১৯ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বীরাঙ্গনা বিভা রানী এখন সেলাই দিদিমণি


বীরাঙ্গনা বিভা রানী এখন সেলাই দিদিমণি

জনকণ্ঠ ফিচার

একাত্তরের সেই ভয়াল রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নারী-পুরুষ-শিশু-কিশোর নির্বিশেষে বীর বাঙালী মুক্তি সেনারা জীবন বাজি রেখেছেন মাতৃকার মুক্তির জন্য আত্মদান করেছেন। আপনজন হারিয়ে বহু পরিবার আজ গৃহহারা, সর্বহারা। আবার কেউ কেউ সেই সব দিনের নানা ক্ষত চিহ্ন বয়ে চলেছেন আজও। এছাড়া, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে আজ সমাজে অল্প-বিস্তার প্রতিষ্ঠিত। তাঁদেরই একাত্তরের স্মৃতিবাহী দিনগুলোর কথা তুলে ধরা হয়েছে আজকের এই ছোট্ট পরিসরে।

বীরাঙ্গনা বিভারানী আজ সেলাই দিদিমনি ॥ খোকন আহম্মেদ হীরা বরিশাল থেকে জানান, ১৯৭১ সালের বীরাঙ্গনা বিভারানী আজ সেলাই দিদিমনি। সংসারের চাকা সচল রাখতে মাঝে মধ্যে তাকে ধাত্রীর কাজ করতে হয়। জীবনযুদ্ধে প্রতিবন্ধী সন্তান সাগরকে নিয়ে তার আরেক সংগ্রাম। বীরাঙ্গনাকে নিয়ে ঘর করতে রাজি না হওয়ায় স্বামীও তাকে ত্যাগ করেছে। আর জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতায় বৃদ্ধা বিভারানী সন্তানকে নিয়ে সাগরে ভাসছেন। তিনি বলেন, “সাগরকে নিয়ে আজ আমি সাগরে ভাসতাছি। জেলার গৌরনদী উপজেলার টরকী বন্দর সংলগ্ন বাবা উমেশ চন্দ্রের আড়াই কাঠা জমিতে টিনের ঘর। এ টিনের ঘরেই একমাত্র ভাই উপেন্দ্র নাথ ম-লকে নিয়ে বিভারানী সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ আসতেই বিভারানী অনেকটা আনমনা হয়ে যান। বলতে থাকেন, আমার বাবা টরকীরচরে বহুদিন ধরে বসবাস করেছেন। উনি ক্ষুদ্র ব্যবসা করতেন। এখানে আমরা ৪ বোন ও ১ ভাই ছিলাম। ১৯৭১ সালে আমি টরকী হাই স্কুলে অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী ছিলাম। জ্যৈষ্ঠ মাসে এখানে পাকিস্তানী মিলিটারিদের নিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকাররা। চারদিকে আগুন দিতে শুরু করে। লোকজন যে যেদিক পারে ছোটাছুটি করছিল। আমার বাবা তখন পর্যন্ত বাড়িতে অবস্থান করেন। এমন সময় সবাই বাবাকে স্থান ত্যাগ করতে বললে বাবা আমাদের নিয়ে কালকিনির রমজানপুরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু তখন আমরা দিগি¦দিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিলাম। আমিসহ বেশ কিছু (সঙ্গত কারণেই নাম উল্লেখ করা হলো না) আখ ক্ষেতের মাঠে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। সেদিন এদের হাত থেকে আমরা কেউ রেহাই পাইনি। আমি নির্যাতনের কারণে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরবর্তীতে আমাদের বাবা খুঁজে ঘরে নিয়ে আসে। টরকী বন্দরে এসে আমরা দেখি বন্দরটি পাকিস্তানী আর্মিরা পুড়িয়ে দিয়েছে।

মহিলা মুক্তিযোদ্ধা শরীফুন নেছার কথা ॥ সালাহউদ্দিন মিয়া কেরানীগঞ্জ থেকে জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া ইউনিয়নের আলীনগর এলাকার গৃহবধূ দেওয়ান শরীফুন নেছা ।

শরীফুন নেছা জানান, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আমার বয়স ছিল ২১ বছর। তখন আমি অবিবাহিত ছিলাম। ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকবাহিনীদের রাজধানী ঢাকায় হামলার পর থেকে আমার বাবার বাড়ি কেরানীগঞ্জের আহাদীপুর গ্রামে এসে আশ্রয় নেন তাজ উদ্দিন আহমেদ, তোফায়েল আহমেদ, আঃ রাজ্জাক, সিরাজুল আলমসহ জাতীয় নেতারা। তিনি আরও বলেন, আমাদের বাড়িতে এ সব জাতীয় নেতা ৪ দিন আশ্রয় নিয়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। আমাদের ৫টি আধাপাকা টিনশেডের ঘর ছিল। একটিতে আমার মা, বাবা ও ভাইদের নিয়ে থাকতাম। অন্য ৪টি ঘরে গেড়িলা মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় নেতারা গাদাগাদি করে থাকত। আর বাড়ির পেছনে চলত তাদের প্রশিক্ষণ। আমি তাদের রান্না করে ৩ বেলা খাওয়াতাম। আর কাজ শেষে তাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নিতাম এবং মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্পে গোপনে নিয়ে যেতাম। আমাদের বাড়িতে প্রশিক্ষণের মূল নেতৃত্ব দিয়েছিল তৎকালীন ঢাকা জেলা মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার মোস্তফা মহসিন মন্টু। মে মাসের শেষের দিকে আমাদের বাড়িতে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এ বিষয়টি রাতে বিবিসি রেডিওতে প্রচার করা হয়। এ সংবাদ পেয়ে পাক হানাদার বাহিনীরা পরদিন ভোর রাতে আমাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। পরে আমার বাড়ির সবাই নিরাপদ স্থানে চলে যায়। আর আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি এবং তাদের সঙ্গে কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন জায়গায় বর্বর পাক বাহিনীদের সঙ্গে যুদ্ধ করি। তিনি খুব আক্ষেপ করে বলেন, ৪৪ বছর পার হতে চলল দেশ স্বাধীন হয়েছে। কত দুঃখ যাতনা সহ্য করেছি।

মুক্তিযোদ্ধা মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ ॥ মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ¦ল মুন্সীগঞ্জ থেকে জানান, মহান মুক্তিযুদ্ধের এক সংগ্রামীর নাম মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ। সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়াসহ তাঁর বীরত্ব গাথা স্মৃতির পাতায় ঝল ঝল করছে। তিনি মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার চিতলীয়ার রাঢ়ীপাড়া গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে তার বয়স ছিল মাত্র বিশ। তখন পাকিস্তানী আর্মিতে যোগ দেন। বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষার কারণে ¯œাতক শ্রেণীর ছাত্র থাকা অস্থায়ই যোগ দিতে হয় পাকবাহিনীতে। ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি পাকিস্তান আর্মিতে যোগ দেন। সেখান থেকেই প্রায় তিন মাস পর ৯ এপ্রিল বেরিয়ে আসেন। পাকিস্তানী আর্মিরা মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেয়ার পর পাকিস্তানী গাড়ি দিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এক পাকিস্তানী মেজরের ইঙ্গিতে তিনি সেই গাড়িতে উঠেননি। বাকি ৬০/৭০ সামরিক ট্রেনিং প্রাপ্ত বাঙালী নিয়ে গাজীপুরের বাজবাড়িতে হত্যা করা হয়। ঢাকার সিএমএসের কাছে গেরিসন মসজিদের উল্টো দিকে ছিল মেজবাউদ্দিনদের রেজিমেন্ট। ফিরে আসলেন নারায়ণগঞ্জ হয়ে মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীপাড়ার বাড়িতে।

সর্বাধিক পঠিত:
পাতা থেকে: