১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৪ আশ্বিন ১৪২৬, বৃহস্পতিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৫
বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলি

মোরসালিন মিজান ॥ একটা ভয়ঙ্কর সময়। কালো অধ্যায়। হঠাৎ করেই যেন গিলে খেতে চাইছে সব। সকল সুন্দর, সকল শুদ্ধতা, চিন্তার স্বাধীনতা আজ আক্রান্ত। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালীর যে অর্জন তা ধ্বংস হওয়ার পথে। অসাম্প্রদায়িকতার বোধ, গণতান্ত্রিক চেতনা নিশ্চিহ্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে সেই পুরনো শকুন। জামায়াত-শিবির মৌলবাদী অপশক্তি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। নিরীহ নির্দোষ বাঙালীকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। আজ তারাই হায়েনার রূপে ফিরেছে। এরা চিন্তার স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ হয়েও অন্যের ধর্মকে পিষে ফেলতে চায়। তাদের হিংস্র থাবায় আজ রক্তাক্ত ঢাকা। বায়ান্ন বাজার তিপ্পান্ন গলির শহর শোকের নগরে পরিণত হয়েছে। ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল।

চিন্তার স্বাধীনতা খুনের ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ শনিবার নৃশংসভাবে খুন করা হয় তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনকে। এই ঘটনার নির্মমতা-নিষ্ঠুরতার কথা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। অসম্ভব। এদিন শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ অফিসকক্ষে বসে কাজ করার সময় মানবতার শত্রুরা চাপাতি দিয়ে তাকে কুপিয়ে হত্যা করে। ছোট্ট নতুন অফিসটি রক্তে ভেসে যায়। সম্পূর্ণ নির্দোষ নির্বিবাদী উচ্চশিক্ষিত তরুণ প্রকাশক, আহা, কী কষ্টে ছটফট করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন! সেদিন থেকে বইয়ের দোকান ও লেখক প্রকাশক পাঠকের মিলনকেন্দ্র আজিজ মার্কেটে শোকের মাতম। এমন বর্বরতার কথা কেউ ভুলতে পারছেন না। এই প্রতিবেদককে ফোনে দুঃসংবাদটি দেয়ার সময় কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন মার্কেটের ব্যবসায়ী বিথুন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত একই রকম কান্নাভেজা চোখ দেখা গেছে মার্কেট এলাকায়। দীপনের অফিসের পাশেই উৎস প্রকাশনের অফিস। প্রকাশক মোস্তফা সেলিমকে ফোন করতেই কানে এলো শীতল কণ্ঠ। ভারাক্রান্ত মন নিয়ে কথা বললেন। জানালেন, এমন সজ্জন ব্যক্তিকে কেউ হত্যা করতে পারে ভাবিনি। প্রকাশকদের ওপর বর্বর আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। বলেন, আমরা জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়ে এসেছি। অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছি। এর পাশাপাশি আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে চলছে প্রতিবাদ। প্রকাশক হত্যার প্রতিবাদে উত্তাল শাহবাগ এলাকা। এখানে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বাধীন গণজাগরণ মঞ্চ। ক্ষোভ-বিক্ষোভের পর বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে কফিন মিছিল বের করা হয়। এর আগে প্রতিবাদ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। দীপনের কলেজের সহপাঠীরা প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেছেন ঢাকা কলেজের সামনে। প্রেসক্লাবের সামনে প্রততিবাদ করেছেন সাংবাদিকরা। আরও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে, একের পর এক হত্যাকা- সংঘটিত হলেও পুলিশ কার্যকর কিছু করতে পারছে না। রাজধানীবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। খুনীরা ধরা পড়ছে না। উল্টো পুত্রহারা পিতাকে নতুন করে হুমকি দেয়া হয়েছে। দীপনের বাবা বলেছেন, তিনি ১৯৭১ সালের মতোই অনিরাপদ বোধ করছেন। সব দেখে শহরের বিবেকবান মানুষ হতভম্ব। মানবিক আত্মাগুলো গুমরে কাঁদছে। বিষয়টি নিয়ে মহানগরীর অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, এ শহর খুনীদের হতে পারে না। একাত্তরে পরাজিত মৌলবাদী জঙ্গীদের হতে পারে না শহর ঢাকা। প্রায় প্রতিটি মানুষের বক্তব্য- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরও করার আছে। করছে বলে মনে হচ্ছে না। ব্লগ থেকে বই পর্যন্ত আক্রমণ সম্প্রসারিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে পত্রিকায় কলাম লিখছেন বিশিষ্টজনেরা। তবে দেশের শীর্ষ লেখক কবি শিল্পী সাহিত্যিকরা এক ধরনের মৌনতা অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইস্যুটি পাশ কাটিয়ে বলার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখতে, সভ্যতাকে এগিয়ে নিতে ভয়ভীতি কাটিয়ে উঠে প্রগতিশীল চিন্তার সকলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।

প্রকাশিত : ৬ নভেম্বর ২০১৫

০৬/১১/২০১৫ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন

শেষের পাতা



শীর্ষ সংবাদ: