২৪ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট পূর্বের ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

সাগরে ধৃত ৩৫ পাকসেনা, উত্তম-মধ্যম প্রাণভিক্ষায় রক্ষা


সাগরে ধৃত ৩৫ পাকসেনা, উত্তম-মধ্যম প্রাণভিক্ষায় রক্ষা

শংকর লাল দাশ ॥ একাত্তরের ডিসেম্বর, শীতের সকাল। চারদিকে ঘন কুয়াশা। নীরব নিস্তব্ধ সাগরের জলরাশি। কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। এরই মাঝে ৩৫ পাকি সেনার একটি দল বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পাকিস্তান পালিয়ে যাচ্ছিল। সঙ্গে ছিল লুটপাটের মাল আর প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। কিন্তু অজেয় বাঙালীর বুদ্ধি আর সাহসিকতার কাছে হেরে যায় পাকি সেনারা। জেলে আর স্থানীয় লোকজন ধরে ফেলেন তাদের। উত্তম-মধ্যম দিয়ে তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। আত্মসমর্পণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন জানায় পাকি সেনারা।

এভাবেই বিজয় দিবসের আগে পটুয়াখালীর সাগরপাড়ে রচিত হয়েছিল অন্য রকমের ইতিহাস। এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে বিজয়ের আগে আরেক বিজয়। স্বাধীনতাকামী মানুষকেও এ ঘটনা উদীপ্ত করেছিল দারুণভাবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটি অসামান্য ঘটনা। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের এ ইতিহাস অনেকটা অজানাই রয়ে গেছে। সেই পাক সেনাদের তালিকাও হারিয়ে গেছে।

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই পাক সেনা ও তাদের সহযোগীদের দ্বারা অবরুদ্ধ সাগরকন্যা পটুয়াখালীর আকাশে-বাতাসে মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দুঃসাহসী আক্রমণে পাক সেনারা কোণঠাসা হতে শুরু করে। বরগুনাসহ বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাক সেনারা পটুয়াখালী শহরে জড়ো হতে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে ৮ ডিসেম্বর রাতে দু’টি লঞ্চ নিয়ে পাকসেনারা পটুয়াখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পটুয়াখালী শহরে পতন ঘটে পাক সেনাদের। যদিও পরদিন ৯ ডিসেম্বর সকালে ভারতীয় বিমান থেকে পটুয়াখালী শহরে বম্বিং করা হয়। এদিনই মুক্তিযোদ্ধারা পটুয়াখালীকে মুক্ত এলাকা ঘোষণা করেন। কিন্তু সকলের অগোচরে ৩৫ পাকসেনার একটি গ্রুপ রয়ে যায় জেলার অভ্যন্তরে। তারা কি কারণে পটুয়াখালী শহর থেকে ঢাকার উদ্দেশে পালিয়ে যায়নি বা কেন যেতে পারেনি, সে সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে তারা যে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পাকিস্তান পালিয়ে যেতে চাইছিল, তা তাদের পরবর্তী তৎপরতা দেখে সহজেই ধারণা করা যায়। পাকি সেনারা অস্ত্রের মুখে ‘এমএল বারকি’ নামে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চের দখল নেয় এবং প্রচুর তেল নিয়ে চালকদের কুয়াকাটার দিকে চালাতে বাধ্য করে। ১০ ডিসেম্বর সকালে লঞ্চটি কুয়াকাটার কাছে ধুলাশ্বার নামে জায়গায় পৌঁছে। এরপরই পাকি সেনারা লঞ্চের চালকদের সাগর পাড়ি দেয়ার নির্দেশ দেয়। লঞ্চচালক পাক সেনাদের হাবভাব বুঝতে পেরে কৌশল অবলম্বন করে। চালক লঞ্চটি সাগরের একটি ডুবোচরে উঠিয়ে দেয়। শীতের কুয়াশা উপেক্ষা করে বহু জেলে তখন সাগরে মাছ ধরছিল। লঞ্চের লোকজন জেলেদের দূর থেকে ইশারায় সবকিছু বোঝায়। সুযোগ বুঝে জেলেরা দ্রুত সংঘবদ্ধ হয়। জেলেদের একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে খবরটি পৌঁছে দেয়। তারাও সংঘবদ্ধ হন। নায়েক সুবেদার হাতেম আলী খাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গ্রুপ কলাপাড়ায় অবস্থায় করছিলেন। হাতেম আলী খাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা, জেলে ও এলাকাবাসী কয়েকটি জেলে নৌকা নিয়ে পাকি সেনাবাহী লঞ্চটি ঘিরে ফেলেন। পাকি সেনারা পালানোর সব পথ বন্ধ বুঝতে পেরে দ্রুত তাদের অস্ত্রশস্ত্র ও লুট করা মাল পানিতে ফেলে দেয়। দূর থেকেই হাতজোড় করে ক্ষমা চাইতে থাকে। সাহসী জেলেরা এক পর্যায়ে লঞ্চের দখল নেয় এবং পাকি সেনাদের উত্তম-মধ্যম দেয়। এ অভিযানে উপস্থিত ছিলেন বরগুনার মুক্তিযোদ্ধা বজলুর রশিদ দুলাল। তিনি জানান, পাকি সেনাদের কাছ থেকে তারা প্রচুর অস্ত্র উদ্ধার করেন। পাকি সেনাদের ধরে তীরে নিয়ে আসা হলে তারা আত্মসমর্পণ করে এবং জেলখানায় পাঠানোর জন্য কাকুতি মিনতি জানায়। এলাকাবাসী কিছুতেই পাকি সেনাদের ছাড় দিতে চাইছিল না। ট্রুপ কমান্ডার হাতেম আলী বিচারের আশ্বাস দিলে এলাকার লোকজন শান্ত হয়। পাকিসেনাদের কয়েকদিন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে আটক রাখা হয়। ২০ ডিসেম্বর তাদের পটুয়াখালী জেলখানায় পাঠানো হয়।

আটক সেনাদের মধ্যে দু’জন ছিল হাবিলদার, পাঁচজন ল্যান্স নায়েক, বাকিরা সিপাহী। হাবিলদার হাফিজ নুরুজ্জামান ও মোহাম্মদ ইউসুফ ছিল যথাক্রমে বেলুচ ও পাঞ্জাব ইউনিটের। ল্যান্স নায়েকরা হলো- ফজলে এলাহি, সোহরাব খান, আজিব হুসাইন, মুশতাক হুসাইন ও মোঃ খান। সিপাইরা হলো- মুসতাকের খান, সৈয়দ মোহাম্মদ, মুকসুদ হুসাইন শাহজি, ফতেহ মোহাম্মদ, আফজাল, নাইম আলম, রহমাত খান, সাহাবুদ্দিন, মোঃ বালুচ, মোঃ রিয়াজ, মিয়া মোহাম্মদ, সোহরাব জং, মোঃ হুসাইন, বকর হুসাইন, খাদেম হুসাইন, মোঃ আজিব, মোঃ ইউসুফ, গুলাম সরোয়ার, নাজির আহমেদ, মোঃ আসলাম, মোঃ আলী, সামানধর খান, মোঃ জোহা, আঃ আজিজ, নির খান, আল্লাদাদ খান, মোঃ সাদেক ও ইমতিয়াজ খান।

বিজয়ের আগে পটুয়াখালীর মুক্তিযোদ্ধাদের এ অর্জন সাগরপাড়ের মুক্তিকামী মানুষকে আরও সাহসী করে তোলে, অনুভব করেন মুক্তি আসন্ন। এর কয়েক দিনের মধ্যে অর্জিত হয় বাঙালীর শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতা।