২১ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

দ্বিধাহীন চিত্তের সেই দেশপ্রেমিক আবদুর রাজ্জাক


ইতিহাসের খেরো খাতায় জ্বলজ্বল করছে আবদুর রাজ্জাকের নাম। তিনি দেশমাতার সেই সূর্য সন্তান, যিনি নিজ জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞানে দেশের স্বাধীনতার জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছেন নির্দ্বিধায়। দেশের তরে নিরলস সংগ্রামের এক মূর্ত প্রতীক তিনি। আবদুর রাজ্জাক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত এমনই একজন লড়াকু সৈনিক যিনি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে দেশের আপামর জনসাধারণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবে কাজ করে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, এমনকি ব্যক্তিক জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে কখনই বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্লোভ, সৎ, ত্যাগী, সাহসী, স্বাধীনতা ও মুক্তিকামী এবং সফল রাজনীতিবিদদের নামের উচ্চারণকালে ভেসে ওঠে তাঁর নাম।

মনে পড়ে সেই ১৯৬৮ সালের কথা। ঐ বছরই প্রথম তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি তখন সরকারী রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র। ঢোলা পাঞ্জাবি-পায়জামা আর স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরিহিত সেই সময়ের দোর্দ- প্রতাপশালী নেতা আবদুর রাজ্জাককে দেখে মনে হয়েছিল যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক সন্ত। সারাজীবন তাঁকে সেই সন্তরূপেই দেখে এসেছি। ঐদিন তিনি আমাকে যেভাবে বুকে টেনে নিয়েছিলেন, তাতে আমি বিস্মিতই কেবল হইনি, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম তাঁর কর্মী হয়ে দেশের তরে কাজ করার। যে কোন কর্মীর জন্যই এই ভালবাসা অনুপ্রেরণার। কখনও শিশুর মতো, কখনও পিতার মতো, কখনও ভ্রাতা, কখনওবা বন্ধুর মতো তিনি ছিলেন আমাদের অনুপ্রেরণা দাতা হয়ে।

কোন একক বিশেষণে তাঁকে ভূষিত করা যায় না। দেশপ্রেমে, পরিশ্রমে, রুচিবোধে, সততা, নিষ্ঠা, জ্ঞানে ও প্রজ্ঞায়, সৌজন্যে এবং উদারতায় আবদুর রাজ্জাক এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। পরিশ্রম এবং আত্মত্যাগের ব্রত ছিল জীবনভর। শোষিত, বঞ্চিত মানুষের সুখÑদুঃখ, কল্যাণ এবং মঙ্গলে থেকেছেন পাশে পাশে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে থেকেছেন, সাধারণের ভাগ্য পরিবর্তনের কথা ভেবে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, সামরিক জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে একাগ্রচিত্তে লড়াই করেছেন। আবদুর রাজ্জাকের পুরো জীবনটাই কেটেছে সংগ্রামে-আন্দোলনে, কারাগারে, স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং দেশ গড়ার মহান ব্রতে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন। তাই তো বঙ্গবন্ধু একবার এক বিদেশী সাংবাদিককে বলেছিলেন, অনফঁৎ জধুুধশ রং সু ড়িৎশবৎ. ঐব রং ড়িৎশরহম ষরশব ফবারষ. এখানে বঙ্গবন্ধু আবদুর রাজ্জাকের নিরলস শ্রমকে ইঙ্গিত করেছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তিন-চারজন সংগঠকের মধ্যে আবদুর রাজ্জাক অন্যতম। শুধু স্বাধীনতাউত্তর কিংবা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়েই নয়, তিনি স্বাধীনতাপরবর্তী সময়েও ছিলেন একজন সফল সংগঠক। যে আদর্শ নিয়ে স্বাধীন দেশে পথচলা শুরু করেছেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার যে শপথ নিয়েছিলেন, সেই পথে তিনি সংগঠিত করেছিলেন সাংগঠনিকভাবে দলকে। দীর্ঘ কয়েক যুগে যারা আওয়ামী লীগের কর্মী তাদের অধিকাংশই আবদুর রাজ্জাকের হাত ধরে এসেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালোরাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলে তিনি আওয়ামী লীগকে সংগঠিত করতে নিরলস কাজ করে গেছেন। ১৫ আগস্ট পরবর্তী টানা ২৭ মাস তাঁকে জেলে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। কারাগারে থেকেই তিনি দল চালাতেন।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলতে পঁচাত্তরপরবর্তী সময়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছিল। দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য দেশে-বিদেশে অনেক চক্রান্ত হয়েছিল। এখনও হচ্ছে। এই যেমন দিন দুয়েক আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া শহীদদের নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এটা এমন একটা সময়ে তিনি এই মন্তব্য করেছেন, যখন আমরা পাকিস্তানীদের সঙ্গে সর্ম্পকচ্ছেদ করার কথা ভাবছি। তার এই মন্তব্য যে পাকিস্তানীদের খুশি করার জন্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে বসে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। মাতা-পুত্র যে পাকিস্তানী ভাবধারায় বিশ্বাসী এগুলোই তার প্রমাণ। এজন্য তারা নানা সময়ে দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করে আসছেন। এসব দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন আবদুর রাজ্জাক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখার জন্য মাঠ, রাজপথ দখল করে রেখেছিলেন আবদুর রাজ্জাক। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে মৌলবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও যাবতীয় প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন তিনি। নব্বই দশকের শুরুতে শহীদ-জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য আবদুর রাজ্জাক পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। তাঁর অনেক আকাক্সক্ষা ছিল তিনি এদেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাবেন। এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেই সময়কার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, মুজাহিদ, সাকা চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। যাবজ্জীবন দ-প্রাপ্ত গোলাম আযম জেলখানাতেই মারা গেছে। সাঈদীকে আজীবন থাকতে হবে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। সামনে নিজামীর রায়। এছাড়া অন্যসব রাজাকার, আলবদর, আলশামসের বিচার চলছে। তিনি তা দেখে যেতে পারেননি; কিন্তু তাঁর আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন আজ এদেশে হচ্ছে।

ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা আবদুর রাজ্জাক। ১৯৬২ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তিনি স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তার আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সহ-সম্পাদক ছিলেন। শিক্ষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে জারি হয়েছিল হুলিয়া। ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৫ সালের একাংশ পর্যন্ত ছিলেন জেলে। ১৯৬৩ হতে ৬৫ পর্যন্ত ছিলেন ছাত্রলীগের যুগ্ম-সম্পাদক। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে সারাদেশে জনপ্রিয় করতে সীমাহীন পরিশ্রম করেছিলেন। এজন্য তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুসহ আবদুর রাজ্জাককে মুক্ত করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। অসম্ভব মেধাবী ও নেতাকর্মীদের কাছে জনপ্রিয় এই নেতা দু’বার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যমত এই সংগঠক বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন ও ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রয়েছে তাঁর। ওই সময় গঠিত মুজিব বাহিনীর একজন সংগঠক ও রূপকারও ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মেঘালয়ে মুজিব বাহিনীর সেক্টর কমান্ডারের (মুজিব বাহিনীর চার সেক্টর কমান্ডারের একজন) দায়িত্ব পালন করেছেন। দেরাদুনে ভারতের সেনাবাহিনীর জেনারেল উবানের কাছে প্রশিক্ষণ নেয়া এই বীর যোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা প্রশিক্ষকও ছিলেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণেই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। সেই দায়িত্ব আবদুর রাজ্জাক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন অর্থাৎ শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করার ডাক দেন, তখন সেই ডাকে সারা দিয়ে আবদুর রাজ্জাক সারাদেশে বাকশালকে সংগঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।

অসম্ভব সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। পঁচাত্তরে কারাগার জীবনেও ছিলেন সংগঠনকে সংগঠিত করার প্রক্রিয়ায় সচল। ১৯৭৭ সালের শেষ দিকে জেল থেকে বেরুনোর পর দলকে সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। তখন তিনি অসুস্থপ্রায়। পিজি হাসপাতালে ছিলেন চিকিৎসাধীন। আর সে সময় সান্নিধ্য পাবার এবং অন্তরঙ্গ হবার সুযোগ ঘটে। এ সময় তিনি বিপর্যস্ত ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার পরিকল্পনা নেন। সে অনুযায়ী সম্মেলন হয়। সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবার পর তাঁরই নির্দেশনায় সারাদেশে ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার কাজে ব্যাপৃত হই। সে সময় সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান ছাত্রনেতাদের প্রলোভিত করে তার দলে ভেড়াতে সক্রিয় ছিলেন।

১৯৪২ সালের ১ আগস্ট শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রাজ্জাক। তবে তিনি শরীয়তপুরের গ-ির মধ্যেই নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেননি। জাতীয় নেতা হিসেবে সারাদেশের মানুষের জন্যই কাজ করে গেছেন। দেশের জন্য, সংগঠনের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতে করতে একটা সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন আবদুর রাজ্জাক। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন তিনি। লন্ডনের একটি নয়, দুটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘ কয়েকমাস। চিকিৎসায় অর্থাভাব দেখা দিলে তাঁর বন্ধুরা মিলে তার সংস্থান করেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে লন্ডনের কিংস কলেজ হাসপাতাল থেকে তাঁর সঙ্গে আমার প্রায়শই টেলিফোনে আলাপ হতো। দেশ, জাতি, রাজনীতি নিয়ে তাঁর ভাবনার কথা বলতেন। যেদিন তিনি জানতে পারলেন অপারেশন করার মতো শারীরিক অবস্থাও তার নেই, সেদিন তিনি পুরো ভেঙ্গে পড়েছিলেন। লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

সেই দিনটি ছিল শুক্রবার, ২৩ ডিসেম্বর। ঢাকায় খবর পৌঁছার সঙ্গে সঙ্গেই ভেঙ্গে পড়ি শোকে। কষ্টে বুক ভেঙ্গে যাচ্ছিল। বটবৃক্ষের মতো স্নেহ, ছায়া, মমতা এবং জীবন চলার দিক নির্দেশনাদাতা আর নেইÑ এমনটা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছিল। আজ রাজ্জাক ভাই নেই; কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর আদর্শ। মৃত্যু তাঁকে নিয়ে গেছেÑ কিন্তু তরুণ প্রজন্মের জন্য রেখে গেছে, মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমে চেতনায় বলীয়ান হওয়ার শক্তি।

লেখক : সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সাবেক সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ