অতর্কিত হামলার পর থেকে বাঙালী জাতি এক অনাকাক্সিক্ষত যুদ্ধে জড়িয়ে যায়। শুধু ডিসেম্বর নয়, ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাস বা ২৬৬ দিন চলে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। সে যুদ্ধে লেখক-সাংবাদিক, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, কৃষক-শ্রমিক, ধনী-গরিব, ক্রীড়াসংগঠক-খেলোয়াড় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ অকাতরে প্রাণ হারায়। এ ৯ মাসে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়।

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের এক অনন্য ইতিহাস, এক বেদনার ইতিহাস; স্বজন হারানোর ইতিহাস। আর মুক্তিযুদ্ধের ফলেই অর্জিত হয় স্বাধীনতা। স্বাধীনতা হচ্ছে আমাদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনের জন্য আমাদের অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। বাঙালী নিধন যজ্ঞে শুধু যে ৩০ লাখ মা-বাবা, ভাই-বোনই প্রাণ দিয়েছে তাই নয়। ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানী হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের বাড়ি-ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে খানসেনারা এবং তাদের দোসররা। সে সব ইতিহাস সকলেরই কম-বেশি জানা। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকের অনেক তথ্য জানা থাকলেও এখনও অনেক কথা রয়ে গেছে অজানা। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি অনেক কাজ এখনও বাকি রয়ে গেছে সে কথাও ঠিক। আর এ বিষয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। একাত্তরে শহীদ লেখক-সাংবাদিক, শিক্ষক-বুদ্ধিজীবী, সেনা সদস্য-পুলিশসহ প্রায় সব শ্রেণী-পেশার মানুষের কথা বিভিন্নভাবে তুলে ধরার কারণে অনেকেই তাদের নাম জানেন, তাদের সম্পর্কে অনেক তথ্য জানেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের কত জন মানুষ একাত্তরে শহীদ হয়েছেন সে তথ্যই আমাদের অনেকের জানা নেই। তবে এটা আমাদের সবার জানা দরকার। যারা বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে দিয়ে গেল স্বাধীনতা তাদের নামগুলো জানা দরকার। তাদের একটা তালিকা থাকাটা খুবই জরুরী। এ বিষয়টি সামনে আনার তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই। যদিও কাজটি আরও আগেই হওয়া দরকার ছিল। তবে দেরি হলেও সময় যে শেষ হয়ে গেছে তা নয়। এখনও কাজটি শুরু করার সময় আছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে কথা উঠলেই বার বার একটা নামই সবার আগে আসে। সেটি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের নাম। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অবদান নিঃসন্দেহে বিশাল। তবে এর বাইরেও যে মুক্তিযুদ্ধে ক্রীড়াঙ্গনের আরও অনেকের বড় বড় অবদান রয়েছে তার অনেক খবরই আমরা অনেকে জানি না। সারা দেশে হাজারও শহীদ খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়া সাংবাদিক থাকলেও যদি কাউকে শহীদ খেলোয়াড়দের নাম বলতে বললে অনেকেই দশজনেরও নাম বলতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। আমি নিজেও সকলের নাম জানি না। শহীদ ও বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের সূর্যসন্তান। তাদের নিয়ে প্রচুর কাজ হওয়া দরকার এবং এ নিয়ে প্রচুর কাজ করার সুযোগ আছে। কাজগুলো হওয়াও খুবই দরকার। আর সে কাজে এগিয়ে আসতে হবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, ক্রীড়া পরিদফতরসহ সব ফেডারেশন, জেলা ক্রীড়া সংস্থাকে। অন্য অনেকের চেয়ে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাজটি করা অনেকটা সহজ। ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কাজটি করতে পারে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা ক্রীড়া পরিদফতরকে দিয়ে। সে ক্ষেত্রে দেশের জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ খেলোয়াড়দের নাম সংগ্রহ করা যেতে পারে। যেটা কোন ক্রীড়ালেখক বা সাংবাদিকের জন্য অতটা সহজ নয়। সে আলোচনায় পরে আসছি। তার আগে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ খেলোয়াড় তথা ক্রীড়াঙ্গনের শহীদদের নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করা যেতেই পারে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন একুশ বছরের টগবগে তরুণ ক্রিকেটার ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে শহীদ জুয়েল এবং ক্রীড়াঙ্গনের আরেক শহীদ আজাদ বয়েজ ক্লাবের কর্মচারী শহীদ মোস্তাকের নামে ‘জুয়েল-মোস্তাক স্মৃতি ক্রিকেট’ নামে একটি ক্রিকেট প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কয়েক বছর চলার পর সে প্রতিযোগিতা বন্ধও হয়ে যায়। শহীদ জুয়েল যদিও ক্রীড়াঙ্গনের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে ‘বীরবিক্রম’ উপাধি পান এবং একমাত্র শহীদ খেলোয়াড় হিসেবে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া পুরস্কারও লাভ করেন। কিন্তু মোস্তাক বা অন্যরা তেমন কিছুই পাননি। তাদের কারও নামে কোন স্মৃতিস্তম্ভ হয়নি, হয়নি কোন স্টেডিয়ামের নামকরণ; তাদের নিয়ে না কোন স্মরণিকা বা বই-পুস্তক প্রকাশ করা হয়নি। কোথাও তেমন কোন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কোন শহীদ খেলোয়াড়ের নামে হয় না। হলেও সেটা কদাচিৎ। জুয়েল-মোস্তাক ছাড়াও ঢাকার ক্রীড়াঙ্গনের ফুটবলার কালে খা, ফুটলার মজিবর রহমান, ফুটবলার ও ক্রিকেটার মিজানুর রহমান, সাঁতারু শাহেদ আলীসহ আরও অনেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। অথচ এদেরও কারও নামে ক্রীড়াঙ্গনে না হয়েছে কোন স্মৃতিস্তম্ভ, না কোন খেলার মাঠ বা কোন টুর্নামেন্ট। এদের কেন দু’একজন ছাড়া অন্যদের নামেও হয় না। তাদের অনেকের পরিবার সামাজিক মর্যাদাটাও না পাচ্ছে। অনেকের পরিবার হয় তো ঠিক মতো শহীদ পরিবারের ভাতার টাকাও পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ক্রীড়ালেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ডেইলি অবজারভারের ক্রীড়া সাংবাদিক সৈয়দ আবদুল মান্নান, সকলের প্রিয় লাডু ভাইও একাত্তরে শহীদ হন। তার মতো একজন গুণী লোকের নামেও কিছু করা হয়নি। কোন স্টেডিয়ামের নামকরণ তো দূরের কথা, একটি প্রেসবক্সের নামকরণও করা হয়নি! অথচ এদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য কত রকমের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারত।

এত গেল ঢাকার কথা। ঢাকার বাইরেও দেশে অসংখ্য খেলোয়াড়, ক্রীড়া সংগঠক, ক্রীড়া সাংবাদিক শহীদ হয়েছেন। তাদের অনেকের নাম-ধামও আজ স্মৃতির ধুলোর নিচে চাপা পড়ে গেছে। জুলাইয়ের ১৯ তারিখে নীরবেই চলে গেল মাগুরার কৃতী ফুটবলার লুতুর মৃত্যুদিবস। একাত্তরে রাজাকাররা ১৯ জুলাই মেধাবী ফুটবলার লুতুকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আগস্টের ২০ তারিখে গেল মাগুরার পুখরিয়া গ্রামের আরেক কৃতী ফুটবলার কাজী বাকুর মৃত্যু দিন। লুতুর মতো বাকুকেও রাজাকাররা ধরে নিয়ে নবগঙ্গার তীরে গুলি করে হত্যা করে। একটা সময় ছিল, যখন বাকু ও তার ভাই বাদশার জাদুকর ফুটবল খেলার কথা মানুষের মুখে মুখে ফিরত। লুতু ও বাকুর মতো দেশে হাজারও খেলোয়াড়-সংগঠক-ক্রীড়া সাংবাদিক একাত্তরে খানসেনা ও রাজাকারদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ দিয়েছিল। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকলেও তাদের নিয়ে লেখা হয়নি কোন ইতিহাস। প্রকাশিত হয়নি কোন বই বা স্মরণিকা। তাদের নামের তালিকাটা পর্যন্ত নেই। কালের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে তাদের নাম। অনেকের হারিয়ে গেছেনও। হতে পারে এটা আমাদেরই অজ্ঞতার কারণে। আমরা আমাদের সূর্যসন্তানদের যোগ্য মূল্যায়ন করতে পারিনি। এটা নিঃসন্দেহে আমাদের একটি বড় ব্যর্থতা। আগেই বলেছি, সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এতদিন যা আমরা করতে পারিনি সেটা করার সুযোগ এখনও আছে। আর তার জন্য চাই উদ্যোগ। এখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার ক্ষমতায়। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অনেক কাজ হচ্ছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সব শহীদের একটা তালিকা এ সরকারের কাছ থেকে আমরা আশা করতেই পারি। তালিকা করার পর তাদের কর্মকা-কে তুলে ধরার, তাদের যোগ্য মূল্যায়ন করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। তাতে করে সমগ্র জাতি আমাদের সেই সব ক্রীড়াবীরদের কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করতে পারবে।

লেখক : ক্রীড়ালেখক, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সংগঠক

ব-সধরষ : ংুবফসধুযধৎঁষঢ়ধৎাবু@মসধরষ.পড়স