২০ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এ্যাসিড সন্ত্রাস কমলেও নির্মূল হচ্ছে না


আরাফাত মুন্না ॥ দেশে বর্তমানে এ্যাসিড সন্ত্রাসের প্রবণতা কমে এলেও নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতা, আসামি গ্রেফতার না হওয়া, ক্ষতিগ্রস্তকে আপস করতে বাধ্য করা, কঠিন শাস্তির উদাহরণ না থাকা এবং এ্যাসিড ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোর পর্যবেক্ষণের অভাবকেই এ্যাসিড সন্ত্রাস নির্মূল না হওয়ার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের (এএসএফ) তথ্যমতে, ২০০২ সালে যেখানে সারাদেশে এ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ৪৯৪টি, সেখানে ২০১৪ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৫৯টিতে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে এ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে ৫৩টি।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ্যাসিড অপরাধ মামলা মনিটরিং সেল এবং পুলিশ হেডকোয়ার্টারের এ্যাসিড অপরাধ মামলা মনিটরিং সেল সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত সারাদেশে এ্যাসিড সহিংসতায় মামলা হয়েছে এক হাজার ৯৮৭টি। এতে অভিযুক্তের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৪১৭ জন। এর মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ অর্থাৎ মাত্র ৬৫৪ জন গ্রেফতার হয়েছে আর বাকি ৮৮ শতাংশই পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

সূত্র জানায়, পুলিশ এক হাজার ২০০টি মামলায় অভিযোগপত্র এবং ৮০১টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। ৫৪০টি মামলায় এক হাজার ৮০৯ জন অভিযুক্ত খালাস পেয়েছে। অপরদিকে রায় হয়েছে ৭১৩টি মামলায় আর এতে সাজাপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা ৩২৫ জন। এতে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদ- পেয়েছেন ১৮৬ জন, যাবজ্জীবন কারাদ- পেয়েছেন ১১৭ জন এবং মৃত্যুদ- পাওয়া আসামির সংখ্যা মাত্র ১৪ জন। তবে এসব আসামির একটি মৃত্যুদ-ও কার্যকর হয়নি।

২০০২ সালে এ্যাসিড সহিংসতার ভয়াবহতা বৃদ্ধি পেলে এ্যাসিড অপরাধ দমন আইন ২০০২ এবং এ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ আইন ২০০২ প্রণীত হয়। বর্তমানে এ্যাসিড সন্ত্রাসের সব মামলার বিচারই হচ্ছে এই এ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে।

এ বিষয়ে এ্যাসিড সারভাইবারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ বলেন, সঠিক তথ্যপ্রমাণ না থাকায় অনেক সময় মামলা খারিজ হয়ে যাচ্ছে। যারা ক্ষতিগ্রস্ত এবং সাক্ষী তাদের সুরক্ষার যে জায়গাটা থাকা দরকার সেটা থাকছে না। তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্তরা অনেক সময় আপস করতে বাধ্য হয়। পেছনে অনেক কারণ থাকে। মামলার দীর্ঘসূত্রতাও বড় কারণ। যারা এই প্রক্রিয়ায় জড়িত তাদের সদিচ্ছার অভাবও দেখি। বারবার আমরা মামলাগুলোকে দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে নেয়ার দাবি তুলেছি। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ১২ বছরও লেগে যায় একটি মামলার নিষ্পত্তিতে।

এছাড়া পুলিশের গাফিলতি, তদন্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি করে কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশ থাকলে পুলিশি প্রতিবেদনটাও ঠিকমতো পায় না ভিকটিম। একইসঙ্গে যারা এসব এ্যাসিড ছোড়ে তারা অপেক্ষাকৃত ভিকটিমদের চেয়ে বেশি ক্ষমতাধর। তারাও অনেক সময় প্রশাসনকে প্রভাবিত করে বলে জানান সেলিনা আহমেদ। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদ- পাওয়া একটি দ-ও কার্যকর হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, শাস্তি কার্যকর না হওয়ার মানে অপরাধ এবং অপরাধীকে উৎসাহিত করা।

সেলিনা আহমেদ বলেন, দেশে এ্যাসিড সন্ত্রাস কমলেও যেখানে-সেখানে প্রকাশ্যে এসিড বিক্রির কারণে পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না। এ্যাসিড সন্ত্রাস রোধে এটি বন্ধ করতে হবে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার করে জনগণকে এ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সজাগ করতে হবে। সর্বোপরি মানুষের নৈতিকতার উন্নয়নই এ্যাসিড সন্ত্রাস বন্ধ করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার মহাসচিব এ্যাডভোকেট সিগমা হুদা বলেন, মোট ১২০ কার্যদিবসের মধ্যে এ মামলা শেষ করতে হবে। স্কুল, কলেজের ল্যাবরেটরি, চিকিৎসায়, ব্যাটারি তৈরিতে এ্যাসিড দরকার হয়। তাই এ্যাসিড বিক্রি বন্ধ করা যাবে না। তবে বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মনিটরিং করা যায়। যেমন- রেশন কার্ডের মতো যদি এ্যাসিড ব্যবহারকারীদের একটা কার্ড করা যায় তাহলে কিছুটা হলেও এর বিক্রয় মনিটরিং করা যায়। এ্যাসিড কেনা-বেচা নিয়ন্ত্রণে আইন রয়েছে কিন্তু সে আইনের কার্যকারিতা নেই।

ভিকটিমদের বিচার না পাওয়া প্রসঙ্গে সিগমা হুদা বলেন, এসব মামলায় সাক্ষী আসতে ভয় পায়। আমাদের উইটনেস প্রটেকশন এ্যাক্ট নেই। সাক্ষীদের যদি প্রটেকশন দিতে পারতাম তাহলে বিচার পাওয়া যেত। আবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অনেক সময় বদলি হয়ে যায়। আবার ফরেনসিক এক্সপার্ট যে তাকেও অনেক সময় আদালতে পাওয়া যায় না।

এ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের প্রচার ও যোগাযোগ বিভাগের কো-অর্ডিনেটর একে আজাদ বলেন, শাস্তির বিধান কঠোর হওয়ায় আইনটির অপব্যবহারও হয়েছে। বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে প্রতিপক্ষকে ফাঁসিয়ে জমি দখল নিতে নিজেরাই নিজের গায়ে এ্যাসিড ঢেলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এ্যাসিড সন্ত্রাসের ঘটনায় দায়ের করা মামলার ৩৮ শতাংশই জমিজমা ও টাকা-পয়সাকে কেন্দ্র করে বিরোধের ফলে দায়ের করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আদালতের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে ঢাকার এ্যাসিড অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ৪/১৪ মামলায় ২০১৩ সালের ২৫ জুলাই ঢাকার মোহাম্মদপুর থানায় জনৈক আনোয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করেন এ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার এক নারী। মামলায় বলা হয়, পূর্বশত্রুতার জের ধরে আসামি আনোয়ার ৭/৮ জন আসামির সহায়তায় ২১ জুলাই রাত ১০টায় রিক্সার গতিরোধ করে তার দিকে এ্যাসিড নিক্ষেপ করেন। এতে তার পিঠ পুড়ে যায়। বাদিনী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলে হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ডাক্তার ফারহানা জামান মতামত দেন, ‘মিক্সড কেমিক্যালে’ তার পিঠ পুড়ে গেছে। এ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের ডাক্তার তানভীরও একই ধরনের মতামত প্রদান করেন।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: