২১ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

ভ্যাটের বোঝা চাপছে নিম্ন আয়কারীদের কাঁধে


অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ ভ্যাটের বোঝা উচ্চ আয়কারী ব্যক্তির চেয়ে নিম্ন আয়কারী ব্যক্তির কাঁধেই বেশি চাপছে। এক্ষেত্রে উচ্চ আয়কারী ব্যক্তির ওপর চাপে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ সেই তুলনায় নি¤œ আয়কারী ব্যক্তির ওপর চাপে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি। ফেয়ার ট্যাক্স মনিটর বাংলাদেশ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বিষয়টি তুলে ধরেছে সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান-সুপ্র। সংস্থাটির সুপারিশে বলা হয় ভ্যাট মুক্তি সুবিধা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ যাবতীয় জনবান্ধব সেবাখাতগুলোতে থাকা উচিত। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় কর-জিডিপির অনুপাত ১২ দশমিক ৪ শতাংশ টার্গেট ধরা হলেও তা অর্জিত হয়নি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাতেও এ লক্ষ্যমাত্রা ১৪ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখলেও কালো টাকার উৎস বন্ধে সরকারকে জোর দেয়া উচিৎ বলে মনে করছে সুপ্র।

ফেয়ার ট্যাক্স মনিটর বাংলাদেশ গবেষণাটি একযোগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান, সেনেগাল ও উগা-াতে পরিচালনা করা হয়। উক্ত গবেষণায় ৭টি এরিয়াতে (কর বণ্টনব্যবস্থা, কর বোঝা, রাজস্ব পর্যাপ্ততা, কর অবকাশ, কর প্রশাসনের কার্যকারিতা, সরকারী ব্যয়, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা) তথ্য ও ফল তুলে ধরা হয়।

মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে ডেইলি স্টার ভবনে অনুষ্ঠিত সভায় গবেষণার প্রাপ্ত ফল ও তথ্য-প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সুপ্র পরিচালক এলিসন সুব্রত বাড়ৈ। সুপ্র চেয়ারপার্সন আহমেদ স্বপন মাহমুদের সঞ্চালনা ও সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় মুখ্য আলোচক ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ। আলোচক ছিলেন সিপিডির সিনিয়র গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান, এফবিসিসিআইয়ের উপদেষ্টা মানজুর আহমেদ, জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ ও কলামিস্ট এম এস সিদ্দিকী।

সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ, সুপ্র’র নির্বাহী ও জাতীয় পরিষদের সদস্যবৃন্দ, সুপ্র সচিবালয়ের কর্মীবৃন্দ, প্রিন্ট, অনলাইন ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ার সাংবাদিকরা।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ও বর্তমানে চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ বলেছেন, কোন আলোচনা ছাড়াই সম্পূরক বাজেট সংসদে পাস হয়ে যায়। অথচ এ বাজেট নিয়েই বেশি আলোচনা করা উচিত কেননা সরকারী অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকে। কর ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, সাম্য, ন্যায্য ও অগ্রগামী করার বিষয়ে আমরা পিছিয়ে আছি এর মূল কারণ এখনও আমাদের মধ্যে ঔপনিবেশিক মন-মানসিকতা রয়ে গেছে। মঙ্গলবার সুশাসনের জন্য নাগরিক সূপ্র আয়োজিত ‘ফেয়ার ট্যাক্স মনিটর বাংলাদেশ’-গবেষণায় প্রাপ্ত ফল ও তথ্য-প্রতিবেদন উপস্থাপন উপলক্ষে একটি মতবিনিময় সভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কর প্রশাসনের জনবলের অভাব আছে। তবে তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে অনেক বেশি। কর প্রশাসন খুবই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা। এনবিআর এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্তে গড়মিল বেশ লক্ষণীয়। অন্য ৪টি দেশের তুলনায় সাম্যতার দিক থেকে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে থাকলেও কর ছাড়-এর বিষয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মানদ- মানা হয় না বলে বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। সরকারী ব্যয় কাঠামোতে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার বিষয়টি নিশ্চিত নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় বরাদ্দ চিত্রের উন্নতি হচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়।

মানজুর আহমেদ বলেন, আমাদের দেশে ১টাকা কর পরিশোধ করতে ২ থেকে ৩ টাকা খরচ হয়। কর কাঠামোকে ন্যায্য ও ফেয়ার করতে হলে সব পক্ষকে নিয়ে একটা মনিটরিং ইউনিট গঠন করতে হবে যেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তাগণও যুক্ত থাকবেন।

অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, করের বিপরীতে জনসেবার বিষয়গুলো বেশি প্রচার পেলে মানুষ সহজেই কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ হবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সিএসআর সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা কিংবা কতটা হচ্ছে সেটাও মনিটরিং করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। গ্রামের নারী উদ্যোক্তাদের বেশি করে উৎসাহিত করার উদ্যোগ চোখে পড়ে না যেটা বেশি করে করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

এম এস সিদ্দিকী বলেন, যারা বৈধ উপায়ে আয় করে কিন্তু কর দেয় না তাদের আয়কে কোনভাবেই কালো টাকা বলা উচিত নয়। বরং অবৈধ উপায়ে আয়কেই কেবল কালো টাকার অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধিত। তারা যদি বাণিজ্য করে থাকে তবে সরকারের উচিত সেটা ধরা। কর ব্যবস্থাকে একটি যৌক্তিক কাঠামোতে উন্নীত করতে সব পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরী।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ভ্যাট দেয়াকে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা একটি ব্যয় হিসেবে দেখে তাই স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষ কর প্রদানের ক্ষেত্রে একটু রক্ষণশীলতার পরিচয় দেয়। ভবিষ্যত উন্নয়ন অভিলাষ বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন পড়বে সরকারের তাই এখনি এ বিষয়ে কড়া নজর দিতে হবে।

সূত্র জানায়, গত ২০১৪Ñ১৫ অর্থবছরের বাজেটে প্রত্যক্ষ করের লক্ষ্যমাত্রা বেশি ধরা হলেও সংশোধিত বাজেটে গিয়ে পরোক্ষ করের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়তে দেখা গেছে। মোট এনবিআর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে মূল বাজেটে আয় ও কর্পোরেট কর থেকে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৫৬ হাজার ৮৬ কোটি টাকা আর মূসক/ভ্যাট থেকে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৫৫ হাজার ১৩ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে দেখা গেছে আয় ও কর্পোরেট কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ধরা হয় ৪৮ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা এবং মূসক/ভ্যাট থেকে আয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৪৯ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বাস্তবতায় দেখা গেছে প্রকৃত আদায় ছিল কম এবং অপেক্ষাকৃত ভ্যাট আদায় ছিল বেশি।

অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে (২০১৫Ñ১৬) মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ২ লাখ ৮ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। এর মধ্যে আবার আয় ও কর্পোরেট কর ছিল ৬৪ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা এবং মূসক/ভ্যাট ৬৪ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরেও সংশোধিত বাজেটে হয়ত পরোক্ষ কর নির্ভরতার ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এ বাস্তবতায় সুপ্র মনে করছে তৃণমূল মানুষের ভাগ্যন্নোয়নে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ওপর মূসক হ্রাস, বহুজাতিক কোম্পানির কর ফাঁকি বন্ধ, করজাল বৃদ্ধি, পর্যায়ক্রমে ভ্যাট হ্রাসকরণ, কর আদায়ে সর্বোস্তরে ই-সেবা নিশ্চিতকরণ, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজীকরণ, হয়রানীমুক্ত কর প্রশাসন, কর প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ এবং কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নে এ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কার্যকর কর্মসূচী গ্রহণ ও বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন এবং পরিবীক্ষণে পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।