১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম


কাওসার রহমান ॥ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এলেও দেশে দাম কমানোর কোন সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন বিদ্যুত ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরীও একই অভিমত দিয়েছেন। তিনি অবশ্য ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপাতত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সম্ভাবনা না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য অব্যাহতভাবে হ্রাস পেলে তখন তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

তবে গ্যাসের ওপর চাপ কমাতে পেট্রোল ও অকটেনের দাম কমানো যেতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশ্লেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনতে হলে জ্বালানি তেলের দাম কমানো উচিত। এতে সুদের হার কমে দেশে বিনিয়োগ বাড়বে।

বিশ্ববাজারে গত দেড় বছর ক্রমান্বয়ে কমেছে জ্বালানি তেলের দাম। ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে প্রতি ব্যারেল অশোধিত তেলের দাম নেমে এসেছে ৩০ ডলারের কাছাকাছি। যা গত ১১ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। বড়দিনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরও ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ব্যারেল প্রতি ৩৬ ডলার ১৭ সেন্ট। কিন্তু এর প্রভাব নেই দেশের বাজারে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাম কমানোর আহ্বানও জানানো হলেও কাজ হয়নি। এ নিয়ে সরকারের মধ্যও রয়েছে পক্ষে বিপক্ষের নানা যুক্তি। কয়েক মাস আগে দাম কমানোর কথা বলেছিলেন অর্থমন্ত্রীও। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা -আইএমএফের চাপের কারণে সরকারও জ্বালানি তেলের দাম কমাতে পারছে না। ফলে দেশের মানুষ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সুফল পাচ্ছে না। বরং দেশবাসীকে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের উচ্চ মূল্যের চরম মাশুল দিতে হচ্ছে।

বাংলাদশে পেট্রোলয়িাম কর্পোরশেন (বিপিসি) সর্বশেষ ৩০ হাজার টন ডিজেলের জন্য এক কোটি ৪৫ হাজার ডলার বিল পরিশোধ করে। কেনার দাম হিসেবে প্রতিলিটার ডিজেলের দাম পড়েছে ৩২ টাকার মতো। সরকার সস্তায় তেল কিনলেও এখনই বিক্রয়মূল্য কমাতে চায় না এমনটাই জানান, বিদ্যুত ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

ডিজেলের দাম কমালে ভোক্তা সরাসরি এর উপকারভোগী হয় না, তাই ডিজেলের পরিবর্তে পেট্রোল-অকটেনের দাম কমানো যেতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বিশ্ববাজারে তেলের দাম নিম্নমুখী। তবে দেশের বাজারে এর কোন প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দামের সমন্বয় করতে দেশের বাজারে এ পণ্যের দাম কমানো প্রয়োজন।

তিনি বলেন, দেশে বিনোয়োগ বৃদ্ধি করতে বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় প্রয়োজন। বর্তমানে দেশে মূদ্রাস্ফীতির হার ৬ শতাংশ। পেট্রোলোর দাম কমালে তা ৫ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আর মুদ্রাস্ফীতি কমলে ঋণের সুদের হার হ্রাস পাবে। এতে দেশে বৃদ্ধি পাবে বিনোয়োগ।

অবশ্য জ্বালানি তেলের দামের বর্তমান পরিস্থিতির সুফল পাচ্ছে বিপিসি। গত অর্থবছরে তাদের মুনাফা হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে লাভ হয়েছে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।

বিশ্লেষকরা জ্বালানি তেলের দাম হ্রাস করার তাগিদ জানালেও তা আবারও নাকচ করে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী। তিনি বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে বাস ভাড়া বাড়ে, কিন্তু দাম কমলে ভাড়া হ্রাস পাবে কিনা এমন কোন সম্ভাবনা নেই। এছাড়া বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ২৪ হাজার কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। তাই জ্বালানি তেলের দাম কমার পরিবর্তে সাম্যাবস্থা অর্জন এখন আমাদের মূল লক্ষ্য।

এদিকে, বড়দিনের কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আরও ২ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ব্যারেল প্রতি ৩৬ ডলার ১৭ সেন্ট। এবার ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়ের চেয়েও কমে গেল জ্বালানি তেলের দাম। ডলারের শক্তিশালী মান এবং সুদের হার বাড়ানোয় এ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। জ্বালানি তেলের দাম আশঙ্কাজনক হারে কমলেও জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন-ওপেক তেলের উত্তোলন কমানোর বিপক্ষে। বর্তমানে ওপেক থেকে দৈনিক ৩ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল উত্তোলন হয়।

রাশিয়া উত্তোলন করে ১ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল। এ অবস্থায় ইরানের প্রত্যাশা, জ্বালানি তেল রফতানির ওপর তেহরান থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় ২০১৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম স্থিতিশীল পর্যায়ে আসবে।

জানা যায়, অতিরিক্ত উত্তোলন ও সরবরাহের অজুহাতে ২০১৪ সালের জুলাই থেকে এখনও পর্যন্ত দরপতনের মুখে রয়েছে বিশ্বের জ্বালানির বাজার। চলতি বছরের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ব্যারেল প্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৫০ থেকে ৭০ ডলারের মধ্যে থাকলেও নবেম্বরে তা নেমে সর্বনিম্ন ৩৭ ডলারে পৌঁছেছে। বিশ্ব প্রবৃদ্ধিতে জ্বালানি তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় দুই বছর ধরেই আলোচনার শীর্ষে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার।

ইউক্রেন-রাশিয়া দ্বন্দ্বের পর রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর গেল বছর জুলাই থেকে হঠাৎ করেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে থাকে। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ১১৬ ডলার থেকে কমে দাঁড়ায় ৮০ ডলারে। এরপর ২০১৫ সালের পুরোটাই জ্বালানি তেলের দাম ৭০ থেকে ৫০ ডলারের মধ্যে ওঠা-নামা করতে থাকে। এ ধারা অব্যাহত থাকে অক্টোবর পর্যন্ত।

এরপর চলতি বছরের নবেম্বরেই জ্বালানি তেলের দাম ৪০ এর ঘরে নেমে আসে। আর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দরপতনের মুখে পড়ে জ্বালানি তেল। দাম কমে দাঁড়ায় ব্যারেল প্রতি ৩৭ ডলার ৬৫ সেন্টে। জ্বালানি তেলের দাম কমার ইতিবাচক প্রভাব ভোগ্যপণ্যের বাজারে পড়লেও দিনের পর দিন মোটা অঙ্কের লোকসান গুণতে থাকে জ্বালানি তেল উত্তোলক ও রফতানিকারক দেশগুলো এবং জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলো।

জ্বালানির দরপতনের কারণে বছরজুড়েই নিম্নমুখী প্রবৃদ্ধির ধারায় রাশিয়া, সৌদি আরব, ইরান, ইরাকসহ তেল রফতানিকারক দেশগুলো। বাধ্য হয়ে খরচ কমাতে সারাবছরই কর্মী ছাঁটাই করে কোন কোন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ক্রমাগত লোকসান গুণলেও সৌদি আরবের একচেটিয়া সিদ্ধান্তের কারণে দফায় দফায় বৈঠক করেও উৎপাদন কমাতে একমত হতে পারেনি ওপেক এবং গাল্ফভুক্ত দেশগুলো। ভিয়েনার বৈঠকে উত্তোলন কমানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার কথা থাকলেও তা সম্ভব হয়নি সৌদি আরবের ভেটোর জন্য। তাই ডিসেম্বরেও জ্বালানি তেলের উত্তোলন দৈনিক ৩১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ওপেক।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস, অতিরিক্ত সরবরাহ না কমালে জ্বালানি তেলের দাম আগামী বছরও কমবে। আর ২০২২ সাল নাগাদ তা নেমে আসতে পারে ৩০ ডলারে। যা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরোবিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এমন অবস্থায় বছর শেষে ওপেকের সিদ্ধান্ত, ফেব্রুয়ারির মধ্যে এ দাম নিয়ন্ত্রণে না আসলে জরুরী বৈঠকে বসবে ওপেক।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: