১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

ডিজনি এবং ডিজনিল্যান্ডের গল্প


ইঁদুর আঁকতে গিয়ে তিনি আঁকলেন কাল্পনিক কার্টুন চরিত্র ‘মিকি মাউস’। আর বিশ্বজুড়ে তাই শিশু-কিশোরদের মনে স্থান করে নিল এনিমেশন হিসেবে। ওয়াল্ট ডিজনি শুধু কার্টুনিস্টই নন, একই সঙ্গে তিনি ছিলেন মার্কিন উদ্যোক্তা, এনিমেটর, ভয়েস আর্টিস্ট, চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক। ডিজনি কম্পানি মিকি মাউস ছাড়াও ডোনাল্ড ডাক, মাক্সগোফ, গোফি, প্লুটো, জুলিয়াস দি ক্যাটসহ অসংখ্য বিখ্যাত কার্টুন চরিত্র তৈরি করে। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় মিকি মাউস কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠস্বর দিয়েছিলেন ডিজনি নিজেই।

১৯০১ সালের ৫ ডিসেম্বর শিকাগো শহরে জন্ম তার। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম এনিমেশন প্রোগ্রামার। জীবদ্দশায় ২২টি অস্কার ও চারটি অবৈতনিক এ্যাকাডেমি এ্যাওয়ার্ডস অর্জন করেন ডিজনি। অস্কার পুরস্কারেরর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন ৫৯বার। বছরে চারটি অস্কার পাওরার রেকর্ডও করেন তিনি।

ছেলেবেলা থেকে ডিজনির ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিলো। পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধুদের ছবি এঁকে নিজের হাত খরচ নিজেই জোগাতেন তিনি। পরে শিকাগোর ম্যাক কিনলে হাইস্কুলে ভর্তি হয়ে অঙ্কনবিদ্যাকে ভাল মতো আয়ত্ত করেন। ওয়াল্ট ডিজনির প্রতিষ্ঠার পেছনে তার মা ও বড় ভাই রয় ডিজনির অবদান ছিল উল্লেখ করার মতো।

১৯১৮ সালে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে নাম লেখাতে গেলে বয়স কম থাকার কারণে ডিজনিকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আন্তর্জাতিক রেডক্রসে যোগদান করেন। সে বছর তাকে ফ্রান্সে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি এ্যাম্বুলেন্স চালক হিসেবে এক বছর কাজ করেন। মজার ব্যাপার হলো, যে কাপড় দিয়ে তার এ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকা ছিল সেই ঢাকনা তিনি ভরে রেখেছিলেন নানা ধরনের ছবি এঁকে।

ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে ওয়াল্ট ডিজনি ছবি এঁকে রোজগার করার সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় তার বয়স ছিল সতেরো বছর। ‘লাফ-ও-গ্র্যামস’ নামে একটি কোম্পানি খুলে বসলেও কিছুদিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি। তবে ডিজনি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী আর আত্মবিশ্বাসী। সেই আত্মবিশ্বাসে ভর করে মাত্র ২০ ডলার হাতে নিয়ে হলিউডে যান ওয়াল্ট ডিজনি। সেখানে কিছুদিন ছোটখাটো কাজ করার পর ‘এলিস কমেডিস’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে রাতারাতি প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। এর কিছুদিন পর ১৯২৫ সালের ১৩ জুলাই তিনি লিলিয়ান বাউন্ড নামের এক সহকর্মীকে বিয়ে করেন। ডায়েন ও শ্যারন নামে তাদের দুটি মেয়ে আছে।

১৯৩২ সালের ওয়াল্ট ডিজনি নির্মাণ করেন তার প্রথম রঙিন কার্টুন ছবি ‘ফ্লাওয়ার্স এ্যান্ড ট্রিস’। এ কার্টুনটি নিয়ে আসে ওয়াল্ট ডিজনির জীবনে প্রথম একাডেমি এ্যাওয়ার্ড। ১৯৩৭ সালে মাল্টিপ্যান ক্যামেরা পদ্ধতি ব্যবহার করে তিনি নির্মাণ করেন আরেকটি বিখ্যাত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ওল্ড মিল’। ডিজনি নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেয়েছিল ১৯৩৭ সালের ২১ ডিসেম্বর। ‘স্নো হোয়াইট এ্যান্ড দ্য সেভেন ডার্ফস’ নামের এ ছবিটি ওয়াল্ট ডিজনিকে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করে। এরপর তিনি পিনোকিয়ো, ফান্টাসিয়া, ডাম্বো এবং বাম্বির মতো বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যান একের পর এক।

ছেলেবেলা থেকেই হাসি-খুশি কৌতুকপ্রিয় মানুষ ছিলেন ওয়াল্ট ডিজনি। প্রথম থেকেই কার্টুন জাতীয় ছবি আঁকার প্রতি দুর্বার আকর্ষণ অনুভব করতেন তিনি। তার স্বপ্ন ছিল কার্টুনের মধ্য দিয়ে এমন একটি চরিত্র সৃষ্টি করা, যেটি একনামে সবাই চিনবে। ছোট-বড় সবার কাছে সমান জনপ্রিয়তা পাবে। এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যান ওয়াল্ট ডিজনি। আর তারই ফলে সৃষ্টি হয় কার্টুন ইতিহাসের সবচেয়ে গতিশীল, চটপটে ও জনপ্রিয় চরিত্র ‘মিকিমাউস’। ১৯২৮ সালের ১৮ নবেম্বর প্রথম মিকিমাউস আত্মপ্রকাশ করে। প্রথম কার্টুনটির নাম ছিল ‘স্টিমবোট হুইল’। এটাতে মিকিমাউসের ভূমিকায় কণ্ঠ দেন ওয়াল্ট ডিজনি নিজে। অবশ্য ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তিনি একটানা মিকিমাউসের ভূমিকায় কণ্ঠদান করে গেছেন। তারপর এ দায়িত্ব পালন করেন জিম ম্যাকডোনাল্ড। বর্তমানে কণ্ঠ দিচ্ছেন ওয়েন অলউইন।

পেশা হিসেবে এনিমেশনকে বেছে নেয়ার আগে জীবিকার প্রয়োজনে ডিজনি কিছুদিন সংবাদপত্রের কার্টুনিস্ট এবং রেড ক্রসের এ্যাম্বুলেন্স চালকের চাকরি করেন। পরে ম্যাগাজিন ও মুভি থিয়েটারের জন্য বিজ্ঞাপন তৈরির কাজ করেন তিনি। অর্থনৈতিক সঙ্কটে তার নিজস্ব ফিল্ম স্টুডিও ‘লাফ-হে গ্রাম’ (১৯২২) বন্ধ হয়ে যায়। আপন সহোদর রয় ডিজনির সঙ্গে ১৯২৩ সালে তিনি চালু করেন ‘ডিজনি ব্রাদার্স স্টুডিও’। ১৯২৮ সালে স্বল্প দৈর্ঘ এনিমেটেড চলচ্চিত্র ‘স্টিম বোট উইলি’র মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মিকি মাউস’ এর যাত্রা শুরু। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৫৫ সালে ক্যার্লিফোর্নিয়া খোলা হয় শিশুপার্ক ‘ডিজনি ল্যান্ড’, এরও পরিকল্পনা করেন তিনি।

বিশ্বে বিখ্যাত তিনটি ডিজনিল্যান্ড রয়েছে। প্রথমটি স্বয়ং ওয়াল্ট ডিজনির গড়া। দ্বিতীয়টি জাপানের চিবায় এবং তৃতীয়টি ইউরোপের ফান্সে। জাপানে নির্মিত ডিজনিল্যান্ডের নাম টোকিও-ডিজনিল্যান্ড। এটি ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৫ এপ্রিল স্থাপন করা হয়। টোকিও ডিজনিল্যান্ড বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পার্ক। ডিজনিল্যান্ডে রয়েছে অনেক স্থাপনা। এর মধ্যে এ্যাডভেনচার ল্যান্ড, জ্যাংগল ক্রুইজ, ওয়েস্টার্ন রিভার রেলরোড, হার্ডন্টেড হাউস। প্যাটারপেন, স্টার টোরস, লাইটিং প্যারেড, টুইন টাওয়ার ক্যাব ইত্যাদি। ডিজনিল্যান্ডের আর একটি মজার আকর্ষণ হলো সিন্ডারেলার প্রাসাদ। এখানে রয়েছে জাদুর আয়না। টুন টাওয়ার কাবে জাদুর খেলা প্রদর্শন করা যায়। এসব মজার মজার আকর্ষণ ছাড়াও আছে গ্রান্ড সার্কিট রেকিওয়ে, পুহস হানি হান্ট, টন্ডপার্ক, কার্টুন স্পিন। জলি ট্রোলি, টুইন রিভার বোট, বিগথান্ডার মাউনটেইন্ট হত্যাদি। এসব দেখলে মনটা আনন্দে ভেরে ওঠে। মনে পড়ে ওয়াল্ট ডিজনির কথা। তিনি শিশুদের কত ভালবাসতেন তার তৈরি কার্টুনের কথা কে না জানে।

ওয়াল্ট ডিজনি তার সৃজনশীলতার স্বীকৃতি পেয়েছেন সর্বমোট ২৫ বার। মিকিমাউস কার্টুনের জন্য একাডেমি এ্যাওয়ার্ড পান নয়বার। চারবার দেয়া হয় সম্মাননা পুরস্কার। তিনি ২২ বার পান পূর্ণ একাডেমি এ্যাওয়ার্ড।

ক্ষণজন্মা শিল্পী, মিকিমাউস ও ডিজনিল্যান্ডের স্রষ্টা ওয়াল্ট ডিজনি মারা যান ১৯৬৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর। একটি ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত পৃথিবী যতদিন টিকে থাকবে ততদিন মানুষ মনে রেখে যাবে ওয়াল্ট ডিজনিকে।