২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

সেইসব দিনরাত্রি


সব যে ঠিকঠাক চলছিল, এ রকম কথা বলা যায় না। ভেতরে দিনে দিনে একটা পুঞ্জীভূত আক্রোশ ক্রমশ জমে উঠেছিল। দেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, এখন সংসদ বসবে। কিন্তু এরই মাঝে জটিলতা শুরু হয়ে গেল। মানুষের ভেতর অনিশ্চয়তা দানা বাঁধতে লাগল। ক্ষমতা হস্তান্তর হবে কিনা এ বিষয়ে সংশয় দেখা দিল।

১লা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগের বাংলা নাটক বনফুল রচিত কবি মধুসূদন দত্ত মঞ্চস্থ হওয়ার কথা টি.এস.সি.তে। এদিকে ঢাকা স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ম্যাচ চলছে।

আমরা মেকআপ নিয়ে প্রস্তুত। কিছুক্ষণ পর নাটক শুরু হবে। কিন্তু অডিটরিয়ামে তেমন দর্শক সমাগম হয়নি। কোথায় যেন একটা ম্লান ছায়া বিরাজ করছে।

আমরা তো মঞ্চের আড়ালে, বাইরে যে এক ভয়ঙ্কর নাটক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে তা কি করে জানব?

আমি তখন দ্বিতীয় বর্ষ অনার্সের ছাত্র, ইংরেজী বিভাগে। হঠাৎ রেডিওতে ঘোষণা দেয়া হলো, ক্রিকেট খেলা বন্ধ। আমরা স্তম্ভিত। খুব দ্রুত ঘটনা ঘটে চলেছে। তার পরের ইতিহাস সবার জানা। ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। বঙ্গবন্ধু কি স্বাধীনতার কথা বলবেন? সবার মনে সংশয়, সভার মনে অনিশ্চয়তা।

৭ই মার্চের পর অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়ে গেল সারা দেশে। গোলটেবিল বৈঠক হলো বেশ কয়েকবার। এদিকে চার ছাত্রনেতা আন্দোলনকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গেলেন। চারদিকে জনগণের এতদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ফেটে পড়তে লাগল। সারাদেশে এলোমেলো হাওয়া বইতে লাগল।

২৫ মার্চ মধ্যরাতে গোলাগুলির আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠে দেখি পশ্চিম আকাশ লাল হয়ে আছে। আর ক্রমাগত কামানের আওয়াজ। আমি তখন পুরনো ঢাকার নারিন্দায় থাকি। ভোরবেলা শুনলাম কারফিউ দেয়া হয়েছে। ঘরে বসে সারাটাদিন কাটল। পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক শক্তি হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে সারাদেশে। উড়ো খবর আসতে লাগল। ইংরেজী বিভাগে আমার শিক্ষক রাশিদুল হাসানকে মেরে ফেলা হয়েছে। ক’দিন আগে তিনি আমার কাছ থেকে কবিতা চেয়ে নিয়েছেন। কলকাতার ‘গঙ্গোত্রী’ সাহিত্য ত্রৈমাসিকে ছাপাতে দেবেন। আমি এর আগে জীবনে কখনও, কোনদিন কবিতা লিখিনি। তিনি আমাকে অভয় দিয়ে বললেন, ‘তুমি তো ইংরেজী সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে শেলী-বায়রন-কীটস পড়েছো। এদের কবিতাকে মডেল রেখে একটি নাতিদীর্ঘ কবিতা লিখে ফেলো। সময় খুব কম।’ আমি স্যারের নির্দেশমতো কবিতা লিখে সময়মতো তার হাতে মার্চের প্রথম সপ্তাহে দিয়েছিলাম। খবরটা শুনে আমার কান্না পেলো। আমি তার খোঁজ নিতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লাম।

সেদিন ২৭ মার্চ, ১৯৭১। কয়েক ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়েছে। রাস্তায় তেমন একটা পাহারা নেই। বিচ্ছিন্নভাবে দু’একজন সৈনিক প্রধান সড়কে অবস্থান করছে। কী এক আবেগ, কী এক ঘোরের ভেতর, আমি মেডিক্যালের কাছে চলে এলাম। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। শিক্ষকদের আস্তানা। প্রথমে ইংরেজী বিভাগের আরেক শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার কথা মনে পড়লো।

তিনি তখন মেডিক্যালের কাছে শিক্ষক-কোয়ার্টারে থাকেন। তার বাসায় এর আগেও বেশ ক’বার গেছি। তার একমাত্র মেয়ে মেঘলাগুহ ঠাকুরতা তখন বারান্দায় হারমোনিয়ামে গান অনুশীলন করতো। স্যার কফি খেতে খেতে আমাকে বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিচারণ করতেন। তখন ছিল সেই সময়, আমাদের দেশে বিরাজ করছিল সেই অন্ধকার সময়, যখন কলকাতার বই এদেশে আসত না। এখনকার মতো অবারিত ছিল না সীমান্ত। স্যার আমাকে বুদ্ধদেব বসুর ঢাকার উপর লেখা ‘গোলাপ কেন কালো’ উপন্যাসটি পড়তে দিয়েছিলেন, মনে পড়ে। তার ঘর নিচতলায় ছিল। সেখানটায় অন্ধকার। দরজায় তালা। নিচে পড়ে আছে মানুষের রক্ত। আমি চমকে উঠলাম। ভয়ে শরীর কাঁপতে লাগল। আশপাশে কেউ নেই। গাছপালায় অন্যদিনের মতো পাখি ডাকছে না। কী রকম একটা ম্লানছায়া মুখ থুবড়ে পড়ে আছে চারদিকে। ডিসেম্বরের আকাশ মুখ গোমড়া করে আছে। আমার আর কিছু মনে নেই। আমি দ্রুত চলে এলাম। বিকেল মড়ে যাচ্ছে। আলো নিভে আসছে ক্রমশ।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আর যাওয়া হলো না। তখন আমাকে ভয় পেয়ে বসেছে। ফিরে যেতে হবে অনেক দূরে। সেই পুরনো ঢাকার নারিন্দায়। হেঁটে। বাস চলছে না। রিক্সা নেই। দু’একটি কদাচিৎ চোখে পড়ছে। কী ভয়াবহ পরিবেশ। আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। আমার উপলব্ধিতে কিছুই ধরা পড়েনি।

দ্রুত হাঁটতে লাগলাম। একটা রিক্সা পেয়ে গেলাম। লোকজন ছুটছে। কারণ কিছুক্ষণের মাঝে আবার কারফিউ শুরু হবে। জলপাই রং-এর মিলিটারি ভ্যান পাহারা দিতে থাকবে। সৈনিকরা সড়ক অবরোধ করবে। রিক্সা দ্রুত ছুটছে।

কোন রকমে ফিরে এলাম। দাদা উদ্বিগ্ন। দাদি শঙ্কিত। আমি ও আমার ছোটভাই তখন দাদা-দাদির তত্ত্বাবধানে থাকি। বাবার সরকারী চাকরি, ঢাকার বাইরে। দাদা বললেন, ‘তোমার তো সাহস কম না। আজও আর্মি রেইড হবে। তুমি গ্রামে পালিয়ে যাও। শহরে থাকা তোমার নিরাপদ নয়।’

রাতটা কাটল কোন রকমে। পরদিন ভোর হতেই আমার এক প্রতিবেশী বন্ধুর সঙ্গে ঢাকার বাইরে মাতুয়াইলে আশ্রয় নিলাম। আবার খবর এলো সেখানেও নিরাপদ নয়। সৈনিকরা ‘মুক্তিবাহিনী’ সন্দেহে যুবকদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আবার জায়গা বদল। এভাবে ছন্নছাড়ার মতো ঘুরতে হলো এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে। তারপর এক সময় আমার নিজগ্রাম বিক্রমপুরে এসে আশ্রয় নিলাম। সেখানেও নিরাপত্তা নেই। সেখান থেকেও লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে। কোথায় যাই, কি করি, কিছুই বুঝতে পারছি না। হঠাৎ সবাই বলতে লাগল, সৈন্যরা আক্রমণ করবে আমাদের গ্রাম। আমরা খড়ের গাদার ভেতর লুকিয়ে রইলাম। এভাবে কাটল সারা রাত। তখন সেলফোন ছিল না। যোগাযোগ নেটওয়ার্ক আজকের মতো ছিল না। দাদা লোকমারফত খবর পাঠালেন নারিন্দায় ফিরে যেতে। সেখানে নারিন্দার পীর সাহেব সবাইকে আশ্বাস দিয়েছেন কিছু হবে না। সেদিনই ফিরে গেলাম। বাসায় ফিরে দেখি ছফা ভাই, আহমেদ ছফা ভাই, পুরোপুরি বিধ্বস্ত, চোখেমুখে কিরকম শঙ্কা ও উদ্বিগ্নতা। দাদার সঙ্গে কী এক জটিল বিষয় নিয়ে খুব মগ্ন হয়ে কথা বলছেন। আমি এলে ড্রইংরুমে গেলেন। তার হাতে একটি বিবর্ণ-মলিন মানচিত্র। বললেন, ‘চলো আমরা কলকাতা যাই। এদেশ নিরাপদ নয়।’

টেবিলের উপর পুরো মানচিত্রটা বিছানো। তিনি খুব মগ্ন হয়ে কলকাতা যাওয়ার রুট দেখছেন। পরিকল্পনা আঁকছেন। আমি দাদার কথা ভাবছি। দাদা অসুস্থ। তাকে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারি না। ছফা ভাই রাষ্ট্র সম্পর্কে ভারি ভারি সব কথা বলে যাচ্ছেন। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমার মনে পড়ছে আমার প্রিয় শিক্ষক জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, রাশিদুল হাসানের কথা। গুহ ঠাকুরতা স্যারের বইটা এ জীবনে আর ফেরত দেয়া হলো না।