১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

জাদুঘরে বন্যার কণ্ঠে এবার রবীন্দ্রনাথ স্মারক বক্তৃতা


জাদুঘরে বন্যার কণ্ঠে এবার রবীন্দ্রনাথ স্মারক বক্তৃতা

স্টাফ রিপোর্টার ॥ রবীন্দ্রসঙ্গীতের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তার সুরেলা কণ্ঠে পরিবেশিত রবীন্দ্রনাথের গান শুনে মুগ্ধ হন অগণন শ্রোতা। নন্দিত এই শিল্পী এবার গান শোনানোর পরিবর্তে অংশ নিলেন স্মারক বক্তৃতায়। শনিবার পৌষের সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মারক বক্তৃতা দিলেন এই শিল্পী। জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে পঞ্চমবারের মতো ‘কবিতা থেকে গান : নানা পর্বে’ শীর্ষক এ স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে বাঙালী সমগ্র জাদুঘর।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। রবীন্দ্র রচনাবলী থেকে পাঠ করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইকবাল বাহার চৌধুরী। সভাপতিত্ব করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

স্মারক বক্তৃতায় রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনবোধ, বিশ্ববোধ ও সৌন্দর্যবোধ তার সৃষ্টিকে দিয়েছে অনন্যতা। যাপিত জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, উদারনৈতিক বিশ্ববোধ ও নান্দনিক সৌন্দর্যবোধের সম্মিলন ঘটেছে তার কবিতায়। অবশ্যম্ভাবীভাবে কবিতা থেকে গানে সঞ্চারিত হয়েছে সেটা। বন্যা আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ সংহত ও সংযত সুরের প্রয়োগে গানের বাণী ও সুরের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। এই অসম্ভব সুন্দর সৃষ্টি কর্মটি কবিকে আনন্দের উপকরণ যুগিয়েছে সারা জীবন ধরে। তাই বহু কবিতাকে তিনি গানে রূপান্তর করেছেন কাব্যরচনার অনেক পরে। গানের ক্ষেত্রে বাণীবন্ধনের সীমানা থেকে তাকে বের করে এনেছেন সুরের সহযোগিতায়। কবিগুরুর কবিতা সম্পর্কে বন্যা বলেন, ৬৭ বছরের কবিজীবনে কবি যে অজস্র্র কবিতা লিখেছেন তা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারবাহিকভাবে বিচার করলে যে স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যের সন্ধান মেলে তাতে বিস্মিত হতে হয়। এ ধারাবাহিকতার মধ্যে যে গতিময়তা তাতে কখনও কবি নিজেকে অতিক্রম করে

যাওয়া তার পেছনে ভাষা, প্রকাশভঙ্গি, গঠনশৈলী তো বটেই কবির মানসিকতাও যথার্থভাবে অনুধাবন করা যায়।

প্রায় ৫০ মিনিটের এ বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রসঙ্গীতও গেয়ে শোনান বন্যা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন কবিতা থেকেও পাঠ করেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার এত সুরেলা স্মারক বক্তৃতার পর আর কোন কথা থাকে। অন্য যে কোন বক্তৃতা থেকে এটি ভিন্ন, কারণ এর মাঝে গান যেমন গীত হয়েছে, তেমনি কবিতা পাঠও ছিল। বন্যাকে ধন্যবাদ এ চমৎকার বক্তৃতার জন্য।

সৈয়দ শামসুল হক বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে এক বিস্ময়ের কবি। সাহিত্যের কোন জায়গায় তিনি নেই। গান, কবিতা, নাটক-সবক্ষেত্রেই তাঁর বিচরণ ঘটেছে। তাঁকে বিস্ময়ের কবি ছাড়া আর কোন উপাধি দেয়া সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সাল থেকে ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্মারক বক্তৃতা’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে বাঙালী সমগ্র জাদুঘর। ইতোপূর্বে এ স্মারক বক্তৃত্বা দিয়েছেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান, এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও সৈয়দ শামসুল হক।

নূহ-উল-আলম লেনিনের গ্রন্থের প্রকাশনা ॥ রবিবার বিকেলে বাংলা একাডেমির রবীন্দ্র চত্বরে একাডেমি থেকে প্রকাশিত ড. নূহ-উল-আলম লেনিনের বাঙালী সমাজ ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা এবং মৌলবাদ শীর্ষক গ্রন্থের প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও লেখক মোহাম্মদ জমির, ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুন এবং গবেষক ড. আফসার আহমদ। লেখকের অনুভূতি প্রকাশ করেন ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, দেশে মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদ থাকলেও তারা কখনই ক্ষমতায় যেতে পারবে না। এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তারও করতে পারবে না। কারণ, আমরা মৌলবাদকে ঘৃণা করি। এই সরকার মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদকে ধ্বংস করতে সদা তৎপর। তা ছাড়া বাংলাদেশের মৌলিক চরিত্রটি হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, নূহ-উল-আলম লেনিনের গবেষণাগ্রন্থ আমাদের সমাজে ও সাহিত্যে মৌলবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার উৎস অনুসন্ধানে যেমন সহায়ক হবে তেমনি আমাদের এই বার্তাও দেবে যেÑ আবহমানকাল ধরে আমরা এই দুই ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করে যেভাবে এগিয়ে গেছি ভবিষ্যতেও তেমনি একটি আধুনিক-ধর্মনিরপেক্ষ সময়ের দিকে এগিয়ে যাব। তিনি বলেন, মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাংলাদেশের প্রগতিবাদী অগ্রযাত্রায় সাময়িক বাধা সৃষ্টি করতে পারে বটে কিন্তু শেষ বিচারে অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশই বিজয়ীর পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে।

আলোচকবৃন্দ বলেন, নূহ-উল-আলম লেনিন রাজনীতিবিদের কঠিন দায়িত্বের পাশাপাশি মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে অনুপুঙ্খ গবেষণা করেছেন তা বিষয়র অভিনবত্বে, তথ্যের সমাহারে এক অনন্য সৃজনকর্মে পরিণত হয়েছে। তিনি নির্দিষ্ট সময় কাঠামোর পরিসর ছিন্ন করে প্রাচীনকাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত সামজ ও সাহিত্যে মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতার যে ব্যবচ্ছেদ করেছেন তা ভবিষ্যত গবেষকদের সহায়ক হবে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী জঙ্গীবাদী উত্থানের প্রেক্ষাপট বুঝতে এবং এ থেকে পরিত্রাণের উপায় অন্বেষণে বইটি আমাদের নতুন ভাবনার খোরাক যোগাবে।

লেখকের অনুভূতি প্রকাশ করে নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থটি প্রকাশের পর এর বিপুল সাড়ায় আমি অভিভূত। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদের মূলোৎপাটন হবে বলে আশা করা গিয়েছিল কিন্তু স্বাধীনতার পরও সাম্প্রদায়িক-মৌলবাদী গোষ্ঠী যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তা আমাকে আশঙ্কিত করেছে এবং এই ব্যাধির উৎস সন্ধানে আমি এই গবেষণা কাজটি সম্পন্ন করেছি।

সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, নূহ-উল-আলম লেনিনের বইতে গবেষণার পদ্ধতিগত কাঠামোয় বাঙালি সমাজে ও সাহিত্যে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার স্বরূপ অন্বেষার প্রয়াস চালানো হয়েছে। এ বইটি গবেষণার ক্ষেত্রে এবং মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী পথচলায় সহায়ক হতে পারে।

স্বাগত ভাষণে শামসুজ্জামান খান বলেন, সাম্প্রতিক প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে নূহ-উল-আলম লেনিনের গবেষণাগ্রন্থটি আমাদের গবেষণা ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তথ্যসমৃদ্ধ, বিশ্লেষণে ঋদ্ধ এই বই সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদমুক্ত যুক্তিবিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে বলে আশা করি। অনুষ্ঠানে উদ্বোধন সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী মকবুল হোসেন। প্রকাশনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ কমরেড অজয় রায়, জাতীয় জাদুঘর ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এম আজিজুর রহমান, জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি ড. মুহাম্মদ সামাদ, ড. সোনিয়া নিশাত আমিন, কবি অসীম সাহা, কবি জাহিদুল হক, কবি নাসির আহমেদ ও কবি তারিক সুজাত প্রমুখ।