১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বিশৃঙ্খলা বা কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি হলেই ভোট বন্ধ


বিশৃঙ্খলা বা কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি হলেই ভোট বন্ধ

স্টাফ রিপোর্টার ॥ পৌর নির্বাচনে ভোট গ্রহণে বিশৃঙ্খলা বা কোন প্রকার বাধার সৃষ্টি হলে সঙ্গে সঙ্গে ভোট গ্রহণ বন্ধ করতে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া ভোট শুরু হওয়ার আগে কোন প্রার্থীর পক্ষে যেন জোরপূর্বক সিল মেরে বাক্সে ভরা না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার কথা বলা হয়েছে। এ জন্য রাতেই প্রত্যেক ব্যালট বাক্স পরীক্ষা করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কোন প্রার্থীর পক্ষে জোরপূর্বক প্রভাব সৃষ্টির চেষ্টা করা হলে সঙ্গে সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকতাদের নির্দেশ দিয়েছে ইসি। শনিবার নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে ইসির পক্ষ থেকে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে বৈঠকসূত্রে জানা গেছে।

বৈঠক শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, পৌর নির্বাচনে সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ নির্বাচনে সেনাবাহিনী ছাড়াই সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। রাজধানীর ইস্কাটনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এ্যাডমিনিস্ট্রেশন এ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিয়াম) ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে তিন ঘণ্টাব্যাপী এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেলা এগারোটায় বৈঠক শুরু হয়ে প্রায় বেলা দুটা পর্যন্ত চলে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বৈঠকে নির্বাচন কমিশনারগণ, ইসি সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্ট গার্ডসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক ও রিটার্নিং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠকে উপস্থিত একজন রিটার্নিং কর্মকর্তা বৈঠকের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে বলেন, ভোট শুরু হওয়ার আগের রাতের মধ্যেই সব ব্যালট বাক্স পরীক্ষা করতে বলা হয়েছে। ভোট গ্রহণের আগের রাতে কোন প্রার্থীর পক্ষে জোরপূর্বক সিল মারা বা অন্য কোন প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ডেকে তা প্রতিরোধ করার কথা বলা হয়েছে। জানা গেছে, বেশিরভাগ রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছে ভোটের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ সময় সিইসি রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সব কিছু যদি নিয়ন্ত্রণে থাকে তাহলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের মতো ঘটনা ঘটছে কেন। গণমাধ্যম তাহলে কিসের ভিত্তিতে এসব ঘটনা তুলে ধরছে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্যও এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বৈঠকসূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কিছুটা মতবিরোধ দেখা দেয়। বৈঠকসূত্রে জানা গেছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ বিশেষ করে জেলা পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী এলাকায় সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ভার রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপর না রেখে সরাসরি বাহিনীর নিকট হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়। বলা হয়, এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। সার্বিক বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার ভার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা হোক। এজন্য নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেয়া হয়। এ সময় -ৃঙ্খলা বাহিনী ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মধ্যে কিছু মুখ চাওয়াচাওয়ীর ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। পরে অবশ্য জেলা প্রশাসকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনে আইন- শৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় ডিসি-এসপিদের সমন্বয়ে কোর কমিটি রয়েছে। এ কমিটি ভাল কাজ করছে। এর মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বৈঠক শেষে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সাংবাদিকদের আরও বলেন, বৈঠকে আমরা রিটার্নিং কর্মকর্তা, এসপি-ডিসিদের কথা শুনেছি। তারা বলেছেন, মাঠের পরিস্থিতি ভাল। কোন উদ্বেগ নেই। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, প্রতিবারই এ তালিকা করা হয়ে থাকে। ভোট নেয়ার কয়েক দিন আগে এটি করা হয়। আপাতত একটি তালিকা আছে। তা বাড়তেও পারে, আবার কমতেও পারে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে। বর্তমানে নির্বাচনের যে পরিস্থিতি আছে তাতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে বলেন, নির্বাচনে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসারসহ অন্যান্য বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। মন্ত্রী-সাংসদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে সিইসি বলেন, আগে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে; আশা করি তারা আচরণবিধি মেনে চলবেন। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বলেছি। আচরণবিধি লঙ্ঘনকারী মন্ত্রী-সাংসদদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সবাই আচরণবিধি মেনে চলবেন। একবার নির্দেশনা দেয়ার পর আবার যে কেউ বিধি লঙ্ঘন করলে যে কোন ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয় হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেন, মাঠ পর্যায়ের নির্বাচন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বৈঠকে জানিয়েছেন তেমন কোন উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নেই। নির্বাচনে পূর্ণ শৃঙ্খলা রয়েছে এবং থাকবে। পরিস্থিতি এখন ভাল। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চলছে। কোন কোন জায়গায় দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও সেদিকে নজরদারি রয়েছে বলেও জানিয়েছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সিইসি বলেন, জঙ্গী ও সন্ত্রাসের সমস্যা সাধারণ সমস্যা। মাঠ পর্যায় থেকে এ রকম কোন সমস্যা এ নির্বাচনে নেই বলে জানানো হয়েছে বৈঠকে। কঠোর নজরদারির কারণে এসব সমস্যা বাড়তে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ভোটের কার্যক্রম যাতে কোন প্রকার ব্যাহত না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতেও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে। কোন প্রকার নির্বাচনী পরিবেশ ব্যাহত হলেই কঠোর এ্যাকশন নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। এছাড়া বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে নির্বাচনে সার্বিক সহায়তা করার জন্য তিনি সাংবাদিকদের আহ্বান জানান। বলেন, আশা করি সবার সার্বিক সহযোগিতায় এ নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে। সিইসি বলেন, সন্ত্রাসীদের ধরপাকড়ে এ্যাকশন নেয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোট পর্যন্ত সন্ত্রাসী-অপরাধী ধরপাকড় কার্যক্রম আরও ত্বরান্বিত হবে। এ নিয়ে কোন উদ্বেগ থাকবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।

ভোটকেন্দ্রে সাংবাদিক প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, অতীতে কোন ভুল বোঝাবুঝি হয়ে থাকলে এবার যাতে তা না হয় সে বিষয়ে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নির্বাচনে সাংবাদিকদের পাস দেয় হবে। তারা ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং পরিস্থিতি দেখবেন, রিপোর্ট করবেন। তবে খেয়াল রাখবেন, যাতে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। কেন্দ্রে বেশিক্ষণ থাকবেন না। নির্বাচনে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আপনাদের কাছে তথ্য পেয়ে যেন আমরা তাৎক্ষণিক এ্যাকশন নিতে পারি। এজন্য বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করবেন বলে উল্লেখ করেন।

এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে কমিশনের আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কর্মপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয় পৌর নির্বাচন উপলক্ষে ভোট গ্রহণের দিন, তার আগে দুই দিন এবং পরে একদিন; মোট চারদিন ভোটকেন্দ্রে ও সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করা হবে। নির্বাচনে সামগ্রিক নিরাপত্তা বিধানে সকল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োগের দায়িত্বে থাকবেন রিটার্নিং অফিসার। তবে নির্বাচনী এলাকায় মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স নিয়োগে পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসারের সঙ্গে পরামর্শক্রমে এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। ভোট গ্রহণের অন্তত তিন দিন আগে নির্বাচন কমিশনকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সুপার সার্বিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা প্রেরণ করবেন। রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে নির্বাচনের ২/৩ আগে থেকে আইন-শৃঙ্খলা সমন্বয় সেল স্থাপন করা হবে। এ সেলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একজন করে প্রতিনিধি থাকবেন। এছাড়া পৌর নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ভেদে ১৯ থেকে ২০ ফোর্স মোতায়েন করা হবে। এ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র রয়েছে তিন হাজার ৫৮৫টি।

উল্লেখ্য, আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশের ২৩৪ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এতে মেয়র পদে ৯২৩ ও কাউন্সিলর পদে ১১ হাজার ১২২ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্য থেকে প্রতিনিধি নির্বাচনে প্রায় ৭২ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। গত ২৪ নবেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ সারাদেশে ২৩৪ পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। তফসিল অনুযায়ী নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিন ছিল ৩ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র বাছাই করা হয় ৫ ও ৬ ডিসেম্বর। প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল ১৩ ডিসেম্বর। ১৪ ডিসেম্বর থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। এতে দলীয় প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ইসির নির্ধারিত প্রতীকে নির্বাচন করছেন। এবারই প্রথম পৌরসভা নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এতে শুধু মেয়র পদেই দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হচ্ছে। অপরদিকে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে নির্দলীয় নির্বাচন হবে।