২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

পৌর নির্বাচনে বিএনপির সেনা মোতায়েন দাবি- ইসির প্রত্যাখ্যান


স্টাফ রিপোর্টার ॥ শেষ মুহূর্তে পৌর নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছে বিএনপি। মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে সেনা মোতায়েনের দাবি জানায়। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে পৌর নির্বাচনে লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হলে সেনা মোতায়েনের বিকল্প নেই। বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে সেনা ছাড়া লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে না। কাজেই সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই সেনা মোতায়েনের দাবি করা হয়েছে। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ বিএনপির এ দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনও সেনা মোতায়েনের মতো কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বরও তিনি আইনশৃঙ্খল বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকেও সেনা মোতায়েনের দাবি নাকচ করে দেন।

এর আগে গত সোমবার বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা দল আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো দলের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেন। তিনি বলেন, পৌর নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সেনাবাহিনীর কোন বিকল্প নেই। এর একদিন পরেই বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি জানাল। গত ২৪ নবেম্বর সারাদেশে ২৩৪ পৌর সভার নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ। তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিকবার নির্বাচন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাত করা হলেও একবারও সেনাবাহিনী মোতায়েনে দাবি জানায়নি। এমনকি প্রথম থেকেই বিএনপির সেনা মোতায়েনের দাবি ছিল অনেকটা অস্পষ্ট। কিন্তু গত সোমবার খালেদা জিয়া সেনাবাহিনীর দাবি জানানোর পর মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিক সেনাবাহিনীর মোতায়েনের প্রস্তাব দেয়া হয়। যদি এর আগে একমাত্র এনপিপি ছাড়া অন্য কোন দলের পক্ষ থেকে সেনা মোতায়েনের কোন দাবি ওঠেনি।

তবে পৌর নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি এর আগেই নাকচ করে দেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। গত ১৯ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন পৌর এলাকায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, সারাদেশে পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকুলে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ অবস্থায় ইসির সেনাবাহিনী মোতায়েনের কোন পরিকল্পনা নেই। সেনাবাহিনী ছাড়া পৌর নির্বাচন অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। মঙ্গলবার বিএনপির সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আবারও সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি নাকচ করে দেন।

মঙ্গলবার বেলা চারটায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে নির্বাচন সুষ্ঠু করতে সেনা মোতায়েনের দাবি করেন। এ সময় প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আব্দুল হালিম, ক্যাপ্টেন সুজা উদ্দিন, সাবেক সচিব ইসমাইল জবিউল্লাহ, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন ও যুবদলের সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল।

প্রায় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের আব্দুল মঈন খান বলেন, সারা দেশে পৌর নির্বাচন নিয়ে মারামারি-হানাহানি হচ্ছে। বিএনপির প্রার্থীদের নাজেহাল করা হচ্ছে। এসব আক্রমণ সরকারী দলের প্রার্থীদের পক্ষ থেকেই করা হচ্ছে। এ কারণে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে সেনা মোতায়েনের বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে তাতে আমরা উদ্বিগ্ন। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কা আছে। আর তাই সেনা মোতায়েন করতে হবে। ইসি ইচ্ছে করলে সেনা নামাতে পারে। তারা যে সিদ্ধান্ত নেয় ইসি, সরকার তাতে সহায়তা দেয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থেই সেনা নামানোর দাবি আমাদের উল্লেখ করেন।

বিএনপির সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রস্তাবে সিইসি আইনগত বিষয় দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে তাদের জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের নেতাকর্মীদের হামলা করা হচ্ছে। এমন অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে ভয়ে কেউ ভোট দিতে যাবেন না উল্লেখ করেন।

এদিকে মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে কার্যালয় থেকে বের হয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন সাংবাদিকদের বিএনপি সেনা মোতায়েনের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেন, এখনও সেনাবাহিনী মোতায়েনের মতো কোন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। সেনা মোতায়েনের বিষয়ে এতো আগে কিছু বলা যাবে না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব। তিনি বলেন, আশাকরি পৌর নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠানে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আইন মোতাবেক সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। সবাইকে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক গুণগতমান উন্নত হবে। নির্বাচনে সব প্রার্থী সমান সুযোগ পাচ্ছেন না বিএনপির এমন অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সিইসি বলেন, কিছু কিছু রিপোর্ট আমরাও পাচ্ছি। আমরা কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি এ্যাকশনে যাচ্ছি। হাজার টাকা জরিমানা হচ্ছে। জরিমানার ক্ষেত্রে দল দেখা হচ্ছে না। সবাইকে সমানভাবে জরিমানা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতে নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে গত ৮ ডিসেম্বরও মঈন খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। সাক্ষাত শেষে মঈন খান সাংবাদিকদের জানান, অবাধ সুষ্ঠু ও নিরেপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। সেখানে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিএনপির দাবির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মঈন খান বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু করতে হবে। কিভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে তা কমিশনের বিষয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপির মুখ্য দাবি নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অবাধ হতে হবে। জনগণ যাতে নির্বিঘেœ ভোট দিতে পারেন সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনকে আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে এসে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করেন।

সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ ॥ এবার পৌর নির্বাচনে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে বিধিনিষেধ আরোপ করল নির্বাচন কমিশন। এতে উল্লেখ করা হয়েছে প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি ছাড়া কোন সাংবাদিক ভোট কক্ষে প্রবেশ করতে পারবে না। যদিও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ এর আগে গত ১৯ ডিসেম্বর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বৈঠক শেষে বলেন, সাংবাদিকরা আগে যেভাবে কাজ করেছেন এ নির্বাচনেও সেভাইে দায়িত্ব পালন করবেন। কারণ সাংবাদিক সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে দ্রুত ব্যবস্থ নেয়া সম্ভব হয়। কিন্তু ইসির পক্ষ থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে তাতে সিইসির বক্তব্যের কোন প্রতিফলন নেই। সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত ইসির জনসংযোগ শাখার পরিচালক আসাদুজাজ্জান স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনা ইতোমধ্যে সব পৌরসভার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো হয়েছে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে এতে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার অনুমতি ছাড়া ভোট কক্ষে প্রবেশ না করা ছাড়াও ভোটকেন্দ্রে পাঁচ জনের বেশি সাংবাদিক প্রবেশ করতে পারবে না। ১০ মিনিটের বেশি অবস্থান করা যাবে না, ভোটকক্ষে নির্বাচনী কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা যাবে। সাংবাদিক কার্ডের উল্টোপিঠে লিখিত নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।

এছাড়াও রয়েছে সাংবাদিকরা কোন প্রকার নির্বাচনী উপকরণ স্পর্শ বা অপসারণ করা থেকে বিরত থাকবেন, ভোটে প্রার্থী বা কোন রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে যে কোন ধরনের কর্মকা- থেকে বিরত থাকবেন, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবেন না এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তার জন্যে সংবিধান, নির্বাচনী আইন ও বিধিবিধান মেনে চলবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনে ইসির এ ধরনের বিধিনিষেধ স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে বাধার সৃষ্টি করবে। ইসির এসব নির্দেশনার সমালোচনা করছেন খোদ সংস্থাটির কর্মকর্তারাই। তাদের মতে, প্রথম নির্দেশনার জন্য ভোটকক্ষের ভেতরের কোন বিশৃঙ্খলার খবর পরিবেশনে অসুবিধা হবে। এক্ষেত্রে অনুমতি পেতে বিলম্ব হলে প্রকৃত ঘটনা জানাতে পারবে না গণমাধ্যম।

এর আগে গত শনিবার অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় ভোটের সংবাদ প্রচারে কড়াকড়ি আরোপের প্রস্তাব করা হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কিছু ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে গিয়ে পুলিশ সদস্য ও প্রার্থীর লোকজনের হাতে নাজেহাল ও হয়রানির শিকার হন কয়েকজন সাংবাদিক। ওই ভোটে ব্যালটে সিল মারাসহ নানা অনিয়মের ঘটনা গণমাধ্যমে আসে। গোলযোগ ও অনিয়মের কারণে কেন্দ্রে ভোট বন্ধ করে দিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটে সাংবাদিকদের বাধা ও নাজেহালের ঘটনায় ইসির তদন্ত কমিটি শেষ পর্যন্ত কাউকে চিহ্নিত করতে পারেনি। তবে সাংবাদিকদের এ নির্দেশনার বিষয়ে ইসির জনসংযোগ শাখার পরিচালক এসএম আসাদুজ্জামান বলেন, কোন কড়াকড়ি নেই সাংবাদিকদের দয়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। কমিশনের পক্ষ থেকে আগের নির্দেশনাগুলোই অনুসরণের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: