২০ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রতারিত হচ্ছেন উচ্চ শিক্ষার্থীরা


চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রতারিত হচ্ছেন উচ্চ শিক্ষার্থীরা

রাজু মোস্তাফিজ, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর থেকে ফিরে ॥ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের পাতালিমা এলাকায় ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র হাসান, পাচাচিনি এলাকার গুল কলেজের ছাত্র জাকির হোসেন কয়েক লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশ থেকে স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন মালয়েশিয়ায়। উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। ঢাকার বিভিন্ন এডুকেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান এসব তরুণ মেধাবী ছাত্রদের চটকদার বিজ্ঞাপন এবং নানা প্রলোভন দেখিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পাঠিয়ে থাকে। এসব বিজ্ঞাপন দেখে বাংলাদেশের শত শত ছাত্রছাত্রী মালয়েশিয়ায় প্রতি বছর বিভিন্ন নামসর্বস্ব কলেজ কিংবা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়তে যান। কিছু ছাত্রছাত্রী প্রতারণায় না পড়লেও অধিকাংশই নানা সমস্যায় পড়েন। বাধ্য হয়ে অনেকেই দিনমজুরি করে কোন রকম জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখেন। আবার অনেকে সর্বস্ব হারিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

কুয়ালালামপুরে প্রেসিডেন্ট কলেজ, লাক্স কলেজ, টিএমসি, মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল একাডেমিসহ নামসর্বস্ব বিভিন্ন কলেজে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীরা সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হন বলে জানান মালয়েশিয়ায় প্রবাসী যুবক বাবলু (২২)। দুই বছর আগে সিলেট থেকে লেখাপড়ার জন্য মালয়েশিয়ায় গেছেন। মেধাবী হলেও টাকার অভাবে বেশিদূর পড়াশোনা করতে পারেননি। কুয়ালালামপুরের বুকিতবিতান এলাকার এক দোকানে সেলসম্যান হিসেবে কাজ করেন।

বাবলু জানান, মালয়েশিয়ায় ছাত্রছাত্রীদের কাজের কোন পারমিট নেই। এখানে অনার্সে অথবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভিন্ন কোর্সে ভর্তি হলেও নতুন করে তাদের ইংরেজী ভাষা শিখতে হয়। তাদের আলাদা ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। এজন্য ছাত্রছাত্রীদের বাড়তি টিউশন ফি দিতে হয়। এজন্য ছাত্রছাত্রীরা বার বার বাড়ি থেকে অতিরিক্ত টাকা পাঠানোর তাগিদ দেন। তাদের বাবা-মাকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাঠাতে হিমশিম খেতে হয়। বাধ্য হয়ে অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে দেন, আবার অনেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকের কাজ করেন। প্রবাস জীবনে অমানুষিক পরিশ্রম করে জীবনটাকে বাঁচিয়ে রাখেন।

প্রবাসী ছাত্র নুর, শিমুল, ফয়সল জানান, ঢাকার বিভিন্ন এডুকেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান প্রবাসী ছাত্রছাত্রীদের অবসর সময়ে পাঁচতারকা হোটেলে চাকরি, বিশ^বিদ্যালয় অথবা কলেজগুলোতে বৃত্তির ব্যবস্থা করার কথা বলে পাঠায়। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। কোন রকমে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরে নিয়ে এসেই ওই সব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নানা অজুহাতে সটকে পড়েন। এরপর তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। অসহায় হয়ে পড়েন প্রবাসে আসা তরুণ ছাত্রছাত্রীরা। অনেকেই কষ্ট সহ্য করতে না পেরে বাধ্য হয়েই দেশে ফিরে যান।

রাজধানী শহর কুয়ালালামপুরের জালান পাসিয়ালান এলাকায় বিশাল টুইনটাওয়ার ভবন অবস্থিত। সেখানে বাংলাদেশী বহু শ্রমিক কাজ করেন। নারায়ণগঞ্জের আবু তাহের (৩২) একটি প্রজেক্টে কাজ করেন। সেখানে তিনি জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ১০ জন ছাত্র বিভিন্ন সময় চুক্তিভিত্তিক মজুরিতে কাজ করেন। এখানে যেসব ছাত্র কাজের জন্য আসেন তাদের কোন ওয়ার্ক পারমিট নেই। ঢাকার বিভিন্ন এডুকেশন কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান ওই সব ছাত্রকে বিভিন্ন ফাইভস্টার হোটেলে পার্টটাইম কাজের কথা বললেও এখানে কোন কাজ দেয়ার ব্যবস্থা করে না। বাধ্য হয়ে ছাত্ররা মাসিক ৭শ’ থেকে ৮শ’ রিঙ্গিতে মজুরের কাজ করেন। তাই দিয়ে তারা শুধু নিজের জীবনটাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বুকিমবিতান এলাকার কয়েকজন প্রবাসী বাঙালী জানান, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর বাঙালী দালাল রয়েছে। তাদের কারণে বাংলাদেশ থেকে মেধাবী ছাত্ররা নানাভাবে প্রতারিত হয়। তারা জানান, মেলবোর্ন ইন্টারন্যাশনাল কলেজটি অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক স্বীকৃত বলা হলেও এটি নামসর্বস্ব একটি একাডেমি। এখানে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্সের কথা বলা হলেও শুধু টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করা হয়। নানা কৌশলে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে ওই প্রতিষ্ঠানটির। তাদের মতে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতি চার মাস পর পর সেমিস্টারের টাকা নেয়, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় এক লাখ টাকা। দালালরা ভর্তি করার সময় তিন থেকে চার লাখ টাকা নিয়ে অজানা পরিবেশে ছাত্রছাত্রীদের ফেলে কেটে পড়ে। চরম অনিশ্চয়তায় হতাশ হয়ে পড়েন তারা। তবে স্থানীয় প্রবাসীরা নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। আবেগতাড়িত হয়ে সন্তানদের এভাবে না পাঠানোর জন্য অভিভাবকদের পরামর্শ দেন প্রবাসীরা। ভালমতো খোঁজখবর নিয়ে যেন তারা সিদ্ধান্ত নেন। এমন এক পরিস্থিতিতে অনেক মেধাবী ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যত ধ্বংস হয়ে যায়, যার খোঁজ কেউ রাখে না। বাংলাদেশী দূতাবাস এক্ষেত্রে কোন সহযোগিতা করতে আগ্রহী নয়। অনেক চেষ্টা করেও মালয়েশিয়ার বাংলাদেশী দূতাবাসের কোন কর্মকর্তার মুখ থেকে এ বিষয়ে কিছু জানা সম্ভব হয়নি।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: