১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন


ছাত্রজীবনের অবসান

(১৮ ডিসেম্বরের পর)

আসগর আলী শাহ ছিলেন পাঞ্জাবের অধিবাসী এবং ১৯৩৮ সালে তিনি আইসিএস হিসেবে শিক্ষানবিশী শেষ করে হন বেঙ্গল ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত সচিব নিযুক্ত হন এবং তার প্রতি আনুগত্য ছিলেন আজীবন। আমি যখন পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ে প্রথম নিযুক্তি পেলাম ১৯৬০ সালে তখন আসগর আলী শাহ আর চাকরিতে ছিলেন না। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার অব্যবহিত পরে ১৯৫৮ সালে ৩০৩ জন সরকারী কর্মচারীর পদচ্যুত বা অবসর প্রদান করেন। অনেক পদচ্যুতিই ছিল রাজনৈতিক কারণে। বলা হতো, এই ব্যক্তি রাজনৈতিক কারণে চাকরিচ্যুত হন। সোহ্রাওয়ার্র্দী যখন পূর্ব বাংলায় অবাঞ্ছিত ছিলেন, তিনি তখন নিয়মিতভাবে তার আগমন ও বিদায়কালে সংবর্ধনা দিতেন।

১৯৬২ সালে আমি যখন পরিবহন (অভ্যন্তরীণ জলপথ, রেলপথ, সড়ক ও জনপথ) বিভাগে উপসচিব, তখন কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের কিছু বরাদ্দ দেয় উপকূলীয় ও অভ্যন্তরীণ নৌযান খরিদ করার উদ্দেশ্যে। পরিবহন বিভাগে আমরা তখন এই অর্থ মোট তিন কোটি ডলার বিতরণের জন্য দরখাস্ত আহ্বান করি। তখন অভ্যন্তরীণ নৌযান ব্যবসায় দু’চারটি কোম্পানি ছাড়া বাকি ছিল কতিপয় ব্যক্তি। শাহ সাহেব ছিলেন এই সময়ে একজন ঋণপ্রার্থী। তিনি আমার সচিব সিনিয়র বাঙালী প্রশাসক আবদুর রশিদকে একটি বিশেষ অনুরোধ করে ফোন করলেন। তিনি বললেন, চাকরিচ্যুত হওয়ার পর কোনদিন সচিবালয়ে আসেননি। তাই দরখাস্তকারী হিসেবে এবার হবে এখানে তার প্রথম আগমন। তিনি লজ্জায় সচিবালয় যান না। তাই তিনি অনুরোধ করলেন, সন্ধ্যাবেলায় যখন সচিবালয় খালি থাকবে তখন সাক্ষাতকারের জন্য ডাকা হয়। আমরা সহজেই তার অনুরোধ মেনে নিই। রশিদ সাহেব শাহ সাহেবের একজন ঘনিষ্ঠ কনিষ্ঠ কর্মকর্তা ছিলেন। সম্ভবত তাকে একটি নৌযানের জন্য ঋণ দেয়া হয়। শাহ সাহেবের বড় আকর্ষণ ছিল তাস খেলা এবং সেখানে মাঝে মাঝে তিনি অনেক ঝুঁকি নিতেন। অরফানেজ রোডের রসুল সাহেবের তাসের আসর তখন খুব বিখ্যাত ছিল এবং এখানে শাহ সাহেব ছিলেন একজন নিয়মিত খেলোয়াড়। আগেই বলেছি রসুল সাহেব ছিলেন আমার দাদির চাচাতো ভাই। তাই সে বাড়িতে আমার বেশ আনাগোনা ছিল যদিও তাসের আসরে ছাত্রাবস্থায় তো নয়, পরবর্তীকালেও কখনও আমি অংশগ্রহণ করিনি।

আমি আমাদের হল ইউনিয়ন নির্বাহী কমিটির কার্যকাল ১৯৫৫ সালের পঞ্জিকা বছরে শেষ করার উদ্দেশ্যে সেপ্টেম্বর মাসেই সাহিত্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। আমার পরীক্ষা শুরু হওয়ার কয়েকদিন আগেই উৎসবটি সমাপ্ত হয়। আমার সৌভাগ্য, প্রথমবার যেমন ইংরেজী উপস্থিত বক্তৃতায় আমি প্রথম পুরস্কারটি পাই, এবারেও ঠিক তেমনই হয়। অক্টোবর মাসের ৫ তারিখ শুরু হয় আমাদের এমএ পরীক্ষা এবং ১৫ অক্টোবরে তা শেষ হয়ে যায়। একটি ব্যতিক্রম হিসেবে মৌখিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় লিখিত পরীক্ষার আগে, ৫ অক্টোবরে। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগে থেকেই আমরা আগামী হল নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। সে সময় ছাত্রলীগ এবং ছাত্র ইউনিয়নের বেশ সুসম্পর্ক ছিল। গুজব ছিল, দুইটি প্রতিষ্ঠান একীভূত হয়ে যাবে। আমি সেই আশায় ভরসা করে মোটামুটিভাবে ২টি ছাত্র সংগঠনের সম্মিলিত একটি প্যানেলের বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছিলাম। কিন্তু ছাত্রলীগ নেতা আবদুল আউয়ালের কূটবুদ্ধির কারণে শেষ মুহূর্তে আলোচনা ব্যর্থ হয়। আমার দল থেকে তখন প্রচণ্ড চাপ এলো, আমরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এই মুনাফেকী চলতে দেব না। আমাদের সে বছর সহ-সভাপতি পদের জন্য শক্ত প্রার্থী ছিল না। তাই আমরা জোর দিচ্ছিলাম, সাধারণ সম্পাদক পদের জন্য আমাদের প্রার্থী বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরকে গ্রহণ করা হোক। (বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞানী। সুশীল সমাজের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি) তাই বলতে গেলে আমাদের কোন শীর্ষ পদপ্রার্থী ছিলই না। বিপদে পড়ে আমরা আমার সহপাঠী, যিনি আগেরবার বিএসসি (সম্মান) পরীক্ষা দেননি, মোহাম্মদ সাঈদুজ্জামানকে এই পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য আহ্বান জানালাম। (তিনি অর্থসচিব, বিশ্বব্যাংকে একান্ত নির্বাহী পরিচালক, অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন এবং সুশীল সমাজে এখনও গণ্যমান্য ব্যক্তি) অনেক চাপাচাপির পর সাঈদুজ্জামান রাজি হলেন। তবে খুব কড়া কয়েকটি শর্ত দিলেন। নির্বাচনের জন্য খরচপাতি খুবই সীমিত রাখতে হবে (যেহেতু তিনি এজন্য সবিশেষ ব্যয় করতে পারবেন না)। দ্বিতীয়ত, তিনি সেই বছরই ১৪ নবেম্বর থেকে কেন্দ্রীয় সুপিরিয়র সার্ভিসের পরীক্ষা দেবেন, সেজন্য নির্বাচনে বেশি সময় দিতে পারবেন না। এইসব কঠোর শর্ত না মেনে আমাদের উপায় ছিল না। নির্বাচনী প্রচারণাকালে আমার মুশকিল হলো, প্রায়ই সাঈদুজ্জামানকে ছাড়াই আমার দলের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে হয়। একদিন যখন বক্তৃতা দিচ্ছি তখন আমার এক ঘনিষ্ঠজন আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, আমার সেদিন পরীক্ষা আছে। আমি পরীক্ষা হলে প্রায় ৪৫ মিনিট পরে গিয়ে হাজির হই।

১৮ থেকে ২১ অক্টোবরে কুমিল্লায় যে ছাত্র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় তার ইঙ্গিত আগেই দিয়েছি। এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন তদানীন্তন শিক্ষা পরিচালক অধ্যাপক ড. মমতাজ উদ্দিন আহমদ এবং আয়োজনটির সর্বময় কর্তৃত্বে ছিলেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ প্রাক্তন আইসিএস কর্মকর্তা আখতার হামিদ খান।

চলবে...