মেঘলা, তাপমাত্রা ৩১.১ °C
 
২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৬ আশ্বিন ১৪২৪, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
সর্বশেষ

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করব আমরা

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫
  • সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা ড. কৌশিক বসু

অর্থনৈতিক রিপোর্টার ॥ বাংলাদেশে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের বিষয়টিকে অত্যন্ত ‘সুখবর’ বলেই মনে করছেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে এসেছিল। এটা খারাপ বিষয় ছিল। কিন্তু নিজেদের অর্থায়নে বাংলাদেশ পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে, এটা আপনাদের সক্ষমতা। বাংলাদেশের এ সক্ষমতা অর্জন আমাদের জন্য সুখকর। কারণ বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বাংলাদেশ যেন ‘তরতর করে’ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই সামনের দিনগুলোতে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করব। এখন সময় এসেছে এদেশের মানুষের আত্মবিশ্বাস আনার। কারণ দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই উন্নয়নের সঙ্গে নিজেদের শরিক করতে নাগরিকদের আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। ঢাকা সফরের শেষ দিন মঙ্গলবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান। বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্টিন রোমা ও জনসংযোগ কর্মরতা মেহরিন এ মাহবুব উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলন পরিচালনা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে তিনি বলেন, এই প্রথম বাংলাদেশে এসে বিশ্বব্যাংকের কোন অর্থনীতিবিদ বাংলায় বক্তব্য রাখছেন। সাংবাদিকদের জানালেন, এবার তিনি ২২ বছর পর ঢাকা এলেন। জানালেন, বাংলাদেশে এসে যতটা না আশা করেছিলাম তার চেয়ে বেশি উন্নতি করেছে এ দেশটি। বললেন, ১৯৯২ সালে যখন বাংলাদেশে এসেছিলাম তখন এ দেশের জিডিপিতে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ। এখন শতাংশের হিসাবে জডিপি প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্যতা কমেছে। নিজস্ব একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে সাংবাদিকদের বলেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের ফরেক্স রিজার্ভ ছিল ৭-৮ বিলিয়ন ডলার ছিল। কল্পনাও করা যায় না সেই রিজার্ভ এখন ২৭ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নানা দিক থেকে সহায়তা করছে। রিজার্ভের জন্য এক ধরনের আস্থা তৈরি হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এ অর্থনীতিবিদের মতে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ। আর আগামী অর্থবছরে হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। তিনি বলেন, এখানকার মানুষগুলো বুঝতে পারছেন কি-না জানি না ২০০৮ সাল থেকে পৃথিবীতে একটা বিশ্বমন্দা চলছে। এই অবস্থায় পৃথিবীর খুব কম দেশেই রয়েছে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। পৃথিবীতে ৫-১০টি দেশ রয়েছে যারা এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপরে, চীনে প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের নিচে চলে এসেছে।

বাংলাদেশ ‘তরতর করে’ এগিয়ে যাচ্ছে মন্তব্য করে কৌশিক বসু বলেন, আমি সব সময় আশাবাদী মানুষ নই। আমি জানি, বাংলাদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ-বিশ্লেষকরাও অর্থনীতির সমালোচনা করে থাকেন। সেটা ভাল। কিন্তু এখন বাংলাদেশ যে জায়গায় চলে এসেছে তাতে সবাইকে কনফিডেন্স রাখতে হবে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে অর্থনীতি শেখা এই বাঙালীর মূল্যায়ন, ১০ বছর আগে যে বাংলাদেশ ছিল- তা এখন নেই। বাংলাদেশের দুর্বল দিক কোন্টি- এ প্রশ্নে কৌশিক বসু বলেন, অবকাঠামো এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক রাস্তাঘাট হচ্ছে এদিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনেও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের দোকানে গিয়ে দেখলাম বাংলাদেশের পণ্য। ঢাকার বাইরে গিয়ে দেখলাম নেই পণ্য কিভাবে তৈরি করছেন এদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকরা। ঢাকার বাইরে গার্মেন্টস কারখানা ঘুরে দেখলাম সেখানে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে। কৌশিক বসু বলেন, বাংলাদেশ মোবাইল ফাইন্যান্স সার্ভিসিংয়ে অনেক উন্নতি করেছে। সারাবিশ্বে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রথম তিন দেশের মধ্য অবস্থান করবে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিনিয়োগ রয়েছে ২৯ শতাংশ। এটি বাড়াতে বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন। আঞ্চলিক সহযোগিতা-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে কৌশিক বসু বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে সড়ক যোগাযোগে পিছিয়ে আছে। এক্ষেত্রে উন্নয়নের আরও সুযোগ আছে।

বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট জানান, প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার পর ঢাকার বাইরে গিয়ে ঘুরে দেখলাম কিভাবে এদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। কলকাতায় বড় হওয়া কৌশিক এদেশের মানুষগুলোর উদ্দেশে বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ এশিয়ার ‘ইমার্জিং টাইগার’ হিসেবে পরিচিতি পাবে। তিনি বলেন, ১৯৫০ সালে হংকং-সিঙ্গাপুরকেও ‘এশিয়ার টাইগার’ বলা হতো না। কিন্তু তারা এখন সেই জায়গায় চলে গেছে। বাংলাদেশের খুবই সম্ভাবনা আছে। অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের এ কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটা দেশের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমি সরকারকে বলতে চাই না। তবে এদেশের মানুষকে বলতে চাই- তাদের মনে করা উচিত, ‘আমাদের দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, এবং সেটা অব্যাহত থাকুক।’ তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং বিদেশী বিনিয়োগ বহুগুণে বেড়ে যাবে। কৌশিক বসু বলেন, ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের বিদেশী বিনিয়োগ প্রয়োজন, এটা ঠিক। একেবারে সেটা না হলে যে চলবে না তা কিন্তু নয়। একই সঙ্গে নিজেদেরও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, এই কয়েক দিকে আমাকে অনেকেই বলেছেন, বিনিয়োগ আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। তবে জিডিপির ২৯ শতাংশ বিনিয়োগ অনেক ভাল বলেই বিশ্বব্যাংকের এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন। তবে বিদেশী বিনিয়োগ না এলেও আগামী দুই তিন বছরের মধ্য অভ্যন্তরীণভাবে ২ থেকে ৩ শতাংশ বাড়াতে পারলে ভাল। ২০০৩ সালে ভারতের বিনিয়োগ ৩০ শতাংশে উন্নীত হবে এটা কেউ কল্পনাও করেনি উল্লেখ করে দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা বলেন, আগের তুলনায় অনেক বেশি বিদেশী বিনিয়োগ আসছে বাংলাদেশে। বিদেশী বিনিয়োগও আসছে। সংবাদ সম্মেলনে পদ্মা সেতু নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কৌশিক বসু বলেন, পদ্মা সেতু, যেটা সরকার এখন নিজস্ব অর্থে নির্মাণ করছে এই তো কাল না পরশু প্রধানমন্ত্রী এর মূল কাজ উদ্বোধন করলেন। সেটা একটা বিরাট সুখবর। এ কাজকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই। বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে নতুন অংশীদার সৃষ্টি হয়েছে। অবকাঠামোসহ অন্যান্য খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংক একসঙ্গে কাজ করবে। বাংলাদেশের অগ্রগতির জন্য কিছু পরামর্শে ড. কৌশিক বসু বলেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হবে। করহার না বাড়িয়ে অধিক মানুষ ও খাত থেকে কর সংগ্রহ বাড়াতে হবে। অত্যাধুনিক টোল সিস্টেম চালু করতে হবে। বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সুদ হার কমিয়ে আনতে হবে।

কৌশিক বসু বাংলাদেশ ব্যাংকের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছেন গত শনিবার। মঙ্গলবার ঢাকার অদূরে গাজীপুরে গিয়ে গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের কর্মজজ্ঞ ঘুরে দেখেছেন। একটি বেসরকারী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন তিনি। এর আগে রবিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এক গণবক্তৃতায় অংশ নেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি অর্থনৈতিক কর্মকা-কে টেকসই করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং চালু করে অনেক মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছে দিতে পারছি। এতে আর্থিক ব্যবস্থার বৈধতা ও নৈতিকতার জোর বাড়ছে। তিনি বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য সুদ হার ক্রমেই কমছে। ভাল কর্পোরেট গ্রাহক সিঙ্গেল ডিজিট সুদ হারে ঋণ পাচ্ছেন। আগামী মুদ্রানীতি বিশেষ খাতে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। তবে যারা ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে ভুলে যান তাদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া হবে না। বরং তাদের ক্ষেত্রে সুদহার আরও বাড়ানো হবে। নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ায় ঋণের ক্ষেত্রে বেশি সুদ নেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নে মার্টিন রোমো বলেন, বাংলাদেশ এতদিন স্বল্পোন্নত দেশ ছিল। এখন বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ কিন্তু ভারতও। সুতরাং বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক এখন নতুন একটি মানদ-ে (স্ট্যান্ডার্ড) উন্নীত হবে, যা অনেকটা পার্টনারশিপের মতো। বরং স্বল্প সুদে বাংলাদেশের ঋণ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হলো।

প্রকাশিত : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫

১৬/১২/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: