১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

নগরপিতাদের অনাগ্রহে বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদন আপাতত হচ্ছে না


রশিদ মামুন ॥ সিটি মেয়রদের অনাগ্রহে আপাতত বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনে পৃথক কোম্পানি গঠন হচ্ছে না। বিদ্যুত বিভাগ যৌথ উদ্যোগে কোম্পানি গঠনের সকল বিষয় চূড়ান্ত করলেও সিটি কর্পোরেশনের মেয়ররা নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যুত উৎপাদনে আগ্রহী। সঙ্গতকারণে তারা এখনই বিদ্যুত বিভাগের আহ্বানে সাড়া দিচ্ছেন না।

এর আগে এককভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিদ্যুত উৎপাদন করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। সম্ভাবনা থাকলেও বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদন প্রক্রিয়া মুখথুবড়ে পড়ে আছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিবেশ সম্মত না হওয়ায় প্রধান প্রধান নগরীতে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিনিয়ত দেশের বড় বড় নগরীর পানি এবং বায়ুতে বর্জ্যরে সংমিশ্রণ বিষ ছড়াচ্ছে।

সব শেষ উদ্যোগ হিসেবে দেখা যায় ইতালিয়ান কোম্পানি ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ফিন্যান্স এসআরএলের সঙ্গে ২০১৩ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগের একটি চুক্তি হয়। ঢাকার বর্জ্য দিয়ে দৈনিক ৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন করার কথা ছিল কোম্পানিটির। পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি করে এক শ’ মেগাওয়াট করার পরিকল্পনাও ছিল।

ঢাকার বর্জ্যে আলোচিত সেই বিদ্যুত প্রকল্পটি আর আলোর মুখ দেখেনি। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইতালিয়ান কোম্পানিটি নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটির ব্যর্থতায় ভেস্তে যায় প্রকল্পটি। অন্যদিকে রিনিউয়েবল এনার্জি কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামে বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদনের আগ্রহ দেখায়। সে সময় চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু সেটাও স্থানীয় সরকারে ফাইলবন্দী রয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নতুন করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিদ্যুত বিভাগ সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদনের একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুত মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে কোম্পানি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এর প্রেক্ষিতে বিদ্যুত বিভাগ কোম্পানির খসড়া প্রস্তুত করে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এর আগেই সিটি মেয়ররা আপত্তি তোলেন।

বিদ্যুত বিভাগের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিটি মেয়ররা বলছেন তারা এককভাবেই বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুত উৎপাদন করতে চায়। সিটি কর্পোরেশনগুলো নিজস্ব চেষ্টায় ব্যর্থ হলে তখন বিদ্যুত বিভাগের সঙ্গে যৌথ কোম্পানি গঠন করবে। বিদ্যুত বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে সিটি মেয়ররা এই মনোভাব জানিয়েছেন। তবে তাদের কাছে কি প্রকল্প রয়েছে কারা এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায় উৎপাদিত বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দর কি হবেÑ সেসবের বিস্তারিত কিছু জানাননি সিটি মেয়ররা।

সূত্র বলছে বিদ্যুত মন্ত্রণালয় বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদনের পরিকল্পনা করে আসছে। কিন্তু স্থানীয় সরকারের অসহযোগিতায় তা সম্ভব হয়নি। এককভাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সেই বিদ্যুত বিতরণ কোম্পানির কাছে বিক্রি করতে চেয়েছে। কিন্তু বিদ্যুত উৎপাদনের কোন অভিজ্ঞতা না থাকায় তারা ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যুত বিভাগ বর্জ্য বিদ্যুতের প্রকল্প হাতে নিতে চাইলে স্থানীয় সরকার বিভাগ বর্জ্যরে সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দেয়নি। সরকারের দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এমন অসহযোগিতামূলক মনোভাবের জন্যই দেশে বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদন অসম্ভব থেকে গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে তারা বলেছেন এককভাবে বিদ্যুত বিভাগ এ ধরনের প্রকল্প হাতে নিলে বর্জ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা তারা দেবেন না।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বৈঠক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে এ ধরনের প্রকল্পের অংশীদার করে নিলে বর্জ্য সরবরাহ দেয়ার বিষয়ে তাদের এক ধরনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। একই সঙ্গে তারা মুনাফাও পাবে। ফলে তাদের আগ্রহ আরও বাড়বে। কিন্তু কোম্পানি গঠন প্রক্রিয়ায় মেয়ররা রাজি না হওয়ায় এবারও প্রক্রিয়া ব্যর্থতার দিকেই এগোচ্ছে।

বিদ্যুত বিভাগ যে কোম্পানি গঠনের খসড়া তৈরি করছিল তাতে দেখা যায় বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন পৃথক কোম্পানি গঠন চুক্তি করবে। সিটি কর্পোরেশনে বিদ্যুত বিতরণ করে এমন কোন কোম্পানি এখান থেকে বিদ্যুত কিনবে। এখানে সিটি কর্পোরেশন, পিডিবি এবং বিতরণ কোম্পানি তিনটি সংস্থার প্রতিনিধিত্ব থাকার কথা ছিল।

ঢাকার দুই নগর অফিসের হিসাব বলছে এই ঢাকাতেই দেড় কোটির বেশি মানুষের প্রতিদিন অন্তত আট হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। এর সঙ্গে রাজধানীর হাসপাতাল-ক্লিনিক থেকে আরও দেড় হাজার টন বর্জ্য যোগ হয়। উৎপাদিত বর্জ্যর মধ্যে আছে প্লাস্টিক, কাগজ, কাঁচ, ধাতু এবং জৈব বর্জ্য। অন্যদিকে ঢাকার পরই একই এলাকায় বেশিসংখ্যক মানুষের বাস চট্টগ্রামে। বন্দরনগরীতে একসঙ্গে বসবাস করছেন ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ। এখানে প্রতিদিন উৎপাদিত হয় দুই হাজার ২শ’ থেকে দুই হাজার ৫শ’ টন বর্জ্য। কেবল এই দুই মহানগরীতে প্রায় ১২ হাজার টন বর্জ্যর মধ্যে বেশিরভাগই রান্নার উচ্ছিষ্ট পচনশীল; যা মিথেন উৎপাদন করতে সক্ষম। হিসাব বলছে, এই বর্জ্যরে পরিমাণ মোট বর্জ্যরে ৬০ শতাংশ। প্রতি মেগাওয়াট বিদ্যুত প্ল্যান্ট চালানোর জন্য প্রয়োজন হয় ৪০ টন বর্জ্য। এই হিসেবে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বর্জ্য দিয়ে ৩শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন সম্ভব। এর বাইরে প্রত্যেক বিভাগীয় শহরের বর্জ্য দিয়ে স্থানীয়ভাবে ১০ মেগাওয়াট বিদ্যুত উৎপাদন হতে পারে। বর্জ্য ফেলার জন্য যেসব ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে সেখানেই বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। ফলে নতুন করে জমিরও দরকার নেই। এখানেই বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো নির্মাণ করা সম্ভব।

জানতে চাইলে বিদ্যুত বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ইউনিটের যুগ্ম সচিব সিদ্দিক জোবায়ের বলেন, মেয়ররা রাজি নন এটা ঠিক নয়। বর্জ্যরে সঠিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তারা বিদ্যুত বিভাগের সঙ্গে নীতিগতভাবে একমত। তারাও বলছেন বর্জের একটি মানসম্মত ব্যবস্থাপনা জরুরী। তবে আপতত তাঁরা নিজেরা এককভাবে চেষ্টা করে দেখতে চাচ্ছেন। তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ছাড়া বর্জ্য বিদ্যুতের সঠিক দাম নির্ধারণ সম্ভব নয়। ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে সাধারণত ১৪ থেকে ২০ টাকার মধ্যে ইউনিট প্রতি দাম হতে পারে। তিনি বলেন, এর বাইরে বাই প্রডাক্ট হিসেবে জৈব সার বিক্রি করলে দাম কমে আসবে। তবে বর্জ্য বিদ্যুত উৎপাদন লাভজনক না হলেও স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ঝুঁকির দিকগুলো বিবেচনা করলে লাভজনক বিবেচনা করা যাবে।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: