১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

নৌবাহিনীর মসজিদে হামলায় আটক ২ জনের জেরা চলছে


গাফফার খান চৌধুরী ॥ সুরক্ষিত ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে এক সেনা সদস্যকে ফিল্মি স্টাইলে দিন দুপুরে কুপিয়ে জখমের পর শুক্রবার পবিত্র জুমার নামাজ শেষে চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঘাঁটির ভেতর মসজিদে বোমা হামলার ঘটনায় সারা দুনিয়ায় রীতিমতো তোলপাড় চলছে। এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃত ২ জনের মধ্যে একজন নৌবাহিনীর ব্যাটম্যান। অপরজন নৌবাহিনীর লন টেনিসের কোর্টে বল কুড়িয়ে এনে দেয়ার সঙ্গে জড়িত। গ্রেফতারকৃতরা নৌবাহিনীর স্থায়ী সদস্য নন। তারা হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। এ ঘটনায় সন্দেহভাজন আরও ৫Ñ৬ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট না থাকায় ছেড়ে দেয়া হয়েছে। গ্রেফতারকৃতরা নৌবাহিনীতে ব্যাটম্যান হিসেবে কিভাবে এবং কাদের মাধ্যমে প্রবেশ করেছে এবং এ ধরনের আরও ব্যাটম্যান আছে কিনা সে বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে হরহামেশাই এমন ঘটনা ঘটলেও বাংলাদেশে কোন সময়ই এ ধরনের হামলা হয়নি। হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলের পর নৌবাহিনীর সুরক্ষিত মসজিদে বোমা হামলার ঘটনা সত্যিই নতুন করে ভাবনায় ফেলেছে। এটি পাকিস্তানী স্টাইল। বাংলাদেশেও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের আদলে হামলা হচ্ছে। এমন হামলার ঘটনা বাংলাদেশে ভয়াবহ জঙ্গীবাদ কড়া নাড়ছে কিনা সন্দেহ হচ্ছে সে বিষয়েও। শুধু বাহিনী নয় সরকারী বেসরকারী সব প্রতিষ্ঠানে ভেতরে ভেতরে জঙ্গীবাদ বিস্তার লাভ করেছে। দ্রুত সব বাহিনী এবং বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান থেকে জঙ্গীবাদের সঙ্গে জড়িতদের ছাঁকনি বের করে ফেলা প্রয়োজন। অন্যথা ভয়াবহ পরিণতির সৃষ্টি হতে পারে।

শুক্রবার জুমার নামাজের পর চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ঈশা খাঁ ঘাঁটির মসজিদে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। বিস্ফোরণে অন্তত ছয়জন আহত হন বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়। ঘটনাস্থল থেকে আরও কয়েকটি ককটেল উদ্ধার হয়। এ সময় একজনকে আটক করা হয় বলে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদফতর আইএসপিআর-এর তরফ থেকে জানানো হয়। তবে পুলিশ বলছে, মোট দুইজন আটক হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর পরই স্থানীয় মুসল্লিরা একজনকে আটক করে তাদের হাতে তুলে দেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটককৃত ব্যক্তি মিজানুর রহমান বলে দাবি করেন। তিনি নৌবাহিনীর ব্যাটম্যান। দীর্ঘ যাচাই-বাছাই শেষে আটককৃত নৌবাহিনীর ব্যাটম্যানের নাম মিজানুর রহমান নয়, রমজান আলী বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরবর্তীতে রমজান আলীর স্থায়ী অস্থায়ী ঠিকানাও জানা যায়। রমজান আলী ভূয়া শিক্ষাসনদ দেখিয়ে নৌবাহিনীতে চাকরি নিয়েছেন। তাকে জেরা চলছে। পরে আব্দুল মান্নান নামে আরও একজন আটক হয় বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট উর্ধতন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, রমজান আপাদমস্তক জঙ্গী তাতে কোন সন্দেহ নেই। জঙ্গী কার্যক্রম চালাতেই রমজান পরিকল্পিতভাবে নৌবাহিনীতে ভূয়া সনদ দেখিয়ে চাকরি নিতে পারে। আবার নৌবাহিনীর ভেতরে পরিকল্পিতভাবে জঙ্গীবাদী কার্যক্রম চালাতে দেশ-বিদেশের কোন জঙ্গীগোষ্ঠী রমজান আলীকে প্রবেশ করাতে পারে। এছাড়া রমজান আলী নৌবাহিনীতে প্রবেশ করার পর বাহিনীটির ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কোন জঙ্গীগোষ্ঠীর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এমন কাজ করতে পারে।

রমজান আলী কিভাবে এবং কি প্রক্রিয়ার মধ্যে চাকরি হয়েছে, পুরো প্রক্রিয়াটির সঙ্গে কারা কিভাবে জড়িত সেটি অনুসন্ধান করা জরুরী। হয়তো রমজান আলীর মতো অনেকেই জঙ্গীবাদী কার্যক্রম চালাতে বাহিনীটিতে অনুপ্রবেশ করে থাকতে পারে। নৌবাহিনীতে প্রবেশের পর বা যাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন তাদের মাধ্যমেও রমজান আলী জঙ্গীবাদী কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তাদের শনাক্ত করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আটক রমজান আলীর পিতার নাম আহসান হাবিব। তিনি স্থানীয় ছোট ভাদগা মসজিদের ইমাম। বাড়ি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার মুকুন্দপুর গ্রামে। রমজানের গ্রামের বাড়িতে কেউই নেই। কেউ কেউ বলছেন, পরিবারের সবাই পলাতক। আবার কেউ বলছেন, তারা বিভিন্ন আত্মীয় বাড়িতে শীতের পিঠার দাওয়াত খেতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন।

স্থানীয়রা বলছেন, নৌবাহিনীতে ব্যাটম্যানের চাকরি নিলেও এতদিন গ্রামের সবাই জানতেন রমজান ঢাকায় গার্মেন্টসে চাকরি করেন। দেড় বছর পর কোরবানির ঈদে বাড়ি গিয়েছিলেন। রমজানদের পরিবারের সদস্য অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। রমজান গ্রামের মানুষের সঙ্গে তেমন মিশতেন না।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল মান্নান নামে আটককৃত অপরজনের বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার বাসাইল উপজেলায়। দুইজনের বিষয়েই র‌্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দাগুলো খোঁজ খবর নিচ্ছে। অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

একজন উর্ধতন গোয়েন্দা কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত দুইজনই নৌবাহিনীর ব্যাটম্যান। তারা মূলত লন টেনিসের বল কুড়িয়ে সংরক্ষণ করা এবং তা যথাসময়ে খেলোয়াড়দের দিতেন। এটিই তাদের কাজ। তারা ব্যাটম্যান হওয়ার সুবাদে নৌবাহিনীর কর্মকর্তাদের লন টেনিসের কোর্টের সুরক্ষিত জায়গায় যাতায়াত করতেন। সেই সুবাদে নৌবাহিনীর অনেক উর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তাদের যোগাযোগ বা ভাল সর্ম্পক ছিল। গ্রেফতারকৃতরা ব্যাট হিসেবে প্রবেশের পর জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়েছে কিনা বা নৌবাহিনীতে ঘাপটি মেরে থাকা কোন জঙ্গীগোষ্ঠীর প্ররোচনায় জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়েছে কিনা সে বিষয়ে বিস্তর জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। গ্রেফতারকৃতরা সরাসরি হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। নৌবাহিনীতে জঙ্গীবাদে উদ্বুদ্ধকারী এবং আরও জঙ্গী সদস্য আছে কিনা সে বিষয়ে গভীর তদন্ত চলছে।

এ ব্যাপারে র‌্যাবের লিগ্যাল এ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের কর্মকর্তা উইং কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জনকণ্ঠকে বলেন, আরও হামলাকারী ছিল কিনা সে বিষয়ে তদন্ত চলছে। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

র‌্যাবের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জনকণ্ঠকে বলেন, ঘটনার বিষয়ে গভীর অনুসন্ধান চলছে। অনেককেই জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আটককৃত দুইজন জড়িত বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।

নৌবাহিনীর মসজিদে বোমা হামলার আগে গত ২২ অক্টোবর গাবতলীতে পুলিশ চেকপোস্টে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি প্রকাশ পুলিশ কর্মকর্তা ইব্রাহিম মোল্লাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এরপর দিন দিবাগত রাতে হোসেনী দালানে তাজিয়া মিছিলে হ্যান্ডগ্রেনেড হামলায় ২ জন নিহত ও দেড়শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর গত ১০ নবেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার ঢাকা সেনানিবাসের কচুক্ষেত এলাকায় কর্তব্যরত মিলিটারি পুলিশ সদস্য সামিদুল ইসলামকে শত শত মানুষের সামনে মানিক নামে একজন ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। মানিক রিক্সাচালক বলে প্রাথমিকভাবে প্রকাশ পেলেও সত্যি সত্যিই সে রিক্সাচালক কিনা তা আজও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছিলেন, মানিকের সবকিছু পর্যালোচনা করলে, তাকে রিক্সাচালক বলে কেউ বলবে না। দিন দুপুরে সুরক্ষিত জায়গায় এমন ঘটনার সঙ্গে জড়িত মানিক কোন জঙ্গী বা উগ্র মতাদর্র্শে বিশ্বাসী হতে পারে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিচালক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ জনকণ্ঠকে বলেন, হোসেনী দালানে বোমা হামলা ও সর্বশেষ নৌবাহিনীর মসজিদে বোমা হামলার ধরন অনেকটাই পাকিস্তানী আদলে হয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তান বা আফগানিস্তানে নেপথ্যে থেকে যারা এ ধরনের জঙ্গী হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে তারাই বাংলাদেশে এ ধরনের জঙ্গীবাদী তৎপরতা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি পাকিস্তানী এক নাগরিক গ্রেফতারের পর বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ বিস্তারে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা এবং ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাসের এক কর্মকর্তার নাম বেরিয়ে এসেছে। তাতে বিষয়টি দিবালোকের মতো স্পষ্ট, পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থার কিছু কিছু সদস্য বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ বিস্তারের সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি কার্যকরের পর পাকিস্তানের বিভিন্ন কথাবার্তায় তা দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক কোন কোন গোষ্ঠীও জড়িত। এসব গোষ্ঠী মনে করে, তাদের জন্য সুবিধাজনক সরকার ক্ষমতা নেই। তাই তারা তাদের সুবিধাজনক সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চায়। তারই ধারাবাহিকতায় এদেশে জঙ্গীবাদে অর্থায়ন করা হচ্ছে। জঙ্গী অর্থায়ন বন্ধ করা খুবই জরুরী।

তিনি আরও বলেন, শুধু বাহিনী নয়, সরকারী বেসরকারী সব প্রতিষ্ঠানে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। এখনই এদের নির্মূল করা জরুরী। অন্যথায় দেশবাসীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। প্রতিটি সেক্টরে অত্যন্ত কৌশলে জঙ্গীবাদের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। তিন বছর আগে গ্রেফতারকৃত রমজানের জাল শিক্ষাসনদ দিয়ে নৌবাহিনীতে প্রবেশ করার বিষয়টি তেমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যান্য বাহিনীতেও এ ধরনের মোটিভেটেড লোক আছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। তাদের শনাক্ত করে মূল উৎপাটন করা জরুরী। রমজান তিন বছর নৌবাহিনীতে চাকরি করলেও তার জঙ্গীবাদী তৎপরতার বিষয়টি না ধরা পড়া নানা উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এর শেকড় অনেক গভীরে কিনা সেটিও ভাবনার বিষয়। এটি এক ধরনের অনুপ্রবেশ। এ ধরনের অনুপ্রবেশকারী অন্যান্য বাহিনীতে আরও আছে কিনা বা তাদের সংখ্যা কত সেটিও গভীরভাবে তদন্ত করে বের করা দরকার। বাহিনীতে নিয়োগের আগে যে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া রয়েছে, সেখানে কোন গাফিলতি আছে কিনা সেটিও তদন্তের বিষয়। বাহিনীতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া আরও কড়া হওয়া দরকার।

এদিকে ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাস থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি কর্মকা-ের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। পাকিস্তানী নাগরিক ইদ্রিস আলীর জবানবন্দীতে ঢাকার পাকিস্তান দূতাবাসের কর্মকর্তা ফারিনা আরশাদ বাংলাদেশে জঙ্গীবাদের মদদ দিচ্ছেন বলেও মন্ত্রী অভিযোগ করেছেন।

এছাড়া নিজেদের প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র আইএস ও জেএমবির মতো জঙ্গীগোষ্ঠী বানিয়ে বিশ্বে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান। রবিবার রংপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি এমন মন্তব্য করেন।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: