১৩ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চ্যাম্পিয়ন মাশরাফির কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স


মিথুন আশরাফ ॥ কী উত্তেজনা, কী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কী ¯œায়ুচাপ! দুই দলের মধ্যে যেন অসম যুদ্ধ জয় করার তীব্র আকাক্সক্ষা! এমন ম্যাচই তো দেখার আশায় থাকেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। মঙ্গলবার বিপিএলের ফাইনালে তেমন ম্যাচেরই দেখা মিলল। এমনই একটি ম্যাচ হলো, যেখানে শেষ বলে গিয়ে খেলার নিষ্পত্তি হল্।ে জিততে ১ বলে ১ রানের প্রয়োজন থাকে। ম্যাচ জেতানো অলক কাপালী ১ রান নিয়েই দিলেন দৌড়! মাশরাফি বিন মর্তুজার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। বরিশাল বুলসকে ৩ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিপিএলে অংশ নিয়েই শিরোপা জিতে নিল কুমিল্লা। টানা তিন আসরেই চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক হয়ে থাকলেন মাশরাফি। তিন আসরেই শিরোপা তার হাতেই শোভা পেল।

কুমিল্লার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়েই তৃতীয় আসরের পর্দা নামল। বিসিবির সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন যেই মাশরাফির হাতে চ্যাম্পিয়ন শিরোপা তুলে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে আতশবাজিতে আলোকিত হয়ে উঠল পুরো স্টেডিয়াম।

বরিশালের অধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের প্রতিশোধের ম্যাচ ছিল। দ্বিতীয় আসরে মাশরাফির দলের বিপক্ষে ফাইনালে লড়াই করে যে জিততে পারেননি। এবারও একই ফল হলো। এর আগে মাশরাফি দুইবার ঢাকাকে চ্যাম্পিয়ন করান। এবার কুমিল্লাকে একই স্বাদ এনে দেন। এর আগে দ্বিতীয় আসরে মাহমুদুল্লাহ চিটাগাং কিংসের নেতৃত্ব দিয়ে ফাইনালে মাশরাফির ঢাকার কাছে হারেন। এবার বরিশালের হয়েও হারলেন।

ম্যাচে টস জিতে কুমিল্লা। আগে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। আগে ব্যাটিং করে ৪ উইকেট হারিয়ে ২ওভারে ১৫৬ রান করে বরিশাল। শাহরিয়ার নাফীস ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের ৮১ রানের জুটিতে বড় স্কোর গড়ে বরিশাল। মাহমুদুল্লাহ ৪৮ ও শাহরিয়ার অপরাজিত ৪৪ রান করেন। সেকুগে প্রসন্নর ব্যাট থেকে আসে ৩৩ রান। এ রান অতিক্রম করতে গিয়ে ইমরুল কায়েস ৫৩ ও আহমেদ শেহজাদ ৩০ রান করেন। তবে কাজের কাজটি করেন আসলে অলক কাপালীই। বুড়ো হাড়ে যে কী ভেল্কি দেখালেন! কুমিল্লাকে জিতিয়েই মাঠ ছাড়লেন। ২৮ বলে ৫ টি চার মেরে অপরাজিত ৩৯ রান করেন। শেষ ওভারে জিততে ১৩ রানের দরকার ছিল। তৃতীয় ও চতুর্থ বলে বাউন্ডারি হাঁকানোর পর পঞ্চম বলে ২ রান নিয়ে ম্যাচ সমতায় আনেন। ১৯.৫ ওভারে ১৫৬ রান হয়। আর এক বলে জিততে যে ১ রানের প্রয়োজন থাকে, তাও নিয়ে নেন কাপালী। জয়ের আনন্দে আর কে ছুতে পারে মাশরাফি, ইমরুল, কাপালীদের। আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন কুমিল্লার ক্রিকেটাররা।

একটা সময় যখন ১৩৪ রানে ৬ উইকেটের পতন ঘটে যায়, তখন হারের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। সেই হার থেকে দলকে বাচান কাপালীই। তাই ম্যাচ সেরার পুরস্কারটি কাপালীর হাতে শোভা পায়। শুধু কাপালীই নন, দুই হাত ভরে সব পুরস্কার নিয়ে গেল কুমিল্লা। চ্যাম্পিয়ন হলো। ম্যাচ সেরা হলেন দলটির কাপালী। ‘মোস্ট ভেলুয়েবল প্লেয়ার’ হলেন এবার বিপিএলের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব ঘটা পেসার আবু হায়দার রনি। আবার পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অলরাউন্ডার নৈপুণ্য দেখানোয় ১১ ম্যাচে ৫৩.৭৫ গড়ে ২১৫ রান ও ১৭ উইকেট নেয়া আসহার জাইদি টুর্নামেন্ট সেরা খেলোয়াড়ও হয়ে গেলেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দিয়ে এবারের আসরের পর্দা উঠেছিল ২০ নবেম্বর। ২২ নবেম্বর থেকে খেলা শুরু হয়েছিল। ৬ দল এতে অংশ নেয়। লীগ পর্বেই চিটাগাং ভাইকিংস ও সিলেট সুপার স্টারস বিদায় নেয়। এরপর শেষ চার থেকে বিদায় নেয় ঢাকা ডায়নামাইটস ও রংপুর রাইডার্স। শেষে দুটি দল থাকে। কুমিল্লা ও বরিশাল ফাইনালে খেলে। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে কুমিল্লার জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ হয়। এবার বিপিএলে হয় ৩৪ ম্যাচ। ২৬ দিনের এ টুর্নামেন্টের যবনিকাপাত অবশেষে ঘটেছে।

এ বিপিএলে অনেক ঘটনাই ঘটে। একটি ম্যাচে ৩২ বলে অপরাজিত ৫৪ রান করে দলকে জিতিয়ে মাশরাফি ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠেন। উচ্চৈস্বরে সেঞ্চুরির ঘোষণা দিয়েও তা না করতে পেরেই মাঝপথে বিপিএল ছেড়ে বিগব্যাশ খেলতে গেইলের চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সব মিলিয়ে ১৭টি ম্যাচেই ২০ ওভারে গিয়ে খেলা শেষ হওয়ার রোমাঞ্চ যুক্ত হয়েছে। পেসার আবু হায়দার রনি বিপিএলের মাধ্যমেই আবির্ভাব ঘটেছে। ফাইনালের আগে সর্বোচ্চ ২১ উইকেট নিয়েছেন রনি।

বিপিএল খেলে সন্তুষ্ট হয়ে বাংলাদেশ ছেড়েছেন ঢাকা ডায়নামাইটসের হয়ে খেলা শ্রীলঙ্কার কুমার সাঙ্গাকারা ও সিলেট সুপার স্টারসের হয়ে খেলা শহীদ আফ্রিদি। দুইজনই টুর্নামেন্টে মুগ্ধ হয়েছেন। সাদামাটা একটি দল নিয়ে যে মাশরাফির ছোঁয়ায় ফাইনালে খেলেছে কুমিল্লা, তা সবাইকেই মুগ্ধ করেছে। তবে হতাশার একটি বিষয়ও আছে। সাকিব যে এবার মাত্র ১৩৬ রান ও ১৮ উইকেট নিতে পেরেছেন। দুই আসরের টুর্নামেন্ট সেরা এ বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার এবার আহামরি নৈপুণ্য দেখাতে পারেননি। চিটাগাং ভাইকিংসের পেসার মোহাম্মদ আমিরের জন্য বিপিএলই খেলতে আসবেন না বলে সেই সুর তুলেছিলেন পাকিস্তানের মোহাম্মদ হাফিজ, তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তবে হাফিজ-আমির যুদ্ধে হাফিজকে আউট করে দিয়ে জেতেন আমিরই।

বিপিএলে দেশি আম্পায়ারই বেশি থাকে। ভুলও চোখে ধরা পড়ে। তা নিয়ে সমালোচনাও হয়। প্রশ্নও জাগে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয়, বিপিএল সুন্দর, সুষ্ঠুভাবে হয়ে যাওয়ায় একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেল, যা ক্রিকেট বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তা হল, ক্রিকেট খেলার জন্য বাংলাদেশ নিরাপদ। এবার বিপিএলে জিমন্যাস্টের মত অঙ্গভঙ্গি করে যেভাবে সাব্বিরের ক্যাচটি দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে ধরেছিলেন রংপুরের মোহাম্মদ সামি, তা ইতিহাসেরই সেরা ক্যাচ হিসেবে আখ্যা পেতে পারে। আগের আসরে যেমনটি হয়েছিল, মাশরাফি ও মাহমুদুল্লাহ ফাইনালে নেতৃত্ব দেন। এবারও তাই হয়েছে। শুধু দুইজনেরই দল পরিবর্তন হয়েছে। আগের আসরে ঢাকার হয়ে মাশরাফি ও চিটাগাংয়ের হয়ে মাহমুদুল্লাহ নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবার কুমিল্লার হয়ে মাশরাফি ও বরিশালের হয়ে মাহমুদুল্লাহ নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এবার বিপিএল ২০১১ সালে বাংলাদেশ যে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে ৫৮ রানে অলআউট হয়েছিল, সেই স্মৃতি তুলে আনে। বরিশাল ৫৮ রানে অলআউট হয়ে যায়। মিরপুরেই আবার এমন ঘটনার ধরা পড়ে। তিলকারতেœ দিলশান বিশ্বের সেরা ক্রিকেটারদের একজন। কিন্তু চিটাগাং ভাইকিংসের এ অলরাউন্ডার কুমিল্লার বিপক্ষে ম্যাচে যে ইমরুল কায়েসকে ল্যাং মেরে রান আউট করতে চেয়েছেন, তাতে সম্মানিত দিলশান খানিক অসম্মানিতই হয়েছেন। বিপিএলের এবার একমাত্র সেঞ্চুরিয়ান হয়ে আছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের এভিন লুইস। বরিশালের এ ওপেনার ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ৬৫ বলে অপরাজিত ১০১ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেছেন। চমৎকার একটি ঘটনাও ঘটেছে। চিটাগাং হারতেই আছে। এমন মুহূর্তে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ শেষে উমর আকমল ঢাকায় আসেন। তাকে ৮০ হাজার টাকা খরচ করে হেলিকপ্টারে করে ম্যাচের আগে চট্টগ্রামে নেয়া হয়। কিন্তু রান করেন মাত্র ১!

চট্টগ্রামে চিটাগাং ভাইকিংস ও বরিশাল বুলসের বিপক্ষে ম্যাচে ম্যাচ গড়াপেটার সন্দেহ যুক্ত হয়। এলটন চিগুম্বুরা এক ওভারে ৯ বল করাতেই এ সন্দেহ যোগ হয়। কিন্তু তামিম সেই সন্দেহ উড়িয়ে দেন। বিপিএলে এবার ক্রিকেটারকে গালাগালি করার নজিরও ঘটে। ঢাকায় সিলেট-চিটাগাংয়ের ম্যাচে সিলেটের বিদেশি ক্রিকেটারের অনাপত্তিপত্র নিয়ে ঝামেলা হওয়ায় টস দেরিতে হয়। ম্যাচও দেরিতে শুরু হয়। এ ম্যাচে তামিম ইকবালকে গালাগালিও নাকি করেন সিলেটের মালিক! যে সাকিব আল হাসান হচ্ছেন এখন তরুণ প্রজন্মের আইডল। সেই সাকিব আবারও এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হন। আম্পায়ারের সঙ্গে চোখরাঙিয়ে দুর্ব্যবহার করায় এক ম্যাচ নিষিদ্ধ হন সাকিব।

এবার বিপিএলে একটি হ্যাটট্রিকই হয়। সেটি করেন আল আমিন হোসেন। সিলেটের বিপক্ষে ম্যাচে বরিশালের আল আমিন হ্যাটট্রিক করেন। টি২০ ক্রিকেট মানেই ধুন্ধুমার ব্যাটিং। মারমুখি ব্যাটিং। অথচ রানই যেন চোখে পড়েনি। তবে তিলকারত্মে দিলশানের বলে দিলশান মুনাভিরা এক কা- ঘটিয়েছেন। টানা ৬ বলে ছয় ৪ হাঁকিয়েছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হৃতিক রোশানের পারফর্ম দিয়ে বিপিএলের তৃতীয় আসরের পর্দা উঠেছিল। পুরো মিরপুর স্টেডিয়াম মাতোয়ারা হয়ে উঠেছিল। কুমিল্লার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই বিপিএলের পর্দা নামল মঙ্গলবার।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: