১৪ ডিসেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ২ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

একান্ত আলাপচারিতায় শেখ রেহানা ॥ মা পাকিস্তানি পতাকাটা ছিঁড়ে পায়ের তলায় দললেন


আপনার ছোটবেলাটা এক ঝলক দেখে নিলে কেমন হয়?

শেখ রেহানা : ছোটবেলায় আমি নাচতে ভালবাসতাম। কাগজে ছবিটবিও ছাপা হয়েছে সে সময়। আর খেলাধুলাও। পারি আর না পারি, দৌড় একটা দিতাম। আর কামাল ভাইয়ের কাছাকাছি থাকতে ভালবাসতাম। ওঁরা যখন খেলতেন, আমি হতাম ওদের ‘ব্যাটসম্যান’। বল কুড়িয়ে দিতাম ছুটে ছুটে। যখন আরও বড় হয়েছি মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি জামাল ভাই আর ফরিদা আপা খবরের কাগজের কাটিং জমাতাম। একটা বোর্ড বানিয়েছিলাম আমরা। বোর্ডের একেবারে ওপরে জয়বাংলা, আর তারিখ লেখা হতো। সেখানে থাকত সারাদিন কটা মিছিল এসেছে তার হিসাব। মিছিলে কী কী স্লোগান দেয়া হয়েছে, তাও লেখা হতো। মিছিল থেকে কেউ এসেও কিছু লিখে দিয়ে যেতেন। তোফায়েল ভাই, মনি ভাই, রাজ্জাক ভাই, এরাও সেই বোর্ডের অন্যতম লিখিয়ে ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর অমর ৭ মার্চের ভাষণের কথা বলছি। সেদিন বঙ্গবন্ধু কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন?

শেখ রেহানা : ‘দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেলাম। খাওয়া শেষ হলে মা-বাবার হাত ধরে টেনে ঘরের ভেতর নিয়ে গেলেন। বললেন, ‘৫ মিনিট একটু চোখ বুজে বিশ্রাম নাও।’ মা মোড়া টেনে বসলেন মাথার এক পাশে। অন্য পাশে আমি। মা বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘দেখো তোমার সামনে জনগণ, পেছনে বন্দুক। সারাদেশের মানুষ তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। ওদের তো তোমার চেয়ে ভাল কেউ বাসে না। তাই ভেতর থেকে যা আসবে, তাই বলবে।’ বিশ্রাম শেষে বাবা চা পান করে কাপড়-চোপড় পরে আমাদের কপালে চুমু খেয়ে বললেন, আসি।’

আর ইতিহাস গড়লেন। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে যখন বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানীরা গ্রেফতার করল, আপনি কি বাড়িতেই ছিলেন?

শেখ রেহানা : না। কিছুদিন আগেই দুলাভাই একটা বাসা ভাড়া নেন। বাড়িতে হামলা হবে ভেবে বাবা হাসু’পা, দুলাভাইসহ আমাকেও সেখানে পাঠিয়ে দেন। পরদিন বড় ভাইয়ের বন্ধু ওমর ভাই সে বাড়িতে এসে আমাদের জানান যে, বাবাকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে। মা, জামাল ভাই আর রাসেল পাশের ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে।

যুদ্ধের ন’মাস আপনারা কীভাবে যে কাটিয়েছেন সেটা ভাবাও যায় না। ছোট্ট করে যদি একটু বলেন।

শেখ রেহানা : আশ্রয় পাওয়াই তখন ছিল প্রধান সমস্যা। সবারই তো জীবনের মায়া আছে। শেষমেশ যেখান থেকে আমাদের গ্রেফতার করা হয় সে বাড়িটা হচ্ছে মগবাজার বড় রাস্তায় একটা পেট্রোলপাম্পের পেছনে। ওরা কেবল মা, রাসেল আর আমাকে নেবে জানিয়েছিল। মা তখন বললেন, ‘আমি কাউকে ফেলে যাব না।’ শেষে ওরা সবাইকে নিতে রাজি হলো। মা এরপর নিচে নেমে গেলেন। চারদিকে তখন পাক-আর্মির ভয়ে সবাই দরজা-জানালা বন্ধ করে দিয়েছে। তিনি সেসব ঘরের জানালার করাঘাত করে করে বললেন, ‘ভাই, আপনারা শোনেন, আমি বেগম মুজিব, পাকিস্তানী আর্মি আমাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের যদি মেরে ফেলে আপনারা সাক্ষী থাকবেন।’

এরপর তো ধানম-ির ১৮ নম্বরে।

শেখ রেহানা : যুদ্ধের বাকি সময়টা ওখানেই কাটে আমাদের। নানাভাবে সবার সঙ্গে যোগাযোগ হতে থাকে ওই বাড়িতে। বড় ভাই, মনি ভাই, সবাই এ বাড়িতেই যোগাযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে। জয় পিজিতে জন্ম নিয়ে এই বাড়িতে আসে। জামাল ভাইও পালিয়ে যান এই বাড়ি থেকে।

অনেক ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল বাড়িটা। জানতে চাইছি জয় নামটা কে রাখেন?

শেখ রেহানা : বাবা বলেছিলেন আপার ছেলে হলে জয় আর মেয়ে হলে মুক্তি নাম রাখতে। মা বললেন, ‘ও আমাদের সজীব করেছে।’ ওর বাবার নাম ওয়াজেদ, সব মিলিয়ে ছেলের নাম রাখা হলো সজীব ওয়াজেদ জয়।

মুক্তিযুদ্ধে অনেক শিশু -কিশোর অংশ নিয়েছে। আমার মনে হয় শিশু মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর রাসেল সব চেয়ে ছোট। একটু বলবেন সে কাহিনী?

শেখ রেহানা : মে মাসে টুঙ্গিপাড়ায় বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাক আর্মি। দাদা-দাদির চোখের সামনে। এ গ্রাম ও গ্রাম করে অক্টোবরের দিকে ওঁরা আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। ওঁরা তখন খুব অসুস্থ হয়েও পড়েছিলেন। মা আমাদের কাছে রাখতে চাইলেন, ওরা রাজি হলো না। তখন তিনি ড. নুরুল ইসলামের কাছে চিঠি লিখে খোকা চাচাকে তার কাছে পাঠালেন, ‘আমার শ্বশুর-শাশুড়ি অসুস্থ। ওঁদের পিজিতে ভর্তি করে নিলে ভাল হয়।’ তিনি ব্যবস্থা করলেন। আমাদের সপ্তাহে ২/৩ দিন ১ ঘণ্টা করে দেখতে যাবার অনুমতি দিল কর্তৃপক্ষ। মুক্তিযোদ্ধা ছেলেদেরও আনাগোনা শুরু হয়ে গেল। ‘ওরা ছেলে-নার্স সেজে, ডাক্তার সেজে দেখা করতে আসতেন। আমরা অস্ত্র লুকিয়ে রাখতাম দাদার শয্যার নিচে। তিনি কিছুই টের পেতেন না। সেগুলো আবার যথাস্থানে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব থাকত আমার আর রাসেলের। ফলের ঝুড়ির ভেতর বা বেড প্যানের ভেতর অথবা ওষুধের ঝুড়িতে করে অস্ত্র পাচার করতাম আমি আর রাসেল। সিকিউরিটি বসে থাকত, কখনও সন্দেহ করেনি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার মুহূর্তটি কেমন ছিল আপনাদের?

শেখ রেহানা : ডিসেম্বরের ৩ তারিখে শুরু হলো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। তারপর দেখতে দেখতে ডিসেম্বরের ১৬। চারদিকে শুধু ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি। কিন্তু প্রহরীরা আমাদের বেরুতে দিচ্ছে না, ওরা সারেন্ডার করবে না বলছে। রেডিওতে বলছিল বিকেলে পাকিস্তানী আর্মি আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু আমাদের জীবন তখন আরও বিপন্ন। কেউ তো আসছেই না উদ্ধার করতে, ওরা এখন যে কোন সময় আমাদের মেরে ফেলতে পারে। আমরা বুঝতে পারছিলাম যে কোন সময় ওরা এসে আমাদের মেরে ফেলবে। সকাল ৮টার দিকে দেখা গেল চারদিকে একসঙ্গে মাথা তুলছে সবুজ রঙের হেলমেট। সবুজ হেলমেট ছিল ভারতীয় আর্মির। তাদের অফিসার বললেন, ‘কাল তোমাদের নেতা আত্মসমর্পণ করেছে। আমাদের কাছে দেখ কোন অস্ত্র নেই। তোমরাও অস্ত্র সমর্পণ কর। হাতিয়ার ডাল দাও।’ ওরা বলল ‘আমাদের এক ঘণ্টা সময় দাও।’ সে কথা শুনে ইন্ডিয়ান আর্মি চলে যাচ্ছিল। মা তখন ভেতর থেকে তাকে ডেকে বললেন, ‘সময় দিও না, ওরা আমাদের মেরে ফেলবে।’ সে কথা শুনে অফিসারটি বললেন, ‘ঠিক আছে তোমরা সময় নিতে চাও নাও। তবে আমিও এখানেই থাকছি।’ খানিক পরে হাজী চাচাও রেডক্রসের সবাইকে নিয়ে এসে হাজির। ট্রেঞ্চের গুলোও বেরুল, কয়েকটা তো মাটিতে পড়ে অজ্ঞান। মা তখন এক ঝটকায় বাইরে বেরিয়ে এসে পাকিস্তানের পতাকাটা টান দিয়ে ছিঁড়ে পায়ের তলায় দললেন। মা’কে তখন চেনা যাচ্ছিল না। ফর্সা মুখটা লাল টকটক করছে রাগে, ঘৃণায়। একজন এসে মা’কে স্যালুট করে বললেন, ‘আমি মেজর অশোক তারা, আপনাদের উদ্ধারের দায়িত্ব আমার ওপর ছিল।’

এরপর বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরার পালা।

শেখ রেহানা : জানুয়ারির ৮ তারিখ বিবিসি থেকে খবর পাওয়া গেল বাবা ছাড়া পেয়েছেন। লন্ডনে ফোন লাগানো হলো। সবাই ফোনের সামনে। প্রথমে মা, তারপর বাড়ির আর সবাই। তিনি সবাইকে বললেন, ‘আমি তাড়াতাড়ি আসছি।’ কথা তেমন হয়নি। কান্নাই ছিল তখন কথা। ১০ তারিখ বাবা দেশে ফিরলেন। এসেই সরাসরি জনসভায়। সব সেরে তিনি যখন বাসায় এলেন সে এক মহালগ্ন। মা বাবাকে আঁকড়ে ধরলেন। বাবা জয়’কে দেখলেন। তাঁর মুখে কোন কথা ছিল না, কেবল কান্না ছিল।

আর ছিল দেশ গড়ার স্বপ্ন। মাত্র তিনটি বছর। ’৭৫-এ আপনার জার্মানি যাওয়ার পটভূমি কি ছিল?

শেখ রেহানা : দুলাভাই ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেলোশিপ করছিলেন। আপার পাঁচ বছরের জয়, আর ছোট্ট পুতুলকে নিয়ে যাওয়ার কথা। আমার সামনে তখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা। আপা বললেন, ‘নিরিবিলি পড়তে পারবি ওখানে গেলে। আর কত কী দেখবি, কত কিছু কিনে দেব, প্যারিস নিয়ে যাব। ইউরোপ ঘুরে দেখতে পারবি গাড়িতে।’ আমারও লোভ হলো।

এখান থেকে তো কথা হয়েছিল মা-বাবার সঙ্গে।

শেখ রেহানা : সেদিন ফোনে মা খুব কান্নাকাটি করছিলেন। তিনি আমাকে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘ওরে, ফিরে আয়।’ আমি ভাবছিলাম, মা এত শক্ত মানুষ, হঠাৎ কী হলো তার? বাবা-মা’র সঙ্গে সেই আমাদের শেষ কথা। সেই আগস্টের ১৩ তারিখে।

এরপর ১৪ তারিখে গেলেন বেলজিয়াম।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ। বেলজিয়ামে রাষ্ট্রদূত তখন সানাউল হক। সেখানেও পরদিন দুপুর রাতে ঘুম ভাঙ্গলো আপার গলার স্বরে। আপা বলছিলেন, ‘রেহানা, ওঠ তাড়াতাড়ি। ঢাকায় গোলমাল হচ্ছে।’ বাইরে এসে অনেক কষ্ট করে যে খবরটা জানা গেল তা হলো বাবা, মনি ভাই, কামাল ভাই সবাই নিহত। সানাউল হক তখন হুমায়ূন চাচাকে ফোন করে বললেন, ‘আপনি ঝামেলা পাঠিয়েছেন আপনি সলভ করেন। আমি এদের রাখতে পারব না।’ হুমায়ূন চাচা আমাদের জার্মানে পাঠিয়ে দিতে বললেন। সেখানে পেলাম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামালকে। তাঁকে বললাম, ‘চাচা, আপনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এতবড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, একটা প্রেস কনফারেন্স করেন, বিদেশে যত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আছেন, ওরা যেন প্রতিবাদ করেন, পদত্যাগ করেন, কিছু করেন আপনি।’ তিনি কাঁদছিলেন, কিন্তু হ্যাঁ না, ভাল-মন্দ কিচ্ছু বললেন না। শেষাবধি কিছু করেনওনি। চলে যান লন্ডনে। আর আমাদের সিদ্ধান্ত হলো আমরা ভারত যাব।’

২৩ আগস্ট আপনারা দিল্লী পৌঁছালেন।

শেখ রেহানা : প্রাথমিকভাবে একটা গেস্ট হাউসে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। পরেরদিন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা হয়। তিনি আমাদের বুকের ভেতর টেনে নিয়ে বললেন, ‘তোমরা আমার সন্তানের মতো। যেভাবে থাকতে চাও থাকো, কোন অসুবিধা হবে না।’

লন্ডনে আসার প্রেক্ষিতটা বলবেন?

শেখ রেহানা : এক সময় মনে হলো পড়াশোনা করতে পারলে হয়ত বেঁচে যাওয়া যাবে। কিন্তু নিরাপত্তার জন্য দিল্লী থেকে শান্তি নিকেতন কোথাও ভর্তি হওয়া গেল না। তাছাড়াও মনে হলো ভাগ্যক্রমে এই যে বেঁচে থাকা সেটাকে অর্থবহ করতে কেবল ইংল্যান্ডই হতে পারে সেই জায়গা। আপারও একই প্রতিজ্ঞা। এই রকম একটা অবস্থায় আমি ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর অনুমতি চাইলাম। সব শুনে তিনি অনুমতিসহ যাওয়ার সব আয়োজন করে দিলেন। আমার কাছে ছোট্ট একটা ট্রাভেলার্স চেক ছিল। ৫০ বা ১০০ পাউন্ডের। বাবার শেষ দান। তবু টাকা দরকার, সেটাকে ভাঙ্গাতে হবে। তাই ব্যাংকে গেলাম সেটি ভাঙ্গাতে। কাউন্টারে যিনি বসাছিলেন, পাসপোর্টটা হাতে নিয়ে খুলে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমাদের মুজিব?’ আর চোখভরা জল নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। একে একে সবাই তখন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। সবার চোখে একই কষ্ট, একই কান্না। আমিও কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এলাম। গেলাম লন্ডন। সেটা ১৯৭৬-এর শেষদিন।

সামনে তখন আপনার নতুন যুদ্ধ।

শেখ রেহানা : প্রথম যুদ্ধটা ছিল অর্থ সঙ্কটের। তার ওপর লন্ডনে নানা রকম অভিজ্ঞতা। কেউ আশ্রয় দিতে ভয় পায়, কেউ রাখতে চায়। প্রাথমিকভাবে আমার প্রতিজ্ঞা ছিল এতবড় অন্যায়, এর সুরাহা না করে নিজের কথা ভাববো না। কিন্তু বাস্তব কারণে সরে আসতে হলো।

এরপর বিয়ে এবং পিতৃহত্যার বিচার চেয়ে বিশ্বজনমত গঠন।

শেখ রেহানা : ঠিক তাই। মোশতাক সুইডেনের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত আবদুর রাজ্জাকসহ অনেককে বহিষ্কার করে। ওঁরা বাকশাল গঠন করেছিলেন সেখানে। সংগঠনের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ওঁরা আমাকে আমন্ত্রণ জানালে আমার মনে হয়েছিল সেটা গ্রহণ করা উচিত। আপা ফোনে পয়েন্ট বলে দিলেন। বক্তব্যের মূল কথা ছিল বঙ্গবন্ধু-হত্যার বিচার। সেদিন ছিল ১০ মে, ১৯৭৯। মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি চোখে ঝাপসা দেখছিলাম। কিন্তু মনের ভেতরে ছিলেন চিলির মিসেস আলেন্দে আর তার কন্যা। আলেন্দেকে হত্যার পর তারা দুজনও বিচারের দাবিতে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। সেটাই ছিল বিশ্বের দরবারে আমাদের দুই বোনের প্রথম প্রতিবাদ।

আমরা জানি যে সে লক্ষ্য অনেকাংশেই পূরণ হয়েছিল। কাগজে প্রচার হয়েছিল খুব ভাল। মানবাধিকার সংস্থাও প্রথম সচেতন হলো বিষয়টা নিয়ে। পরের যুদ্ধটা স্যার টমাস উইলিয়ামসের কাছে পৌঁছানোর যুদ্ধ, আগরতলা মামলায় যিনি বঙ্গবন্ধুকে সহায়তা করেছিলেন।

শেখ রেহানা : তার আগে লন্ডনে একটা কনফারেন্সে খুনের বিষয়টা খোলাখুলি লিখিতভাবে উপস্থাপন করি আমি। প্রেসের প্রশ্নের জবাব দেন ড. কামাল। পরে তাঁকে ধরেই স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে যোগাযোগের খসড়াটা করিয়ে নিই। ১৯৮০-এর মার্চ মাসে স্যার টমাস উইলিয়ামসের সঙ্গে দেখা হয় আমার।

একই সময় তো বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠিত হয় লন্ডনে।

শেখ রেহানা : হ্যাঁ। ১৯৮০ সালের ১৬ অগাস্ট তারিখে ইয়র্ক হলে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকা- সম্পর্কে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। আপা তখন লন্ডনে। তিনি সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন। সেটাই ছিল তাঁর লন্ডনে প্রথম রাজনৈতিক সভা। সেখানে তিনি বিষয়টি ঘোষণা করেন। স্যার টমাস যোগাযোগ করেন সন ম্যাকব্রাইডের সঙ্গে। তিনি শান্তিতে নবেল বিজয়ী, জুলিও কুরী পদকপ্রাপ্ত, এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন জুরিস্টের প্রাক্তন সেক্রেটারি জেনারেল এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী। ১৯৭৭ সালে এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রধান হিসেবে তিনি যখন ঢাকায় এসেছিলেন, তখন মেজর জিয়াকে সরাসরি বঙ্গবন্ধু হত্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। এ সময় আর একটা ঘটনা ঘটে। এ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাস ২০০০ পাউন্ডে সিঁড়ির ওপর বঙ্গবন্ধুর গুলিবিদ্ধ শরীরের ছবি আপার কাছে বিক্রি করেন। রশীদ-ডালিমের কাছ থেকে ছবিটা তিনি ‘ম্যানেজ’ করেছিলেন।

এর পরপরই আপনার ছেলে ববির জন্ম হলো।

শেখ রেহানা : হাসপাতালে ওরা যখন ওকে আমার কোলে এনে দিল, কালো একরাশ চুলের মধ্যে দেখলাম বাবার নাকটা। সে মুহূর্তের অনুভব শেয়ার করা যায় না। যদি মুহূর্তটা টাইম মেশিন দিয়ে আটকে রাখতে পারতাম!

তারপর আরও দু’বার মা হয়েছেন আপনি।

শেখ রেহানা : জয় আর পুতুলকে নিয়ে আমার ৫টি ছেলে মেয়ে।

ওরা সবাই সফল বলা যায়। আর একটু যদি বলেন ওদের কথা।

শেখ রেহানা : জয় আইটি স্পেশালিস্ট এবং হার্ভার্ডের এমবিএ। পুতুল চাইল্ড স্পেশালিস্ট। দুনিয়াজুড়ে সে অটিজম-আক্রান্ত শিশুদের ওপর কাজ করছে। ববি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স থেকে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছে। এখন ইউএনডিপিতে চাকরিরত। টিউলিপ ডবল এমএ। কিংস ইউনিভার্সিটি থেকে ইংরেজী এবং সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স করেছে, মাস্টার্স ইন কলেজ, লন্ডন থেকে। রাজনীতিতে ভাল অবস্থানে আছে সে। তুমি জানো যে লেবার পার্টি থেকে সে এমপি নির্বাচিত হয়েছে। ও বাবার একটা গুণ পেয়েছে। ভাল বক্তা সে। সব শেষ রূপন্তী, অক্সফোর্ড থেকে গ্র্যাজুয়েশন করে একটি পুস্তক প্রকাশনার সম্পাদকের দায়িত্বে আছে ও।

আপনিও নির্বাসন জীবন শেষে এক সময় দেশে ফিরেছেন। সে প্রেক্ষিতটা একটু যদি বলেন।

শেখ রেহানা : ১৯৮১ সালে আপা দেশে ফেরার সময় বলেছিলেন, ‘তুমি থাক, আমি দেশে গিয়ে দেখি।’ বুকের ভেতরে কষ্টও ছিল, মনে হতো ঢাকায় কার কাছে যাব? সেখানে যাদের রেখে এসেছিলাম তারা তো কেউ নেই। সেটা সইতে পারব না। বরং দূরে আছি, দূরেই থাকি। তবু মনটাকে শক্ত করে স্থির করলাম দেশে ফিরব। টিউলিপ তখন কোলে। আট বছর পর ১৯৮৩ সালের ২১ জানুয়ারি আমি আবার ঢাকা বিমানবন্দরে পা রাখি।

সেদিনও বিমানবন্দর লোকে লোকারণ্য ছিল। সেই অজস্র জনতার ভেতর সেদিনও তাঁর দু’চোখ খুঁজেছে হারিয়ে যাওয়া স্বজনদের। পৃথিবীতে কতই তো আশ্চর্য জিনিস ঘটে। বহু বছর পরে এসে হাজির হন হারিয়ে যাওয়া কেউ। তাঁর মনে হয় হঠাৎ যদি তিনি তাঁর কামাল ভাইকে দেখতে পান। জামাল ভাই যদি ডাকেন, রাসেল যদি আঁচল টেনে ধরে। তিনি এখন জানেন তারা নেই, তবু আশা তো ছাড়েনা না। এতদিন পরে এসেও এখনও অস্থির লাগে তাঁর। তবু সব মিলিয়ে শেখ রেহানার প্রোফাইলটা সফলতার। ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন জাগে’, সেটাই জীবন, তার মধ্য দিয়েই যা করতে চেয়েছেন, তা তিনি করেছেন সার্থকভাবে।