১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

৬৮ বছর পর ওরা প্রথম গেয়ে উঠল- আমার সোনার বাংলা...


জনকণ্ঠ ডেস্ক ॥ দীর্ঘ ৬৮ বছর পর স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে প্রথম মহান বিজয় দিবস উদ্যাপন করল সদ্যবিলুপ্ত ১১১টি ছিটমহলের মানুষ। এই প্রথম তারা স্বাধীন দেশের মাটিতে সমবেত কণ্ঠে গাইলেন জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি...।’ ছোট-বড় সবার হাতে হাতে বাংলাদেশের পতাকা। আর এ অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল সারাবিশ্ব। ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশী নাগরিকরা তাই নেচেগেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। সকাল থেকে রাত অবধি চলে বিভিন্ন আনন্দ অনুষ্ঠান।

বুধবার কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড় ও নীলফামারীর মতো লালমনিরহাটের অভ্যন্তরে ৫৯টি ছিটমহলেও পালিত হয় বিজয় দিবস। দেশের ৪৪তম বিজয়ের এ অনুষ্ঠানে মূল ভূখ-ের মানুষ যোগ দিয়েছে প্রাণের উচ্ছ্বাসে। দিনভর চলে ভূরিভোজের আয়োজন। দাবি ওঠে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন এবং শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণের। খবর স্টাফ রিপোর্টার ও নিজস্ব সংবাদদাতার।

কুড়িগ্রাম ॥ কুড়িগ্রামের দাসিয়ারছড়ায় বুধবার সকাল থেকে আনন্দ উৎসব ও উদ্দীপনায় শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষ হাতে হাতে লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু সেøাগান দিতে দিতে বিজয় দিবসের আনন্দ মিছিলে এসে সমবেত হয়। সকাল ৯টায় দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দেয়ার মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচী শুরু হয়। সাবেক ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গ-সংগঠন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ এলাকাবাসী শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসে। স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় এক মিনিটি নীরবতা পালন এবং দোয়া শেষে বিজয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে এই প্রথম বাংলাদেশীদের সঙ্গে বিজয় দিবস পালন করতে পেরে খুশি দাসিয়ারছড়াবাসী। এর আগে রাত ১২টা ১ মিনিটে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা করে। এছাড়াও দাসিয়ারছড়ার বিভিন্ন গ্রামে শহীদ মিনারে পু®পমাল্য অর্পণ, র‌্যালি, সমাবেশ, মসজিদ-মন্দিরে প্রার্থনা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দাসিয়ারছড়ার শিক্ষার্থী আয়েশা খাতুন ও মনি আক্তার বলেন, এই প্রথম দেশের নাগরিক হিসেবে আমরা বিজয় দিবস পালন করছি। জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন মূহুর্ত এটি মনে হচ্ছে। এ সময় দাসিয়ারছড়ায় একটি স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপনের দাবি জানান শিক্ষার্থীরা।

পঞ্চগড় ॥ বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর মন্ত্রী-এমপিদের সঙ্গে বাংলাদেশী পরিচয়ে প্রথম জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন নাগরিকরা। বুধবার পঞ্চগড় জেলা সদরের বিলুপ্ত গারাতি ছিটমহলের মফিজার রহমান কলেজ মাঠে বিজয় দিবসের এ অনুষ্ঠান টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে সরাসরি দেখল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ। আকাশে বেলুন উড়িয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রথমবারের মতো বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন প্রধান অতিথি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, গ্রামীণফোনের সিইও রাজীব শেঠী, প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইয়াসির রহমানসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন শেষে দেশের বরেণ্য রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ দেশের গান দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এরপরই বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশী নাগরিকরা আমন্ত্রিত অতিথিসহ উপস্থিত হাজারও মানুষের সঙ্গে একযোগে জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি’ গাইতে গাইতে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। সমস্বরে মুখর করা এই কণ্ঠ উপস্থিত দর্শকসহ বাড়িতে বসে উপভোগ করে কোটি বাঙালী। এরপরই শুরু হয় রেজওয়ানা চৌধুরীর বন্যা ও সুরের ধারার শিল্পীদের নিয়ে সমবেত গণসংগীত ও দেশের গান। তাদের গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাচে অংশ নেন চ্যানেল আই নৃত্যশিল্পীরা। বিকেল ৪টার পর পর্যন্ত চলে এ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

নীলফামারী ॥ ৬৮ বছরের বন্দীদশা থেকে মুক্তির পর এবারই প্রথম বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে যাওয়া ডিমলা উপজেলার সদ্যবিলুপ্ত ৪টি ছিটমহলের নতুন বাসিন্দারা ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস মহাধুমধামে পালন করলেন। কনকনে শীত। কুয়াশা ঢাকা চারদিক। কোন কিছুই ওদের ঘরের ভেতর আটকে রাখতে পারেনি। তাই বিলুপ্ত ছিটমহলের ছিল নতুন বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস। জয় বাংলা সেøাগানে মুখরিত ছিল গোটা এলাকা। হাতে হাতে ছোট বড় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। দিবসটি উপলক্ষে জেলার চারটি বিলুপ্ত ছিটমহল ২৮ নম্বর বড়খানকীবাড়ি, ২৯ নম্বর বড়খানকীবাড়ি গীতালদহ, ৩০ নম্বর বড়খানকীবাড়ী খারিজা গীতালদহ, ৩১ নম্বর নগর জিগাবাড়ি ছিটমহলের ১১৯ পরিবারের ৫৪৫ জন বাসিন্দা একত্রিত হয়ে গীতালদহ মাঠে বিজয় দিবস পালন করেছে। সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন নাগরিকরা। এরপর মহান স্বধীনতা যুদ্ধে শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন ও মোনাজাত করা হয় সেখানে। সকাল ১০টার পর থেকে অনুষ্ঠিত হয় শিশুদের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। বিকেলে আলোচনা সভা, বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এখানকার বাসীরা প্রথম বিজয় দিবস পালনে শেখ হাসিনার সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে প্রতিটি বিলুপ্ত ছিটমহলে শহীদ মিনার ও স্মৃতিসৌধ নির্মাণের।

লালমনিরহাট ॥ জেলার ৫৯টি সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলে ৬৮ বছর পর এই প্রথমবারের মতো প্রাণের উচ্ছ্বাসে মহান বিজয় দিবস পালন হয়। ছিটের মানুষ এবারই প্রথম মনেপ্রাণে বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে নিজেদের ভাবতে শুরু করেছে। বুধবার সকাল ১০টায় প্রতিটি ছিটমহলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার করা হয়েছে। নৌকা প্রতীক দিয়ে প্রধান সড়ক সাজানো হয়েছে। বিজয় দিবসকে জাঁকজমকপূর্ণ করতে নানা বয়সী নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর-কিশোরীরা মেতেছিল বিজয় উল্লাসে।

সদর উপজেলার ১৫২ নম্বর ভিতরকুটি (বাঁশপচাই) ছিটমহলে গিয়ে দেখা যায়, সূর্য উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বাঁশপচাই ঈদগাঁ মাঠে কাপড়ের তৈরি অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ বানিয়েছে। সেখানে পুষ্পমাল্য ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। স্মৃতিসৌধের পাশে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বুধবার সকাল ১০টায় বিজয় দিবসের কর্মসূচীর শুভসূচনা করা হয়। অনুষ্ঠানের শুভ সুচনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান। বিজয় দিবসের আনন্দ র‌্যালি ও নানা অনুষ্ঠানের পর দুপুরে প্রীতিভোজেরও আয়োজন করা হয়। একইভাবে হাতীবান্ধার গোতামারী সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলসহ পাটগ্রাম উপজেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহলগুলোতে মহান বিজয় দিবসের কর্মসূচী প্রথমবারের মতো পালিত হয়েছে। এ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান তার মায়ের নামে ভিতরকুটি ছিটমহলে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একটি শহীদ মিনার নির্মাণ ও বিজয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সেখানকার মসজিদ নির্মাণও মসজিদের উন্নয়নে এক লাখ টাকা জেলা পরিষদ হতে অনুদান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: