১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও বেতন পাবেন নতুন স্কেলে


স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারী চাকরিজীবীদের মতো এমপিওভুক্ত বেসরকারী শিক্ষক ও কর্মচারীরাও নতুন স্কেলে বেতন পাবেন। পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত না করার প্রতিবাদে বেসরকারী স্কুল, কলেজ পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের অসন্তোষের মধ্যে রবিবার দাবি মেনে নিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পে স্কেলে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, অর্থমন্ত্রীসহ সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন শিক্ষকরা। এদিকে বেতন স্কেলে বৈষম্যের কারণে সরকারী কলেজ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সরকারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সঙ্কট সমাধানে রবিবার সাক্ষাত করে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা সচিবের সহায়তা কামনা করেছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ। তারা তুলে ধরেছেন বৈষম্যের চিত্রও।

রবিবার দুপুরেই শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে স্কেলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত ১ জুলাই থেকেই সরকারী চাকরিজীবীদের মতো ৫ মাসের বেতন বকেয়াসহ স্কেল পাবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা। এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করা হবে। সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আগামী জানুয়ারি মাস থেকেই নতুন স্কেলে বেতন পেতে শুরু করবেন। গত ১ জুলাই থেকেই বকেয়া বেতনও পাবেন। গত ১৫ ডিসেম্বর নতুন বেতন কাঠামোর ‘চাকরি (বেতন ও ভাতাদি) আদেশ, ২০১৫’ গেজেট জারি করে সরকার। নতুন কাঠামোতে সর্বোচ্চ বেতন (গ্রেড-১) ৭৮ হাজার টাকা ও সর্বনিম্ন (গ্রেড-২০) আট হাজার ২৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে গেজেটে প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিষয়ে কিছু বলা ছিল না। ফলে এ নিয়ে শিক্ষকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে শিক্ষক-সংগঠনগুলো। এমন অবস্থায় রবিবার শিক্ষামন্ত্রী জানান, নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৫ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠায় বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই চিঠি আমরা দেরিতে পেয়েছি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি হাতে পাওয়ার পরপরই এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বিলুপ্ত করায় সরকারী কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অসন্তোষের বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বিলুপ্ত হলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি কিংবা অন্য কোন পদ্ধতিতে সুযোগ-সুবিধা দেয়া যায় তা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। শিক্ষা পরিবারের কেউ যেন কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যের পর পরই শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশে বেতন কমিশন ও সচিব কমিটির সুপারিশের বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অনুদান সহায়তা নতুন বেতন-স্কেল বাস্তবায়নের তারিখ অর্থাৎ ১ জুলাই ২০১৫ তারিখ থেকে কার্যকর হবে। পে-স্কেলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করায় সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ)। সংগঠনের জাতীয় কার্যকরী সংসদের সভাপতি অধ্যাপক ড. আব্দুল মান্নান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু এক অভিনন্দন বার্তায় বেসরকারী শিক্ষক কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, শিক্ষাবান্ধব সরকারের প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান সরকার গত ৭ বছরে শিক্ষানীতি প্রণয়ন, সপ্তম জাতীয় বেতন স্কেলে বেসরকারী শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত, ২০% মহার্ঘ্যভাতা প্রদান, ২৬ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন প্রভৃতি কর্মকা- প্রমাণ করেছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার প্রকৃত অর্থেই শিক্ষাবান্ধব।

অষ্টম জাতীয় পে স্কেলে বেসরকারী শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে যে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়েছিল আশা করি তার অবসান হবে। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করায় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি। সমিতির সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম রনি এবং মহাসচিব মোঃ রিয়াজ উদ্দিন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দেরি করে হলেও শিক্ষক সমাজের অব্যাহত আন্দোলনের হুমকি ও দাবির প্রেক্ষিতে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বেসরকারী ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বহু প্রত্যাশিত জাতীয় পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করায় শিক্ষক সমাজে আনন্দের ছোঁয়া লেগেছে। শিক্ষক সমাজের বিশ্বাস-শিক্ষকরা আগামীতে আরও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তাদের কর্তব্য পালন করবেন। শিক্ষক নেতৃবৃন্দ বিবৃতিতে বলেন, জাতি গড়ার কারিগর শিক্ষক সমাজ সব সময়ই জাতীয় পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোন অশুভ চক্রের চক্রান্তের কারণে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার লক্ষ্যে একটি চক্র এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় পে স্কেলের আওতার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছিল। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও বিশ্ব চিন্তাবিদ জননেত্রী শেখ হাসিনা যথাসময়ে চক্রান্ত বুঝতে পেরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জাতীয় পে স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যুগোপযোগী কাজটি করেছেন। এজন্য শিক্ষক সমাজের পক্ষ থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

এদিকে বেতন স্কেলে বৈষ্যম্যের কারণে সরকারী কলেজ ও সংশ্লিষ্ট দফতরের সরকারী শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অসন্তোষ বাড়ছে। রবিবার সাক্ষাত করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শিক্ষা সচিব সোহরাব হোসেনের সহায়তা কামনা করেছেন বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির নেতৃবৃন্দ। আলাদা বেতন স্কেল নয়, বর্তমান বেতন কাঠামোতেই সকল স্তরে বেতন বৈষম্য নিরসন চান সরকারী কলেজের শিক্ষকরা। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য এ শিক্ষকরা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির মহাসচিব আই কে সেলিম উল্লাহ খোন্দকারের নেতৃত্বে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ সচিবালয়ের শিক্ষামন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে সাক্ষাত করে অবিলম্বে সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল পুনর্বহাল করে বৈষম্য নিরসনের দাবি জানিয়েছেন। বিসিএস সমিতির পক্ষে এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন সহ-সভাপতি ফজলে রাব্বী, কেন্দ্রীয় নেতা কুদ্দুস সিকদারসহ কেন্দ্রীয় কমিটির নেতারা।

শিক্ষক নেতারা শিক্ষক সমাজের দাবি পূরণে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেছেন। বিসিএস শিক্ষা সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পে স্কেলের অনেক ইতিবাচক দিক আছে। কিন্তু র্শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপক পদে বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবিকে বিবেচনায় না এনে অধ্যাপক পদের বেতন স্কেল ও গ্রেড অবনমন করা হয়েছে। সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল করে প্রভাষক, সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপকসহ শিক্ষা ক্যাডারের সকল স্তরের বেতন বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শিক্ষা ক্যাডারের ১৫ হাজার সদস্য এটি উপভোগ করতে পারছে না।

শিক্ষকরা তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে বলেছেন, এখনও বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পঞ্চম গ্রেড হতে পদোন্নতি পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হন। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপকরা পঞ্চম গ্রেড হতে চতুর্থ গ্রেডে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান, যা বৈষম্যমূলক। ৫০ শতাংশ অধ্যাপক সিলেকশন গ্রেড পেয়ে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হন। এ বৈষম্য নিরসনের দীর্ঘদিনের চেষ্টা, ১৯৮৪ সালের এনাম কমিশন, ১৯৮৭ সালের সচিব কমিটির সুপারিশ এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের চাকরি ও বেতন কমিশনের নিকট আবেদন সত্ত্বেও অধ্যাপকদের বেতন গ্রেড চতুর্থ গ্রেড হতে তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হয়নি। উল্টো সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বন্ধ করে দেয়ায় শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাগণ সর্বোচ্চ চতুর্থ গ্রেড হতে অবসরে যাবেন। অন্যদিকে পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় শিক্ষা ক্যাডারের অনেকেই সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অবসরে যান। সিলেকশন গ্রেড ও টাইমস্কেল না থাকায় এখন সহযোগী অধ্যাপকদের পঞ্চম গ্রেড হতে অবসরে যেতে হবে। প্রাপ্য মর্যাদায় উন্নীত না করে স্কেল ও পদ অবনমনে শিক্ষকরা মর্মাহত।

অন্যদিকে দুটি সুপার গ্রেডের ফলে বৈষম্য আরও তীব্রতর হয়েছে। তারা আশঙ্কা করছেন, পদ ও স্কেল অবনমনের মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ চতুর্থ গ্রেডে নির্দিষ্ট করে, শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন অধিদফতর ও শিক্ষা প্রকল্পের তৃতীয়, দ্বিতীয় ও প্রথম গ্রেডে অন্য ক্যাডার হতে পদায়ন করার সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। সাক্ষাতকালে শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাসচিব শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। শিক্ষক নেতারা জানান, পূর্ব ঘোষণা অনুসারে আগামীকাল মঙ্গলবার দুপুর ১টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করবে বিসিএস শিক্ষা সমিতি। যেখানে আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচী ঘোষণা করা হতে পারে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: