১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৭ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

সম্ভাবনার ডিজিটাল কেবল টিভি


কেবল টিভি খাত আত্মর্কমসংস্থান, রাজস্ব প্রদানসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে। ১৯৯২ সালের শেষভাগে বাংলাদেশে কেবল টিভির যাত্রা শুরু। কেবল টিভি আসার আগে বাংলাদেশের টিভি দর্শকরা মাত্র একটি চ্যানেল দেখতে পারত। কেবল টিভি বহু চ্যানেল দেখার সুযোগ করে দেয়। প্রায় তেইশ বছর সময় পেরিয়ে কেবল টিভি পৌঁছে গেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। কেবল টিভির কারণে মানুষ এখন ২৫টিরও বেশি দেশীয় বাংলা চ্যানেলসহ প্রায় শতাধিক চ্যানেল দেখার সুযোগ পাচ্ছে। স্বল্প খরচে এত চ্যানেল দেখার সুযোগ অনেকাংশেই পূরণ করছে মানুষের বিনোদন চাহিদা। বলা চলে নাগরিক জীবনে গ্যাস, পানি, বিদ্যুতের মতো কেবল টিভি পরিণত হয়েছে প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গে।

শত প্রতিকূলতা পেরিয়ে কেবল টিভি খাত দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করলেও, দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনও বাংলাদেশে কেবল টিভি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। গ্রাহক সেবার মানও সন্তোষজনক নয় বলে গ্রাহকদের কেবল অপারেটরদের প্রতি অভিযোগ রয়েছে। দেশে প্রায় তিন কোটি কেবল সংযোগ গ্রাহক রয়েছে। গড়ে মাসে ২০০ টাকা সংযোগ প্রতি হার ধরা হলে মাসে এই খাতে ৬০০ কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে, বছরে যার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় আট হাজার কোটি টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে না ওঠায় এই খাতের বিপুল পরিমাণ টাকা অবৈধ থেকে যাচ্ছে। সরকারের রাজস্ব ভা-ারেও যোগ হচ্ছে না প্রত্যাশিত রাজস্ব। অবৈধ অর্থের উৎস হওয়ায় খাতটিতে চলছে চরম নৈরাজ্য, সন্ত্রাস ও পেশীবাজদের দৌরাত্ম্য। দেশব্যাপী বিশ হাজারের অধিক অপারেটর থাকলেও লাইসেন্সবিহীনভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে অধিকাংশ অপারেটর। কেবল টিভি খাতে প্রায় ১০০০ সিও লাইসেন্স রয়েছে এফও লাইসেন্স রয়েছে প্রায় ১২০০টি। এ হিসাবই প্রমাণ করে দেশে ্লাইসেন্সবিহীনভাবেই চলছে এ ব্যবসা। কঠোর নজরদারী ও আইনের সঠিক বাস্তবায়ন থাকলে এই খাতটি আরও বিস্তৃত যেমন হতো তেমনি সরকারী কোষাগারেও জমা পড়ত বিপুল পরিমাণ অর্থ।

এই খাতটিতে শৃঙ্খলা আনতে সরকার কেবল টিভি আইন, ২০০৬ প্রণয়ন করে। এই আইনে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করা যাবে না। আইনটিতে এমএসও (মাল্টি সার্ভিস অপারেটর), সিও (কেবল অপারেটর) এবং এফও (ফিড অপারেটর) এই তিন ধরনের লাইসেন্স প্রদানের উল্লেখ থাকলেও দেয়া হচ্ছে সিও এবং এফও লাইসেন্স। আইনে এমএসওর কথা উল্লেখ থাকলেও এই লাইসেন্সের কোন নিয়মনীতি না থাকায় দেশে একটিও এমএসও লাইসেন্স প্রদান করা হয়নি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেশিরভাগ কেবল অপারেটর ও ফিড অপারেটরই লাইসেন্স না নিয়ে দিব্যি ব্যবসা করে যাচ্ছেন। বিটিভির লাইসেন্স অধিদফতর জনবলের অভাবে এ বিষয়ে তেমন কোন পদক্ষেপ নিতে পারছে না। তবে অধিদফতর দেশে বৈধ অবৈধ অপারেটর চিহ্নিত করতে গত সেপ্টেম্বর মাসে সকল জেলা প্রশাসককে সকল বৈধ অবৈধ অপারেটরের তালিকা প্রদানের জন্য চিঠি দিয়েছে। তালিকা পেলে অবৈধ অপারেটরদের বিরুদ্ধে আইনী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে জানা গেছে।

অবৈধ অপারেটররা সরকারকে রাজস্বও দেয় না। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় কেবল অপারেটরদের প্রদানকৃত সার্ভিস চার্জের ওপর পনেরো শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করলেও প্রত্যাশিত স্তরে ভ্যাট আদায় হচ্ছে না। ভ্যাট কর্তৃপক্ষেরও এ বিষয়ে তেমন তোড়জোড় লক্ষ্য করা যায় না। এরকম নৈরাজ্যকর অবস্থান নিরসনে দেশের কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তাদের আগ্রহ বাস্তবায়নে সরকার এমএসও লাইসেন্স প্রদানে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। প্রদানকৃত এমএসও লাইসেন্সের অধীনে যে সকল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হবে তা হবে সম্পূর্ণ ডিজিট্যাল। ডিজিট্যাল পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা, সেবার শতভাগ সন্তোষজনক মান রক্ষা, গ্রাহক অধিকার অক্ষুণœ রাখা সম্ভব, এনালগ পদ্ধতিতে তা সম্ভব নয়। কেবল টিভির চ্যানেল বহরে প্রায় ১০০ চ্যানেল গ্রাহক সেবায় প্রদান করা হচ্ছে। এনালগ পদ্ধতিতে এর বেশি প্রদানও সম্ভব নয়। ১০০টি চ্যানেলের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি ফ্রিটুএয়ার চ্যানেল রয়েছে। প্রায় ৪০টি রয়েছে বিদেশী পে-চ্যানেল। এই সব বিদেশী পে-চ্যানেল বাজারজাত করছে দুটি প্রতিষ্ঠান, ন্যাশন ওয়াইড মিডিয়া লিঃ ও ডিজিজাদু ব্রডব্যান্ড লিঃ। পে-চ্যানেলের মধ্যে রয়েছে, স্টার প্লাস, স্টার জলসা, স্টার মুভি, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ডিসকভারী, এনিমেল প্লানেট, সনি, জি বাংলা, জি টিভি, সি সিনেমা, কালার্স, কালার্স বাংলা, স্টার স্পোর্টস, টেন স্পোর্টস এরকম আরও অনেক চ্যানেল। এই সব চ্যানেলের জন্য কেবল অপারেটরদের মাসে মাসে অর্থ প্রদান করতে হয়। এই পে-চ্যানেলের বিপণনেও রয়েছে নানা অনিয়ম। কেবল টিভি আইন- ২০০৬ এ সরকার কর্র্তৃক পে-চ্যানেলের মূল্য নির্ধারণ করে দিবে বলে উল্লেখ আছে, অদ্যাবধি সরকার কর্তৃক পে-চ্যানেলের জন্য মূল্য নির্ধারিত হয়নি।

এসব কিছু বিবেচনায় নিয়েই তথ্য মন্ত্রণালয় এমএসও লাইসেন্স প্রদানে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমএসও লাইসেন্স প্রদানে নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষ্য তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। গঠিত কমিটিতে বুয়েট, আহসানউল্লাহ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিভিশন চ্যানেল ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি রয়েছেন। কমিটিতে কেবল অপারেটরদের প্রতিনিধিও রয়েছেন। কেবল অপারেটরদের প্রতিনিধিত্ব করছেন কেবল অপারেটরস ন্যাশনাল কনভেনশন ২০১৫-এর আহ্বায়ক মীর হোসেইন আখতার। গঠিত কমিটির বেশ কয়েকটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এমএসও লাইসেন্সের জন্য আবেদন জমা পড়েছে। যারা আবেদন করেছে তাদের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদী গ্রুপ, স্কয়ার, বেঙ্গল, লিংক থ্রি, ফাইবার এট হোম, সামিট। এমএসও লাইসেন্স প্রাপ্তির পর দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়বে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। তাদের কার্যক্রম শুরু হলে এনালগ পদ্ধতির বর্তমান কেবল অপারেটরদের ব্যবসা হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

সারাদেশে কেবল অপারেটররা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বর্গে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগে কেবল টিভি সার্ভিস প্রদানে প্রয়োজন হবে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ। এই বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ করা ক্ষুদ্র বর্গের কেবল অপারেটরদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া কেবল টিভি খাতটি শিল্প হিসেবে ঘোষিত না হওয়ায় ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিও সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবে এই বিশাল বাজার কব্জা করবে বৃহৎ পুঁজির প্রতিষ্ঠান। ফলে পথে বসে যেতে পারে দীর্ঘদিনের কেবল অপারেটর ও ফিড অপারেটরদের ব্যবসা। বাজার অর্থনীতির এই সময়ে পুঁজির বিপরীতে পুঁজি দিয়েই লড়তে হবে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। এখানে সংরক্ষণের কোন সুযোগ নেই। এনালগ প্রযুক্তিনির্ভর কেবল টিভিতে বিনিয়োগ নিরাপত্তার সুযোগ নেই। ডিজিট্যাল প্রযুক্তি এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। তাই বৃহৎ পুঁজির বিপরীতে কেবল অপারেটরদের সৃষ্টি করতে হবে সমষ্টি পুঁজি। কেবল অপারেটররা যদি এই সমষ্টি পুঁজি সৃষ্টি করতে পারে তাহলে কেবল টিভির বাজারে এগিয়ে থাকবে কেবল অপারেটরাই। কেবল অপারেটরদের এই বাস্তবতাটি বুঝতে হবে। সময় ব্যয় না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমষ্টি পুঁজি সৃষ্টির সূচনা করতে হবে।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল প্রযুক্তি আসবে, এটাই স্বাভাবিক। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলসমূহ টিভি দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে দুটি প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী সক্রিয়। একটি কেবল টিভি অপরটি কেবলবিহীন ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম)। বাংলাদেশে গত বছর ডিটিএইচ পদ্ধতিতে গ্রাহক সেবা প্রদানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে একটি বেক্সিমকো মিডিয়া গোষ্ঠী গ্রাহক সেবা প্রদানে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে। এই ডিটিএইচ প্লাটফর্ম আত্মপ্রকাশ করবে আগামী বছরের প্রথম ভাগেই। ডিটিএইচ প্লাটফর্মে বিনিয়োগ ব্যয়বহুল। তুলনামূলকভাবে ডিজিটাল কেবল টিভি খাতে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। ডিটিএইচে বেশ কিছু সমস্যাও রয়েছে। ডিটিএইচ কানেকশন নিতে প্রতিটি গ্রাহককে বাধ্যতামূলক তার বাসায় ডিস এন্টেনা ইনস্টল করতে হবে। তাই একটি ১০ ইউনিটের ৫ তলা বাড়িতে যদি ১০টি ফ্ল্যাট থাকে তবে ওই বাসায় ১০টি ডিস এন্টেনা ইনস্টল করতে হবে? ডিটিএইচ পদ্ধতিতে আরেকটি সমস্যা হলো বৃষ্টি এবং ঘন কুয়াশাতে সিগন্যাল নিরবচ্ছিন্ন থাকে না। তাছাড়া, ডিটিএইচ পদ্ধতিতে বিদেশি চ্যানেলগুলোর আপলিঙ্ক ও ডাউন লিংক বাংলাদেশ থেকে করা হবে কিনা, করলেও কিভাবে করা হবে তা নিশ্চিত না করতে পারলে আকাশ নিরাপত্তা নিয়েও সংশয় দেখা দিতে পারে ? এসব কারণে ডিটিএইচ প্লাটফর্মের মুখ থুবড়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু কেবল অপারেটরা যদি এনালগ পদ্ধতিই অনুসরণ করে তবে তাদের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে বাধ্য হয়ে ডিটিএইচের দিকে নজর দিতে পারে। এজন্য কেবল অপারেটরদের ডিজিট্যাল কেবল টিভির প্রতি মনোযোগ দেয়া ছাড়া কোন গত্যন্তর নেই। সন্তোষজনক সেবা প্রাপ্তিতে ডিজিট্যাল কেবল টিভি বিশ্বব্যাপী এখনও এক নম্বর জায়গা ধরে রেখেছে। অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্যই কেবল অপারেটরদের ডিজিটাল কেবল টিভির সূচনা করতে হবে। আশার কথা, ইতোমধ্যে অত্যাধুনিক ডিজিটাল কন্ট্রোল রুম স্থাপন করে গ্রাহকদের আধুনিক সেট টপ বক্স প্রদানের মাধ্যমে এই পরিষেবাকে আন্তর্জাতিক মানদ-ে রূপান্তরিত করার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। তাছাড়া তারবিহীন সংযোগ যেখানে ডিটিএইচ এর অনুমোদন দেয়ার একটি অজুহাত সেই কাজটা কোন ডিস স্থাপন ছাড়াই কেবল অপারেটররা তারসহ এবং তার ছাড়া ওয়ারলেস সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে সক্ষমতা অর্জন করেছে? তাই কেবল টিভি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে, হাজার হাজার মানুষ বেকার হয়ে পড়বে, এমন দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই। শুধু দরকার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিট্যাল কেবল টিভি সেবার সূচনা, পেশীশক্তির দৌরাত্ম্য হ্রাস, সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকি। তাহলে এই খাতটি আত্মকর্মসংস্থানসহ রাজস্ব আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

লেখক : সভাপতি, মুক্তধারা পরিষদ (কোয়াব)

talatiqbal2010@gmail.com