মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
১৬ আগস্ট ২০১৭, ১ ভাদ্র ১৪২৪, বুধবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

আধুনিক সন্ত্রাসবাদের ধরন

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫
  • সাব্বির খান

সাকা চৌধুরী এবং মুজাহিদের ফাঁসির আগে বা পরে কোন জঙ্গী হামলা হয়নি বলে বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হয়েছে ভাবার কোন কারণ নেই। সরকারকে অস্থিতিশীল করার জন্য জামায়াত-বিএনপি নিশ্চয়ই বসে থাকবে না। আমরা জানি যে, জামায়াত ও তাদের সহযোগী বিএনপির সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই দল দুটি বিভিন্ন সময় সুবিধামতো বিশ্বের বিভিন্ন সন্ত্রাসী, জঙ্গী-সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করে বাংলাদেশে অরাজকতার চেষ্টা করেছে। তাদের মধ্যে আইএস, আল কায়েদা, ব্রাদারহুড, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, জেএমবি, হিযবুত তাহ্রী ছাড়া আরও বেশ কিছু জঙ্গী-মৌলবাদী সংগঠন উল্লেখযোগ্য।

আদর্শগতভাবে আন্তর্জাতিক ইসলামিক জঙ্গী-সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কও ভিন্নতর। আল কায়েদা এবং আইএস বড় সংগঠন হলেও আদর্শগতভাবে পরস্পরের শত্রু হিসেবেই পরিচিত। সিরিয়াতে আইসিস ও আল কায়েদা ছাড়াও সিরিয়া, মিসর, ইরাক ও তুর্কীর সীমান্তসংলগ্ন বিভিন্ন ছোট ছোট ইসলামী জঙ্গী-সংগঠনগুলোও সিরিয়ায় ক্ষমতাসীন আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই সংগঠনগুলো আবার আদর্শিক ও নীতিগত প্রশ্নে আইসিস ও আল কায়েদাকে আলাদা আলাদাভাবে সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা করে। যার কারণে সিরিয়ার সীমান্তবর্তী দেশগুলোর এ ছোট ছোট জঙ্গী সংগঠন আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করা ছাড়াও পরস্পর পরস্পরের বিরুদ্ধে সমান তালে যুদ্ধরত।

১৫ নবেম্বর গোলান হাইটস নামের একটি পার্বত্য অঞ্চলে আইসিসের উচ্চপর্যায়ের একটা সভা চলাকালীন আল কায়েদার আত্মঘাতী বোমা হামলায় আইসিসের উচ্চপর্যায়ের ৬ নেতা নিহত হন, যার মধ্যে ‘আবু আলী আল বারিদি’ নামের একজন ছিলেন যিনি আন্তর্জাতিক পরিম-লে ‘দ্য আঙ্কেল’ নামে পরিচিত। গোলান হাইটসের দুই-তৃতীয়াংশ ইসরাইল এবং বাকি অংশ সিরিয়া সরকারের অধিকৃত হলেও বর্তমানে তা আইসিস দখল করে নেয়।

বাংলাদেশের মাটিতে জামায়াতের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় এবং স্বার্থে, খুব ছোট আকারে হলেও বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে এই সংগঠনগুলোর নাম শোনা গিয়েছে এবং তারা ব্লগার, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী হত্যাসহ দেশকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে হেন কাজ নেই যে করেনি। সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির সময় সরকারের অসাধারণ পারদর্শিতার কারণে হয়ত এই প্রথমবারের মতো কোন ভয়ঙ্কর কিছু করতে পারেনি। তবে আগামীতে যে-সব ঘটনা এসব জঙ্গীবাদের দ্বারা বাংলাদেশের মাটিতে দেখা দিতে পারে, তার লক্ষণ বা প্যাটার্নগুলো হতে পারে এমনÑ

জামায়াত সুবিধামতো খ- খ-ভাবে এসব সংগঠনের সহযোগিতায় ভিন্ন ভিন্ন হত্যা, গুম এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম বাংলাদেশের মাটিতে ঘটাতে পারে।

এই সংগঠনগুলো নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও পরিধি বিস্তারের লক্ষ্যে নিজেরাই ছোট ছোট সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারে এবং সন্ত্রাসপরবর্তী সে দায় নিজেদের কাঁধে নিয়ে প্রচারের লক্ষ্যে মিডিয়ায় স্থান পেতে পারে টুইটার, মেইল এবং ফেসবুকের মতো বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের দ্বারা, যা আমরা এর আগে বিভিন্ন হত্যাকা-ের পরে দেখেছি।

সাংগঠনিক সক্ষমতা সচল রাখতে এবং অর্থনৈতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য সর্বহারা বা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির অনুকরণে বিভিন্ন জেলা বা স্থানীয় পর্যায়ের গডফাদারদের ফরমায়েশী খাটার নামে বিশাল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই সংগঠনগুলো হত্যা, গুম, ধর্ষণ ও সন্ত্রাসী কাজ করতে পারে। এসব কাজেও দেশ অস্থিতিশীল হবে এবং একটি অনিরাপদ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পাবে, যাতে সরকার বিব্রত হবে।

সন্ত্রাসবাদী এই সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরাজমান অভ্যন্তরীণ শত্রুমনোভাবাপন্নতার কারণে, নিজেদের মধ্যে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ, হানাহানি, শক্তিপ্রদর্শন এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমের কারণে ভূ-রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মহলে সরকারের ভাবমূর্তি প্রচ- মাত্রায় ক্ষুণœ হবে।

আদর্শগতভাবে সন্ত্রাসী এই সংগঠনগুলোর কাজও ভিন্নতর হয়। যেমন আল কায়েদার ছাতা সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ব্লগার হত্যা করার পক্ষে এবং তারা তা করেছেও। সরকারের বাহিনীগুলো স্বভাবতই হত্যাকারীদের ধাওয়া করেছে এবং নির্মূল করার যাবতীয় কাজ করছে। এক্ষেত্রে আল কায়েদা এবং এর সমর্থক ভিন্ন নামের সংগঠনগুলোকে শায়েস্তা করার জন্য আইএস এবং এর ভাবাদর্শীয় জঙ্গী সংগঠনগুলো ব্লগার, প্রকাশক বা লেখক হত্যা করে টুইট, ফেসবুক, মেইল বা ফোনে আল কায়দা বা আনসারুল্লাহর নামে হত্যার দায় স্বীকার করবে। একই কাজ আনসারুল্লাহ বা আল কায়দাও করবে আইএসকে সরকারের গান-পয়েন্টে আনার জন্য। অভ্যন্তরীণ শত্রুতার জের হিসেবে হলেও এসব জঙ্গীবাদের সন্ত্রাসের কারণে মূলত দেশ ও সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে। অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেবে বিএনপি ও জামায়াত এবং বিপাকে পড়বে দেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়নের ধারা।

বিশ্বে বর্তমানে যে রাজনৈতিক মেরুকরণ চলছে, সেখানেও বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর সরব উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ভীতিকর। জঙ্গীবাদ নির্মূলের নামে আরব বিশ্বে যা কিছু হচ্ছে, তা বিশ্বরাজনীতিকে দুইভাগে বিভক্তির সরলীকরণ মাত্র। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ কয়েক যুগ ধরেই বিশ্বের শক্তিধর মোড়ল দেশগুলোর কাছে বেশ লোভনীয় একটা দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জঙ্গীবাদ দমনের একচেটিয়া ঠিকাদারি নেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদেশগুলো বিভিন্নভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ অঞ্চলে তাদের সামরিক উপস্থিতি ঘটাতে। এ কারণে তারা যে কোন উপায়েই হোক বাংলাদেশে দুর্ধর্ষ আইএস ও আল কায়েদার উপস্থিতি প্রার্থনা করছে, যা তাদের স্থানীয় কূটনৈতিক আলোচনা-বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়। উদ্দেশ্য সফল হলে সিরিয়ার মতো জঙ্গী নির্মূলের নামে এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে তাদের কোন অনুমতি লাগবে না এবং প্রক্রিয়াগত কারণে বাংলাদেশে ঘাঁটি গড়তেও শক্তিধর দেশগুলোর কোন অসুবিধা হবে না। সুতরাং তারাও যে এইসব জঙ্গীবাদকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারে, এ সন্দেহ থেকেও বেরিয়ে আসার কোন কারণ নেই। তবে প্রক্রিয়া যা-ই হোক, আখেরে বর্তমান সরকারই বিপাকে পড়বে।

সাকা-মুজাহিদের ফাঁসির পরে পাকিস্তান সরকারের যে ঘৃণ্য প্রতিক্রিয়া বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় ব্যক্ত করেছে, তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার হয় যে, পাকিস্তান সাকা-মুজাহিদের ফাঁসিকে পাকিস্তানের দু’জন নাগরিকের ফাঁসি বলেই মনে করেছে। দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর বিশ্বে সন্ত্রাসবাদ লালনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কথা কারও অজানা নয়। ব্যক্তিগত শত্রুতার দৃষ্টান্তস্বরূপ পাকিস্তান আবারও বিভিন্ন ধরনের ‘২১-আগস্ট’-এর জন্ম দিতে আপ্রাণ চেষ্টা করবে। সেক্ষেত্রে তারা সরাসরি অথবা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা নিতে পারে।

সন্ত্রাসবাদ কোন দেশের জন্য একক কোন সমস্যা নয়। এক সময় ইউরোপীয়রা ভাবত, জঙ্গীবাদের সমস্যা শুধুই আফগানিস্তান, পাকিস্তান বা ক্ষেত্রবিশেষে বাংলাদেশের। কিন্তু কিছুদিন আগে আমরা ফ্রান্সে জঙ্গীবাদের যে ভয়াবহতা দেখেছি, তা দুঃস্বপ্নের সঙ্গে তুলনা করলেও ভুল হবে। দেরিতে হলেও পশ্চিমা গোষ্ঠী আজ হয়ত কিছুটা বুঝতে পারছে, যে সমস্যাটা বৈশ্বিক ভেবে তারা এতদিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, তা আজ তাদের নিজেদের ঘরেই উপস্থিত। জঙ্গী ও মৌলবাদের যে সন্ত্রাসের কালোছায়া, তা আন্তর্জাতিক ঐক্যেই সম্ভব মোকাবেলা করা। তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, যার যার ঘর তার তারই সামলাতে হয়।

বাংলাদেশ সরকারের সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলার ঐকান্তিক প্রচেষ্টার বিষয়টি নিঃসন্দেহে পরীক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট সমাদৃত। তবে এটা ভেবে কোন মতেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলা উচিত হবে না যে, ‘সন্ত্রাসবাদ আমাদের আর কিছুই করতে পারবে না।’ বরং বাংলাদেশে ইতোপূর্বে ঘটিত বিভিন্ন সন্ত্রাস মোকাবেলায় সরকার যে শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা লাভ করেছে, তাকে আরও বেশি মাত্রায় পুঁজি করে আগামীর সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় আরও বেশি সতর্ক অবস্থানে থাকাটাই বিচক্ষণতার পরিচায়ক হবে। এজন্য পুলিশবাহিনীসহ দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী ও সংস্থাকে আরও বেশি মাত্রায় এবং যথাসাধ্য যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ দেয়া ছাড়াও নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অভ্যন্তরীণ সমন্বয়কে আরও অধিকতর গুরুত্বের সঙ্গে ক্রিয়াশীল করতে হবে। সেজন্য তৈরি করতে হবে এমন এক ‘কেন্দ্রীয় সমন্বয়-সেল’, যার মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে যে কোন ছোট অথবা বড় ধরনের সন্ত্রাসী আক্রমণের আগে, পরে বা মুহূর্তের মধ্যে একযোগে প্রতিহত করা সম্ভব হয়।

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় পর্যায়েও ঢেলে সাজাতে হবে জঙ্গীবাদ প্রতিহতের অনুকূল করে। দেশের জনগণকে করতে হবে অতিমাত্রায় সতর্ক এবং জঙ্গীবাদের ভয়ঙ্করের ব্যাপারে দিতে হবে পর্যায়ক্রমিক তথ্য ও জ্ঞান। যে কোন মাত্রার সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় সরকারের সঙ্গে সরাসরি জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া আধুনিক যুগের সন্ত্রাসবাদ দমন অসম্ভব প্রায়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের বিভিন্ন স্তরগুলো নিশ্চয়ই অবগত আছেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ংধননরৎ.ৎধযসধহ@মসধরষ.পড়স

প্রকাশিত : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৫

১৯/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: