১৯ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বাংলাদেশ এখন পাল্লা দিচ্ছে চীনের সঙ্গে


বাংলাদেশ এখন পাল্লা দিচ্ছে চীনের সঙ্গে

রহিম শেখ ॥ পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেক বেশি শক্তিশালী কিন্তু অনেক দেশের তুলনায় রাজস্ব আয় অনেক কম। রাজস্ব আয় বাড়লে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এমনিতেই বাড়বে। বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশ একটি চমকপ্রদ জায়গা উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু বলেন, বিদেশীরা এখানে সস্তা শ্রমে উৎপাদনমুখী খাত, অবকাঠামোগত খাত, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে পারে। দৈনিক জনকণ্ঠকে দেয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশেই অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতাও রয়েছে। এজন্য সরকারকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে এবং সেই চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করতে হবে।

সাক্ষাতকারে বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, বেশিরভাগ সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি অসামান্য। বিশ্বব্যাংক মনে করছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি হবে সাড়ে ৬ শতাংশ। আর আগামী অর্থবছরে হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। একটা সম্ভাবনা আছে যে, কয়েক বছরের মধ্যে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে। এটাও সম্ভব বলে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ মনে করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন চীনের সঙ্গে ‘নেক টু নেক’ পাল্লা দিচ্ছে। ১০ বছর আগে এটি ছিল অচিন্তনীয়। কৌশিক বসু বলেন, চীন ৩০ বছর ধরে উৎপাদন খাতে গড়ে ১০ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এর অন্যতম কারণ, সস্তা শ্রম। এখন চীনে শ্রমের মূল্য বাড়ায় উৎপাদন খরচও বাড়ছে। বাংলাদেশের জন্য সামনে এখন বড় সুযোগ। বাংলাদেশের শ্রম তুলনামূলকভাবে অনেক সস্তা। চেষ্টা করলে বিশ্ববাজারে চীনের অংশীদারিত্বের একটি অংশ দখল করতে পারে বাংলাদেশ। কৌশিক বসু মনে করেন, বাংলাদেশ ভাল করছে। তবে আরও অনেকদূর যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ জন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। বাংলাদেশকে এখন অবকাঠামো উন্নয়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের বিদ্যুত ও গ্যাস দিতে হবে। ভাল বন্দর সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়মকানুন সহজ করতে হবে। তিনি বলেন, আয়বৈষম্য দূর করা বাংলাদেশ, ভারতসহ অনেক দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বৈষম্য দূর করতে কর আদায় পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ বেশি হারে কর্মসংস্থান বাড়ানো। কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা।

ডক্টর কৌশিক বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা পৃথিবীর সব দেশেই রয়েছে। কিন্তু আজকের দিনে এই শঙ্কা নিয়ে বসে থাকলে চলবে না। এগিয়ে যেতে হবে এবং বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এটাই বড় কথা। তবে সরকারকে রাজনৈতিক স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কেননা, রাজনৈতিক অস্থিরতায় উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, সরকারপ্রধানের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝতে পারলাম তাতে মনে হচ্ছে সরকার দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে খুব বেশি সিরিয়াস। এটা দেশের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটা দিক। কৌশিক বসু বলেন, বিদেশী বিনিয়োগে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পলিসি কোন সমস্যা। সমস্যা হচ্ছে সরকারের পলিসিতে যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা না থাকে। তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ভারতে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াছে। কিন্তু এই প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে বহু বছর ধরে। বাংলাদেশ যদি সময় নেই তবে অবশ্যই বিদেশী বিনিয়োগ বাড়বে। এটা সময়ের ব্যাপার। বিশ্বব্যাংকের এ কর্মকর্তা বলেন, জিডিপির ২৯ শতাংশ বিনিয়োগ খুব দ্রুত ৩৪ শতাংশে উঠবে না। তিনি উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, ভারত ২০০৩ সালে জিডিপির ২৯ শতাংশ অতিক্রম করেছে। গত ১২ বছরে ভারতে খুব ভাল বিনিয়োগ এসেছে। বিশ্ব ব্যাংকের এই অর্থনীতিবিদের মতে, এক বছরের মধ্যেই জিডিপিতে বিনিয়োগের অবদান ৩০ শতাংশ অতিক্রম করবে। তবে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করলে বেসরকারী খাত বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে না। চীনে অবকাঠামো খাতে সরকারের খুব বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই কারণে দেশটি খুব দ্রুত উপরে উঠেছে। মনে রাখতে বেসরকারী খাত কখনই বড় ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইবে না। সেখানে সরকারকেই ঝুঁকি নিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি হলে চলবে না। এক্ষেত্রে সরকার ১০ বছরের জন্য বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে সেটা পরিশোধ করে আবার ঋণ নিতে হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সঙ্কট কাটবে বলে তিনি মনে করেন। ডক্টর কৌশিক বসু জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে মাল ওঠা-নামা করতে দেরি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে অনেক জাহাজ আসতে রাজি হয় না। এজন্য বন্দরকে আরও উন্নত ও আধুনিক করার পরামর্শ দেন তিনি। ডক্টর বসু বলেন, বিদেশীরা যদি জানে এখানে খুব দ্রুত মাল ওঠা-নামা করা হয় তাহলে অবশ্যই পৃথিবীর বড় বড় জাহাজ আসবে। দেশের পোশাক খাতের ভবিষ্যত সম্পর্কে পশ্চিমবঙ্গের এই বাঙালী অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে উন্নতি করছে তাতে চীনকে ছাড়িয়ে হয়ত সম্ভব নয়। তবে চীনের সমকক্ষ হতে খুব বেশি সময় বাকি নেই বলে আশাপ্রকাশ করেন বিশ্বব্যাংকে কর্মরত বাঙালী এই কর্মকর্তা। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে এত ভাল করছে কারণ সরকার এ খাতে যথেষ্ট সুযোগ দিয়েছে।

এজন্য অন্যান্য রফতানিমুখী খাতে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। ইতোমধ্যে এদেশে ওষুধ শিল্প খুব ভাল করছে। কৌশিক বসু বাংলাদেশ ব্যাংকের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছেন গত শনিবার। সোমবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক এক কর্মশালায় অংশ নেন। এর আগে রবিবার তার এক গণবক্তৃতার আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সম্পর্কিত:
পাতা থেকে: