১১ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই ঘন্টায়  
Login   Register        
ADS

প্রিয় নবী (সা.)-এর মহান মর্যাদা


বিশ্ব জগত আল্লাহ জাল্লা শানুহুর কুদরতের এক অপূর্ব নিদর্শন। নূরে মুহম্মদী সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তিনি বিশ্ব জগত সৃষ্টির সূচনা করেন। তিনি প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সৃষ্টি করে তাঁকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর খ্যাতি ও আলোচনাকে সমুন্নত করেছেন। তিনি একমাত্র তাঁকেই নিজের হাবীব অর্থাৎ প্রেমাস্পদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিজের নাম মুবারকের পার্শ্বে তাঁর হাবীবের নাম যুক্ত করেছেন এই ভাবে : লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ। আল্লাহ জাল্লাশানুহু তার হাবীবকে উদ্দেশ করে ইরশাদ করেছেন : আমি কি আপনার বক্ষ আপনার কল্যাণে প্রশস্ত করে দেইনি? আমি আপনার বোঝা দূর করে দিয়েছি এবং আপনার খ্যাতিকে সুমহান মর্যাদায় উন্নীত করেছি (সূরা ইনশিরাহ : আয়াত ১-৪)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন আল্লাহর প্রেমাস্পদ এবং আল্লাহ তাঁর প্রেমিকÑ এমন মহান মর্যাদা আল্লাহ জাল্লা শানুহু কেবল তাঁকেই দিয়েছেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করেন, ফেরেশতারাও তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করেন এবং মু’মিনদের আল্লাহ তা’আলা দরূদ পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে : নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরূদ পাঠ করেন। হে মু’মিনগণ, তোমরাও তার প্রতি দরূদ পাঠ করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও (সূরা আহযাব : আয়াত ৫৬)।

এই বিশ্বচরাচর সৃষ্টির পটভূমি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আল্লাহ জাল্লাশানুহু প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের খাতিরেই বিরাট বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন এবং একে করেছেন সুশোভিত ও সুসজ্জিত। আল্লাহ হচ্ছে রব্বুল ‘আলামীন অর্থাৎ বিশ্ব জগতের রব আর তাঁর হাবীব হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে তিনি করেছেন রহমাতুল্লিল আলামীনÑ বিশ্ব জগতের জন্য রহমত। এর মধ্যেই প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুমহান মর্যাদা নিহিত রয়েছে। রউফুর রহীম আল্লাহর দু’খানি মুবারক গুণবাচক নাম। আল্লাহ তার এই দুটি গুণবাচক নামে তাঁর হাবীবকেও পরিচিত করেছেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের মধ্যে থেকে তোমাদের নিকট এক রসূল এসেছেন। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তাঁর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মু’মিনদের প্রতি তিনি রউফুর রহীম-দরার্দ্র পরম দয়ালু। (সূরা তওবা : আয়াত ১২৮)।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হযরত আদম ‘আলায়হিস সালামের বহু পূর্বে উর্ধ জগতে নবুওয়তের অভিষেকে অভিষিক্ত হন। আল্লাহ জাল্লাশানুহু তাঁরই মাধ্যমে নবুওয়তের দীর্ঘ ধারাবাহিকতার সূচনা করেন এবং তার দ্বারাই পৃথিবীতে নবী আগমন ধারার সমাপ্তি ঘটান। তিনিই সর্বপ্রথম এবং তিনিই সর্বশেষ। তিনি সাইয়েদুল মুরসালীন আবার তিনিই খাতামুন্নাবীয়ীন। তিনি বলেছেন, আমি রসূলগণের ভূমিকা, আমি নবীদের উপসংহারÑ এতে আমার কোনো ফখর (অহংকার) নেই।

প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মাধ্যমেই আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দীন আল ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমরা জানি প্রিয়নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে ইসলাম প্রচার করতে যেয়ে যারপরনাই জুলুম, নির্যাতন নিপীড়ন সইতে হয়েছে। তাঁর প্রাণনাশেরও চেষ্টা করা হয়েছে বহুবার। তিনি এক পর্যায়ে আল্লাহর নির্দেশে মক্কা মুয়াজ্জমা থেকে মদীনা মনওয়ারায় হিজরত করেন। এখানে গড়ে তুলেছেন এক আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র। কিন্তু শত্রুরা বসে থাকেনি। মক্কার কাফির-মুশরিকরা মদীনায় ইয়াহুদী ও মুনাফিকদের সঙ্গে জোট বেঁধে মদিনাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে। যুদ্ধের পর যুদ্ধ হয়েছে। সব যুদ্ধই ছিল শত্রু বাহিনীর আক্রমণকে প্রতিহত করার। সব যুদ্ধে শত্রুবাহিনী পরাজিত হয়েছে। অতঃপর মক্কা বিজয় হয়েছে। ঘোষিত হয়েছে : সত্য সমাগত, মিথ্যা দূরীভূত, নিশ্চয়ই মিথ্যা দূর হবার।

৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ৯ জিলহজ্জ ইন্তিকালের মাত্র ৯০ দিন পূর্বে তিনি হজ্ব করতে এসেছেন প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে। বিদায় হজ্জ নামে পরিচিত এই হজ্জকে হুজ্জাতুল ইসলাম, হুজ্জাতুল বালাগ নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি সেদিন আরাফাত ময়দানের সেই বিশাল জনতাকে উদ্দেশ করে যে ভাষণ দেন তা বিদায় হজ্বের ভাষণ বা খুতবা নামে পরিচিত। এই খুতবায় তিনি বললেন : আজ আমার পায়ের তলায় অন্ধকার যুগের সকল অজ্ঞতা, কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, শিরক, কুফর দলিত-মথিত হলো। তিনি বললেন : আজকের এই দিনটির মতো, এই মাসটির মতো এই জনপদটির মতো তোমাদের একের ধনসম্পদ, মান-উজ্জত, জান-প্রাণ-রক্ত অপরের নিকট পবিত্র।

তিনি সেদিন এই দীর্ঘ ভাষণ শেষে সবাইকে আল বিদা জানান। আর তখন নাযিল হয় : আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম, আমার সব নিয়ামত তোমাদের ওপর সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে সানন্দে অনুমোদন দান করলাম (সূরা মায়িদা : আয়াত ৩)।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু তাঁর প্রিয় হাবীবের আলোচনাকে সমুন্নত করেছেন। আল্লাহ ছিলেন এক গুপ্ত খাজিনা। তিনি প্রকাশ হবার ইরাদা করে প্রথমে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লামের নূর সৃষ্টি করেন। এই নূরই নূরে মুহম্মদী। এই নূর থেকেই সৃষ্টি হয়েছে তাবত মাখলুক। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : হযরত ধাদম (আ.) যখন পানি ও মাটির মধ্যখানে ছিলেন তখন আমি খাতামুন্নাবীয়ীন বা নবীগণের সমাপ্তি হিসেবে বিদ্যমান ছিলাম।

একজন সাহাবী প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন : ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনাকে কখন নবী করা হয়েছে? উত্তরে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আমার নিকট হতে যখন নবুওয়তের মীসাক (অঙ্গীকার) নেয়া হয় তখন আদম রূহ ও দেহের মধ্যখানে ছিলেন। হযরত ইবরাহীম ‘আলায়হিস সালাম ও হযরত ইসমাঈল আলায়হিস সালাম আল্লাহর নির্দেশে যখন কা’বা ঘরের দেয়াল তুলছিলেন, তখন আল্লাহ জাল্লাহ শানুহুর দরবারে এই বলে দু’আ করেছিলেন : হে আমাদের রব! আমাদের দু’জনকে তোমার একান্ত অনুগত করো এবং আমাদের বংশধর হতে তোমার এক অনুগত উম্মত করো। আমাদের ইবাদতের নিয়ম-পদ্ধতি দেখিয়ে দাও এবং আমাদের প্রতি ক্ষমাশীল হও। তুমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। হে আমাদের রব! তাদের মধ্যে হতে তাদের নিকট এক রসূল প্রেরণ করো যে তোমার আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করবে, তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদের পবিত্র করবে। তুমি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় (সুরা বাকারা : আয়াত ১২৮-১২৯)।

হযরত ‘ঈসা’ ‘আলায়হিস সালাম বনী ইসরাঈলদের নিকট প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের আবির্ভাব হবার ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন। কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে : আর যখন ঈসা ইবনে মরিয়ম বলেছিলো : হে বনী ইসরাঈল! আমি তোমাদের নিকট আল্লাহর রসূল এবং আমার পূর্ব হতে তোমাদের নিকট যে তওরাত আছে তার আমি সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমদ নামে যে রসূল আাসবেন আমি তাঁর সুসংবাদদাতা (সুরা সাফফ : আয়াত ৬)।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ জাল্লা শানুহু এতই ভালবাসেন যে, তিনি তাঁর নাম ধরে ডাকেননি। কুরআন মজীদে ইয়া আদাম! ইয়া মুসা ইত্যাদিভাবে নবীগণকে সম্বোধন করা হয়েছে সেখানে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করা হয়েছে এভাবেÑইয়া আইয়োহান্নাবী, ইয়া আইয়োহাল মুদদাছছির, ইয়া আইয়োহাল মুযযাম্মিল।

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মহিমা ও গুণ-মাধুর্য জগতজুড়ে সৌরভ বিলিয়ে আসছে। পৃথিবীর নানা ভাষায় তাঁর জীবনচরিত রচিত হয়েছে। বিভিন্ন কালের জ্ঞানী-গুণী মনীষীগণ তাঁর প্রশংসায় মুখরিত হয়েছেন। জে, এইচ ডেনিসন এ্যাজ দ্য বেসিস অব সিভিলাইজেশন গ্রন্থে লিখেন, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে, সভ্য জগত উপনীত হয়েছে নৈরাজ্যের তুঙ্গে, তখন এটাই প্রতীয়মাণ হচ্ছিল যে, চার হাজার বছর ধরে গড়ে ওঠা বিশাল সভ্যতা বিখ-িত হবার চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং মানব জাতি বর্বরতার চরম অবস্থায় যেন ফিরে গিয়েছে, যেখানে প্রতিটা জাতি ও গোত্র পরস্পরের বিরোধী ছিল, আইন-শৃঙ্খলা বলতে কোথাও কিছু ছিল না। খ্রিস্টধর্মের দ্বারা নিত্যনতুন নিয়ম-অনুশাসন ঐক্য ও শৃঙ্খলার বদলে বিভেদ ও ধ্বংসের কাজ করছিল। এই জনগোষ্ঠীর (আরবদের) মধ্যে সেই পুরুষপ্রবর জন্মগ্রহণ করলেন, যিনি পূর্ব ও দক্ষিণের সমগ্র জানা দুনিয়াকে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করবার জন্য আবির্ভূত হলেন।

হিরো এ্যান্ড হিরো ওয়ারশিপ-এ স্যার টমাস কারলাইল লিখেছেন : সে এক মহাপরিবর্তন কি এক দারুণ পরিবর্তন ও প্রগতি সূচিত হলো মানবকুলের বিশ্বজনীন অবস্থায় ও চিন্তায়! আজকের যুগে আল্লাহর বৃহত্তর সংখ্যক মখলুক অন্য যে কোনো বাণীর চেয়ে হযরত মুহম্মদ (সা.) এর বাণী বেশি বিশ্বাস করে। ...আত্মত্যাগ ও আত্মসমর্পণের মধ্যেই ইসলামের অর্থ নিহিত রয়েছে। আমাদের এই পৃথিবীতে নাযিলকৃত আসমানী জ্ঞানের মধ্যে এখন পর্যন্ত এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আরব জাতির জন্য এটা ছিলো অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ! আরব এরই পরশে প্রথমবারের মতো জিন্দা হয়ে উঠলো।

টমাস কারলাইল অন্যত্র বলেন, এক জাতি, তাঁর নাম আরব, একজন মানুষ নাম তাঁর মুহম্মদ (সা.) আর সেই একটা শতাব্দী। এটা কি তাই নয়, যেন একটি স্ফুলিঙ্গ, শুধুমাত্র একটি স্ফুলিঙ্গ পড়ল এমন এক পৃথিবীর উপর, যা দেখে মনে হতো তমশাচ্ছন্ন অজ্ঞাত বালুকণা, কিন্তু দেখো! দেখো! সেই বালুকণা বিস্ফোরিত হলো বারুদের মতো আকাশ সমান আলো করে আর সেই আলোয় আলোকিত হয়ে গেল দিল্লী থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের মর্যাদা সম্পর্কে অমর কবি মাওলানা আবদুর রহমান জামী আরবী-ফারসী মিশানো ছন্দবদ্ধ চার পঙক্তিতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যক্ত করেছেন। সেই সুন্দর পঙক্তিমালার বাংলা অনুবাদ এরূপ : হে সৌন্দর্যের অধিপতি, হে মানবকুলের সরদার। তোমার চেহারার জ্যোতিতে আলোকিত হয়েছে চন্দ্র/আমার কাছে নেই কোন যোগ্য ভাষা তোমরা প্রশংসা করার/সংক্ষিপ্ত সারকথা হলো আল্লাহর পরেই তোমার মর্যাদা।

লেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ,

উপদেষ্টা ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (সা.)

সাবেক পরিচালক ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ